মো. রাশেদ আহমেদ
মেধা একটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। মেধাকে রত্নের সঙ্গে তুলনা করলে ভুল হবে না। কারণ রত্নের চাইতে মেধা অনেক বেশি মূল্যবান। সাম্প্রতিককালে একটি তথ্য প্রকাশ পেয়েছে যে, অর্থ পাচারে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয় এবং ধনী হওয়ার দিক থেকে প্রথম। কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী না করে উন্নয়নের দিকে জোর দেওয়াই এর সংখ্যা বেড়েছে। এসব অর্থ পাচার সংকট যে কোনোভাবে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব কিন্তু মেধা পাচার হয়ে গেলে সেই মেধা আর ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা থাকে না বললেই চলে। যা একটি দেশের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। এই মেধা পাচারের কারণে একটি দেশ সবচেয়ে মেধাবী, জ্ঞানী, দক্ষ ও যোগ্য নাগরিককে হারায়। মেধা পাচারর মধ্যে বেশি দেখা যায় এশিয়া মহাদেশে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলো। যার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। প্রতিবছর এর সংখ্যা বেড়েই চলছে। যা খুবই হতাশাজনক। কারণ একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর পেছনে সরকার লাখ লাখ অর্থ ব্যয় করে। মেধা পাচার শুধু শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে নয়, সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
বিশ্ববিদ্যালয় অনেক শিক্ষক আছে যারা উচ্চতর ডিগ্রি নেওয়ার জন্য স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে যায়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে তারা আর দেশে ফেরার জন্য খুব বেশি আগ্রহ প্রকাশ করে না। সেখানেই তারা স্থায়ী হয়। যার কারণে ১৯৭২ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০০ জনেরও অধিক শিক্ষককে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল। ২০১২ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১৫০ জন শিক্ষক উচ্চতর ডিগ্রি নেওয়ার জন্য বিদেশে গিয়েছিলেন। যার মধ্যে ফিরে এসেছেন ৫০ জনেরও কম। বাকিরা ফিরবেন কি না তা অনিশ্চিত। একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, বিদেশে গিয়ে (৩০-৪০%) শিক্ষক ফিরে আসেন। এটা শুধু শিক্ষকদের ক্ষেত্রে নয়, মেধাবী তরুণদের একটি অংশ প্রতিবছর উচ্চশিক্ষা নিতে বিদেশে যায়, এরপর তাদের দেশে ফেরার কোনো লক্ষ্য থাকে না। কারণ আমাদের দেশে পর্যাপ্ত গবেষণার সুযোগ থাকে না, মেধার অবমূল্যায়ন করা হয়, উন্নত জীবনের নিশ্চয়তা থাকে না, পেশাগত পদায়নে রয়েছে দলবাজি, লালফিতার দৌরাত্ম্য ইত্যাদি। বুয়েট থেকে পাস করা একজন মেধাবী ছাত্র বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তার কাছে অসহায়। যার অধীনে তাকে কাজ করতে হয়। অথচ বুয়েটের ছাত্রদের গবেষণা করার মতো পর্যাপ্ত কোনো সুযোগ নেই। যার ফলে মেধা পাচারে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও অনেকটা দায়ী। কারণ উচ্চতর পাঠন ও যথাযথ সুযোগ-সুবিধা না থাকায় অনেক ছাত্র বাধ্য হয়ে বিদেশের দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং সেখানে বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা পায়। যেটা আমাদের দেশে নেই বললেই চলে। ন্যাশনাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি পলিসি-২০১০-এ বলা হয়েছে যে, বিজ্ঞান প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে মেধা পাচার প্রবণতা। দেশে মেধাবীদের যথাযথভাবে মূল্যায়ন না করা, কোটা সিস্টেম থাকার কারণে চাকরির নিশ্চয়তা না পেয়ে অনেকটা হতাশ হয়ে বিদেশের দিকে ধাবিত হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের মাননীয় চেয়ারম্যান প্রফেসর আবদুল মান্নান বলেন—পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিজন শিক্ষার্থীর পেছনে সরকার গড় প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা ভর্তুকি দিয়ে থাকে। এসব জনগণের অর্থ। জনগণের অর্থ পড়াশুনা করে দেশে ফিরে না আসা অনৈতিক, অনেকটা বিশ্বাসঘাতকতার শামিল। ২০২১ সালে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালে উন্নত রাষ্ট্র গড়ার লক্ষ্যে মেধা পাচার রোধে বিকল্প কোনো পথ নেই। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায় মেধা পাচার রোধ করে খুব সহজে একটি দেশকে সমৃদ্ধশালী করা সম্ভব।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
