মুক্তা আক্তার
বাংলাদেশে চলমান সমস্যাগুলোর মধ্যে অগ্নিদুর্ঘটনা এখন খুব বেশি দেখা দিয়েছে। হর-হামেশাই কোথাও না কোথাও আগুন লেগেই যাচ্ছে। বিষয়টা বেশ অদ্ভুত যে, কোনো সমস্যা একবার শুরু হলে লাগাতার বেশ কিছুদিন সেটা এমনভাবে চলতে থাকে যেন ঐ সমস্যার একটা ঋতু চলছে। যেমন ধর্ষণের কোনো একটা ইস্যু নিয়ে মিডিয়া তোলপাড়, এরপর টানা দেশজুড়ে বেশ কিছুদিন ধর্ষণ চলতে থাকে। রানা প্লাজা ধসের কথা মনে আছে নিশ্চয়ই? সেই সঙ্গে মনে থাকার কথা যে, রানা প্লাজা ধসের কিছুদিন পর-পরই দেয়ালে ফাটলসহ বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিচ্ছিল। আর বর্তমানে চলছে আগুন আগুন খেলা। সড়ক দুর্ঘটনার কথা লক্ষ্য করলেও একই বিষয় লক্ষ্য করা যায়। উপরোক্ত ঘটনা থেকে আমি পরিষ্কার করতে চেয়েছি যে, কোনো সমস্যা শুরু হবার আগেই আমরা সচেতন নই কেন?
বাংলাদেশে গার্মেন্টস কারখানা, শিল্প, বহুতল বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবন, শপিং মল সবক্ষেত্রে অগ্নি দুর্ঘটনা ঘটছে। আগুন লেগে বহু মানুষের মৃত্যুর নজির রয়েছে। ২০১২ সালে তাজরিন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ডে মারা যায় শতাধিক শ্রমিক।
বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বরের পর বড় ধরনের কোনো অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেনি। ২০১৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী সারা দেশে ছোট-বড় মিলিয়ে মোট অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ৪৮ হাজার ৫৪টি। এতে মোট ৪ হাজার ১৪০ জন হতাহত হয়েছেন।
এ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৩ সালে পোশাক কারখানায় ঘটেছে ২৫৩টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। ২০১৪ সালে এ সংখ্যা ১৫২ এবং ২০১৫তে ১২৪টি। এ হিসাবে তিন বছরে পোশাক কারখানায় মোট ৫২৯টি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। এতে নিহত ও আহত মিলে ২২ জন হতাহত হয়েছেন। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৮ সালে সারাদেশে ৮ হাজার ৪৬১টি আবাসিক ভবনে আগুনের ঘটনা ঘটেছে। এর ২০৮৮টি ঢাকায়, চট্টগ্রামে ২৮৫ ও রাজশাহীতে ১১৬টি। দেশের গার্মেন্টগুলোতে ১৭৩টি আগুনের ঘটনা ঘটেছে এর মধ্যে ১১৫টি ঢাকায়। শিল্প কারখানায় ১১৩১টি আগুনের ঘটনার মধ্যে ৫২৬টি ঢাকায়। আর ২০১৯ সালে যেন অগ্নিকাণ্ডের হিড়িক পড়ে গেছে যেখানে একটার পর একটা ভয়ংকর অগ্নিকাণ্ডের সাক্ষী বহন করছে বর্তমান সমাজ। চক বাজারের ঘটনার রেশ কাটিয়ে ওঠার আগেই বনানীতে ঘটে যাওয়া অগ্নিকাণ্ডে ঝরে গেল আরো ২৫টি তাজা প্রাণ। এরপর গুলশানের ডিএনসিসি মার্কেটের কাঁচাবাজারে আগুনে পুরে যাওয়া ছয় শতাধিক দোকান নয়, যেন নিম্ন কিংবা নিম্ন-মধ্যবিত্ত ছয় শতাধিক পরিবারের স্বপ্ন। ছোট ছোট অগ্নিকাণ্ড এখন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়ে যাচ্ছে। কুমিল্লার ইপিজেড, আর এন টেক্সটাইলে অগ্নিকাণ্ড আবারো সেই ধারণাকে বিম্বানে রূপান্তরিত করার জন্যই ঘটে গেল।
এখন প্রশ্ন হলো যে, অগ্নিকাণ্ডের মতো মহামারী দুর্ঘটনার শিকার হয়ে আমরা কতটুকু সচেতন? আদৌ কী মানুষের প্রাণের মায়া আছে? যদি থেকে থাকে তো এই মানুষগুলোর জীবন নিয়ে এতটা দ্বায়িত্বহীনতার দায় কার? কে দেবে নিশ্চয়তা আর কীভাবে হবে হারানো জীবনের ক্ষতিপূরণ? প্রশ্নগুলো খুব ভারি হয়ে গেলেও উত্তর কিন্তু সকলের জানা।
আমরা জেনে এসেছি যে, প্রতিকারের তুলনায় প্রতিরোধ সবসময়ই অধিক ফলপ্রসূ; কিন্তু দুর্ঘটনা কোনো আগাম বার্তা দিয়ে আসে না তাই সবসময় সচেতন থাকার পাশাপাশি বিপদে মাথা ঠাণ্ডা রেখে পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। অগ্নিকাণ্ড সম্পর্কে নানাবিধ তথ্য জেনে রাখার সঙ্গে চাই বিপদ থেকে বেরিয়ে আসার পন্থা সম্পর্কিত বাস্তব জ্ঞান। এ মহামারি সমস্যা শুরু হলে যেহেতু নিয়ন্ত্রণ করা সময়সাপেক্ষ ও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ তাই আমি মনে করি প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করার কোনো বিকল্প নেই।
নিরাপদ ও সুস্থ জীবনযাপনের প্রত্যাশা নিয়ে রোজ শুরু করা দিনের জন্য নিজেকে গুছিয়ে নিতে হবে। একটি দুর্ঘটনা আপনার ও আপনার পরিবারের জন্য সারা জীবনের কান্নার কারণ না হয় তার প্রতি সচেতন হতে হবে। ফায়ার সার্ভিস, সাধারণ মানুষ, কর্তৃপক্ষ, সিলিন্ডার কোম্পানি, ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক সংযোগদাতা কিংবা রাষ্ট্রকে দোষারোপ করার পূর্বে নিজ নিজ স্থান থেকে সচেতনতা বৃদ্ধি করুন। মনে রাখবেন, জীবন হারাবার পর উপরোক্ত পক্ষের লোকজন শুধু ‘আমরা শোকাহত’ কিংবা নামমাত্র কিছু ক্ষতিপূরণের মধ্যদিয়ে তাদের দ্বায়িত্ব শেষ মনে করে তবে তাতে হারানো জীবন ফিরে আসে না, কমে না পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতির পরিমাণ। সর্বোচ্চ সচেতনতার সঙ্গে কাটুক আমাদের প্রতিটা দিন।
n লেখক :শিক্ষার্থী, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
