নীরব হল গানের বুলবুল

আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:৩৬
খসে পড়লো সঙ্গীতাকাশের ধ্রুবতারা। আমাদের জীবনের অনেক শূন্যতা সুরের মাধুরীতে ভরিয়ে দিয়ে মিলিয়ে গেলেন সঙ্গীতগুরু সোহরাব হোসেন। গতকাল বৃহস্পতিবার ভোর ৬টা ২৫ মিনিটে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্নালিল্লাহি.....রাজিউন)। সোহরাব হোসেন শিল্পী হিসাবে ছিলেন যেমন অতুলনীয়, সঙ্গীতগুরু হিসেবেও সৃষ্টি করেছেন অসংখ্য গুণী শিল্পী। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের নজরুল সঙ্গীতের এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের অবসান ঘটলো। শিল্পীর মৃত্যর সংবাদ রাজধানীতে ছড়িয়ে পড়লে সংস্কৃতি অঙ্গন থেকে শুরু করে সর্বত্র শোকের ছায়া নেমে আসে। শিল্পী সোহরাব হোসেনের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ জিল্ল¬ুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া পৃথক বাণীতে গভীর শোক এবং দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তার বয়স হয়েছিল ৯১ বছর। রেখে গেছেন স্ত্রী সুরাতুন্নেচ্ছা, তিন মেয়ে রওশন আরা সোমা, রাহাত আরা গীতি ও রিফাত আরা রিতা এবং দুই ছেলে মোয়াজ্জেম হোসেন ও মারুফ হোসেন। বৃহস্পতিবার সোহরাব হোসেনের মরদেহ স্কয়ার হাসপাতালের হিমাগারে রাখা হয়। আজ শুক্রবার বাদ জুম্মা মোহাম্মপুরের ইকবাল রোডে তার বাসার পাশের মসজিদে নামাজে জানাজা শেষে তাকে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হবে। এর আগে তার মরদেহ ছায়ানট, নজরুল ইন্সটিটিউট হয়ে নিয়ে যাওয়া হবে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য। বেলা ১১টা থেকে ১২টা পর্যন্ত তার মরদেহ সেখানে রাখা হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব সোহরাব হোসেনের জামাতা নজরুল ইসলাম জানান, দীর্ঘদিন ধরে তিনি বহুমূত্রসহ বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন। শুক্রবার ভোরে তার একটি হার্ট অ্যাটাক হয়। এরপর ৬টা ২৫ মিনিটে চিকিত্সকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তিনি নেফ্রোলজি বিভাগের ডা. আব্দুল ওহাব খানের অধীনে নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে চিকিসাধীন ছিলেন। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত নভেম্বর মাসে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সে সময় তার খাওয়ায় অরুচি এবং বিভিন্ন ঠাণ্ডাজনিত সমস্যা ছিল। পরে গত ১৩ ডিসেম্বর তাকে বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে ১৬ ডিসেম্বর তাকে আবারো হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ সময় তার হূদযন্ত্রেও সমস্যা দেখা দেয়। একই সাথে তার বুকে প্রচুর পরিমাণে কফ জমে। সোহরাব হোসেনের মৃত্যুর সংবাদ শুনে স্কয়ার হা্সপাতালে ছুটে আসেন সঙ্গীতজ্ঞ ও তার বন্ধু সুধীন দাস, সন্জীদা খাতুন, কামাল লোহানী, শাহীন সামাদ, খায়রুল আনাম শাকিল, ডালিয়া