আলমগীর হাসান আবির
এই সমাজে আই অ্যাম জিপিএ ফাইভ, অপারেশন করার সময় যে লাইট ব্যবহূত হয় প্রশ্নের উত্তরে তাকে বলে অপারেশন সার্চলাইট, পীথাগোরাস একজন ঔপন্যাসিক বলার ঘটনাও ঘটে চলেছে। মাধ্যমিক পাস করেও অনেকে ঠিকভাবে খবরের কাগজ, চিঠিপত্র পড়তে পারে না। এক পৃষ্ঠা বাংলা লিখতে দিলে বেশিরভাগই পুরোটা নির্ভুল লিখতে পারে না। দুই মিনিট মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলতে পারে না। অথচ আমাদের দেশে শতকরা ৯৯ ভাগ ছেলেমেয়ে স্কুলে যায়। একজন বাবা তার আয়ের অর্ধেক সন্তানের লেখাপড়ার জন্য ব্যয় করেও যখন সন্তানের খাতায় লেখা দেখে ৫–৬=৩৫ তখন এর চেয়ে হতাশার বিষয় আর কী হতে পারে? ইংরেজিতে তাদের ভিত্তি কত দুর্বল তার প্রমাণ পাওয়া যায় যখন উচ্চ মাধ্যমিকে জিপিএ-৫ নিয়েও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় মাত্র ১০ বা ১২ শতাংশ পাস করে। এই সমস্যাগুলো ছোট করে দেখার কোনো সুযোগ নাই কারণ এরাই জাতির ভবিষ্যত্। এখন প্রশ্ন হলো, এই সমস্যাগুলোর জন্য কে বা কারা দায়ী? এর সমাধানই বা কোথায়? আমার মতে, এই সমস্যার জন্য প্রধানত শিক্ষক ও পরিবার দায়ী। এদেশে প্রাইভেট পড়ানোতে যেখানে একজন শিক্ষকের ধ্যান, জ্ঞান, মন সবকিছু নিমজ্জিত থাকে। অনেক শিক্ষক পরীক্ষায় কম নম্বর দিয়ে প্রাইভেটে আসার উত্সাহ দেন। এই অভিযোগ কমবেশি আমরা সবাই জানি। একজন শিক্ষকের মূলমন্ত্র হলো তার ছাত্রের ভিতর লুক্কায়িত গুপ্তধন বা সুপ্ত প্রতিভাকে বিকশিত করা। অনেক শিক্ষকই এখন এই মন্ত্র ভুলে গেছেন এবং প্রাইভেট তপস্যায় ডুব দিয়েছেন। এর ফলাফল অচিরেই ভয়ানকভাবে বিস্ফোরিত হবে। গ্রেসিয়া হান্টার বলেছিলেন-‘একজন শিক্ষক একটি জাদুকরি আয়নার মতো যেখানে তুমি তোমার ভবিষ্যত্ দেখতে পাবে’। বর্তমান অবস্থা দেখে মাঝে মাঝে মনে হয় আয়নাটি উল্টে গেলো না তো! দ্বিতীয়ত, অভিভাবকদের উদাসীনতা, অমানবিক প্রত্যাশা ও স্বেচ্ছাচারিতা। জন্ম থেকেই প্রত্যেকটা বাবা-মায়ের একমাত্র ইচ্ছা তার সন্তান ডাক্তার না হয় ইঞ্জিনিয়ার হবে। তাই একটু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার সন্তানের বইয়ের সংখ্যা বাড়তে থাকে। একসময় তার ওজনের থেকে বইয়ের ওজন বেশি হয়। এভাবেই সমাজে ভালো ও দক্ষ মানুষের সংখ্যা দিন দিন কমে যায়। যে সমাজে জিপিএ-৫ হয় ভালো ছাত্রের একমাত্র মানদণ্ড, সে সমাজ থেকে রবীন্দ্রনাথ, বঙ্গবন্ধু কিংবা বেগম রোকেয়া আশা করাটা নিতান্তই বোকামি। তাই এরকম মানসিকতা থেকে আমাদের অভিভাবকদের বেড়িয়ে আসতে হবে। আমাদের সন্তানদের হূদয়ে ছোটবেলা থেকে স্থায়ীভাবে এঁকে দিতে হবে যে, ভালো ছাত্র হওয়ার আগে ভালো মানুষ হওয়াটা জরুরি। কেবল পরিবারই পারে একটি সন্তানের সম্ভাবনার পথ উন্মুক্ত করে দিতে। একবার পরীক্ষায় খারাপ করায় স্কুল থেকে চিঠি দিলো টমাস আলভা এডিসনের মায়ের কাছে। এডিসনের মা পড়ে শোনালেন— ‘আপনার পুত্র খুব মেধাবী, এই স্কুলটি তার জন্য অনেক ছোট এবং এখানে তাকে শেখানোর মতো যথেষ্ট প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক নেই। দয়া করে আপনি নিজেই তার শিক্ষার ব্যবস্থা করুন’। বহুবছর পর একদিন এডিসন পুরনো কাগজ নাড়াচাড়া করতে গিয়ে সেই চিঠিটা পান এবং দেখেন সেখানে লেখা ছিলো- ‘আপনার সন্তান স্থূলবুদ্ধিসম্পন্ন, সে এই স্কুলের উপযুক্ত নয়, আমরা কোনোভাবেই তাকে আমাদের স্কুলে আর আসতে দিতে পারি না’। তারপর এডিসন অশ্রুসিক্ত অবস্থায় তাঁর ডায়রিতে লিখেন, ‘টমাস আলভা এডিসন একজন স্থূলবুদ্ধিসম্পন্ন শিশু ছিলেন। একজন আদর্শবান মায়ের অনুপ্রেরণায় তিনি শতাব্দীর সেরা মেধাবী হয়ে উঠেন’।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