নওশিন, সাদিয়া আফরিন মল্লিক, রফিকুল আলমসহ তার ভক্ত-অনুরাগীরা। সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানী বলেন, একজন মানুষ হিসাবেও সোহরাব হোসেন ছিলেন অসাধারণ। তিনি মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে দেশের সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেন। এ দেশের নজরুল সঙ্গীতের চর্চার ক্ষেত্রে তিনি বিরাট অবদান রেখেছেন। ছায়ানটের প্রতিষ্ঠাকাল থেকে তিনি সহযোগিতা করেছেন। এ প্রতিষ্ঠানের নজরুল সঙ্গীত বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। তার সব শিক্ষার্থী আজ দেশের বড় বড় শিল্পী। আজকে নতুন প্রজন্ম তার সম্পর্কে তেমন একটা জানে না। তাদের মাঝে তার কাজকে ছড়িয়ে দিতে হবে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী শাহীন সামাদ বলেন, ছায়ানটে সোহরাব হোসেনের কাছে আমি গান শিখেছি। তার হাতেই আমার সঙ্গীত শিক্ষা। গানের শিক্ষক হিসেবে তিনি যা দিয়েছেন, তা কখনো ভুলব না। তিনি চলে গেলেও হাজার হাজার শিল্পী রেখে গেছেন। জীবনের সবটুকু ভালোবাসা তার জন্য। বাকি জীবন তাকে স্মরণ করে বাঁচবো। আর ছায়ানটের শিক্ষার্থীদের মাঝে তার শিক্ষা ছড়িয়ে দেব। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রীর শোক রাষ্ট্রপতি তার শোকবাণীতে বলেন, শুদ্ধ ও ধ্রুপদী সঙ্গীত চর্চা এবং এর উন্নয়নে সোহরাব হোসেনের অবদান জাতি চিরদিন শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে। প্রধানমন্ত্রী শিল্পীর মৃত্যুতে শোক ও দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, শুধু দেশেই নয়, উপমহাদেশে নজরুল গীতিসহ সঙ্গীতের নানাক্ষেত্র প্রসারের ক্ষেত্রে শিল্পী প্রভূত অবদান রেখে গেছেন। তার অবদান জাতি চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। বিরোধীদলীয় নেত্রী শোকবার্তায় বলেন, সোহরাব হোসেন নজরুল সঙ্গীত চর্চার মাধ্যমে নজরুল সঙ্গীতকে যে ধারায় উত্তীর্ণ করেছেন তা চিরকাল মানুষের হূদয়ে জাগরুক থাকবে। এছাড়াও স্পিকার এডভোকেট আবদুল হামিদ ও ডেপুটি স্পিকার শওকত আলী অপর এক শোকবাণীতে শিল্পীর মৃত্যুতে শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেন। শোক প্রকাশ করে বাণী দিয়েছে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। সংক্ষিপ্ত জীবনী সোহরাব হোসেন ১৯২২ সালের ৯ এপ্রিল তত্কালীন অবিভক্ত ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নদীয়া জেলার রানাঘাট শহরের কাছে আয়েশতলা গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন সঙ্গীত অনুরাগী। নয় বছর বয়সে তিনি রানাঘাটের এক আসরে প্রথমবারের মতো শোনেন নজরুলের গান। এরপরেই তিনি নজরুলের গানের প্রেমে পড়ে যান। এ সময় তিনি জয়নুল আবেদীন নামের একজন শিক্ষকের কাছে প্রথম তালিম নেন। পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ার সময় তার গান নজরে পড়ে জমিদার ক্ষীরোদ পাল চৌধুরীর। তিনি তাকে কিরণ দে চৌধুরী নামে একজন সঙ্গীতগুরুর কাছে তালিম নিতে পাঠান। এছাড়াও তিনি প্রখ্যাত নজরুল সঙ্গীত শিল্পী পূরবী দত্তের বাড়িতে তার দাদার গান শিক্ষার আসরে গান শুনতে যেতেন। তবে তার এ গানপ্রীতি ভালো চোখে দেখেনি তার পরিবার। তারা তার লেখাপড়া বন্ধ করে দিয়ে তাকে পারিবারিক ব্যবসার কাজে নিয়োজিত করেন। কিন্তু তাতেও থেমে থাকেনি তার সঙ্গীতচর্চা। রানাঘাটে একবার শিল্পী আব্বাস উদ্দীন, ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খসরু, পল্লীকবি জসীম উদ্দীন এবং তবলা বাদক বজলুল করিমের সাথে একই মঞ্চে সঙ্গীত পরিবেশন করেন সোহরাব হোসেন। তার শিক্ষক কিরণ দে চৌধুরীর মাধ্যমে পরে কলকাতায় গিয়ে শ্রীরঙ্গম থিয়েটারে মাসে ১২ আনা বেতনে গান গাওয়ার কাজ পান তিনি। পরে ১৯৪৬ সালে আব্বাস উদ্দীনের মাধ্যমে একটি পাবলিসিটি বিভাগে চাকরি পান। এ সময়ই তিনি এইচএমভি ও রেডিওতে অডিশনে পাস করেন। কলকাতায় তিনি আঙ্গুরবালা, ইন্দুবালা, গিরীন চক্রবর্তী, কৃষ্ণচন্দ্র দের মতো বিশিষ্ট শিল্পীদের সাহচর্যে আসেন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর ঢাকায় চলে আসেন তিনি। তিনি আব্বাস উদ্দীনের মাধ্যমে ৪১ জিন্দাবাজার লেনের একটি বাড়িতে ওঠেন। চাকরি পান তথ্য বিভাগে। এছাড়াও তিনি নিয়মিত রেডিওতে অনুষ্ঠান এবং টিউশনিও করতেন। ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁ, শিল্পী শচীন দেব বর্মণ এবং অঞ্জলি মুখার্জীর সঙ্গেও ছিল তার ঘনিষ্ঠতা। তিনি আব্বাস উদ্দীনের সঙ্গে বাংলাদেশের নানা স্থানে ঘুরেছেন এবং গান গেয়ে বেড়িয়েছেন। সঙ্গীত শিক্ষক হিসেবেও তিনি ছিলেন জনপ্রিয়। তিনি বুলবুল ললিতকলা একাডেমী, ছায়ানট, শিল্পকলা একাডেমী ও নজরুল একাডেমীতে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেন। সর্বশেষ শিক্ষকতা করেন নজরুল ইনস্টিটিউটে। তার কাছে যারা গান শিখেছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন—সঙ্গীতজ্ঞ ড. সন্জীদা খাতুন, শিল্পী খায়রুল আনাম শাকিল, আতিকুল ইসলাম, শাহীন সামাদ, সাদিয়া আফরিন মল্লিক, মাহমুদুর রহমান বেনু প্রমুখ। নজরুল সঙ্গীতের পাশাপাশি তিনি আধুনিক গানেও পারদর্শী ছিলেন। চলচ্চিত্রেও প্লে-ব্যাক করেছেন সোহরাব হোসেন। তার প্লে-ব্যাক করা চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে—মাটির পাহাড়, যে নদী মরুপথে, গোধূলির প্রেম, শীত বিকেল ও এদেশ তোমার আমার। শুধু সঙ্গীতেই নয়, অভিনয়ও করেছেন সোহরাব হোসেন। কার্জন হল মঞ্চে নাটকে অভিনয় করেছেন। তিনি তুলসী লাহিড়ীর ‘ছেঁড়া তার’ নাটকে অভিনয় করে দর্শকনন্দিত হয়েছিলেন। নজরুল সঙ্গীতে অনবদ্য অবদানের জন্য সোহরাব হোসেন স্বাধীনতা পদক, মেরিল-প্রথম আলো আজীবন সম্মাননা, নজরুল একাডেমী পদক, চ্যানেল আই পদকসহ অসংখ্য সম্মাননা পেয়েছেন। সোহরাব হোসেন নজরুল সঙ্গীত প্রামাণীকরণ পরিষদ ও নজরুল ইনস্টিটিউট ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য এবং ছায়ানটের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন।