উনিই সাপের ঝাঁপি মাথায় নিয়ে চলছেন : প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:৩৬
প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আওয়ামী লীগ নয়, বিরোধী দলীয় নেত্রীই সাপ নিয়ে খেলছেন। উনি সাপের ঝাঁপি মাথায় নিয়ে চলছেন। খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ্য করে শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগকে উনি সাপ বলছেন আর বিজয়ের মাসে যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার জন্য মাঠে নেমেছেন। পুড়িয়ে মানুষ মারছেন। খালেদা জিয়া চেষ্টা করেও বঙ্গবন্ধুর খুনিদের রক্ষা করতে পারেননি উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, উনি যুদ্ধাপরাধীদেরও রক্ষা করতে পারবেন না। তাদের বিচার চলছে, চলবে। বিচার সম্পন্ন হয়ে দোষীরা উপযুক্ত শাস্তি পাবে। গতকাল বৃহস্পতিবার ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলনের উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলীয় নেত্রীকে উদ্দেশ করে বলেন, আওয়ামী লীগের ওপর আপনার এতো রাগ কেন? বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ দেশ স্বাধীন না করলে আপনার স্বামী মেজর থেকে মেজর জেনারেল হতে পারতেন না। আপনার স্বামীকে আওয়ামী লীগই পদোন্নতি দিয়েছিল। উল্লেখ্য, গত বুধবার রাজধানীর বিভিন্ন পথসভায় বিরোধী দলীয় নেত্রী তার বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘সাপকে বিশ্বাস করা যায় কিন্তু আওয়ামী লীগকে নয়।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিরোধী দলীয় নেত্রী যদি আওয়ামী লীগকে সাপ বলেন তাহলে যুদ্ধাপরাধীরা কী? তারা কী ফেরেশতা? যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার নামে রাজপথে আগুন দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে না মারার জন্যও তিনি বিরোধী দলীয় নেত্রীর প্রতি আহ্বান জানান। তিনি আগামী দিনের যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় দলের নেতাকর্মীদের সদা প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেন। ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান বর্ণাঢ্য সাজে সাজানো হয়েছিল। জাতীয় সঙ্গীতের তালে জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং পায়রা ও বেলুন উড়িয়ে সম্মেলনের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় নগরীর ২৪ থানা, ৬১ ওয়ার্ড এবং ১৯ ইউনিয়নের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা স্ট্যান্ডে গিয়ে দলীয় পতাকা উত্তোলন করেন। এরপর দেশাত্ববোধক গান পরিবেশন করেন শিল্পীরা। বুধবার বিভিন্ন পথসভায় সরকারকে ‘দুর্নীতিবাজ’ আখ্যায়িত করে দেয়া খালেদা জিয়ার বক্তব্যের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার কথা শুনে মনে হয় ‘চোরের মায়ের বড় গলা’। বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে বাংলাদেশ দুর্নীতিতে পাঁচবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল, নিজে প্রধানমন্ত্রী হয়ে দুর্নীতির কালো টাকা জরিমানা দিয়ে সাদা করেছেন, তার গুণধর পুত্রদের দুর্নীতির পাচারকৃত অর্থ বিভিন্ন দেশ থেকে আমরা ফিরে আনতে সক্ষম হয়েছি। তার মুখে দুর্নীতির কথা শোভা পায় না। মহানগর আওয়ামী লীগের এ সম্মেলনে শেখ হাসিনা আরো বলেন, হত্যা, খুন, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসই ছিল খালেদা জিয়ার নীতি। তার আমলে অত্যাচার-নির্যাতনের কথা দেশের জনগণ ভুলে যায়নি। সেজন্য দেশের মানুষ আর খালেদা জিয়ার দুঃশাসনের যুগে ফিরে যেতে চায় না। কারণ তার আমলে মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও প্যাগোডা কিছুই রক্ষা পায়নি। সে সময় একদিনে দেশের পাঁচশ’ স্থানে বোমা হামলা, জঙ্গিবাদের উত্থান আর ২১ আগস্ট প্রকাশ্য দিবালোকে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে মানুষ খুন করার ইতিহাস দেশের জনগণ ভুলে যায়নি। শেখ হাসিনা বলেন, আমরা প্রতিহিংসার রাজনীতি করি না বলেই দেশের উন্নয়নে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছি। যখন তাদের অপকর্মের বিচার শুরু হয়েছে, তখন দেশবাসীর সামনে অতীত ইতিহাস স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের হত্যার পর চট্টগ্রামের স্থানীয় থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছিল। হত্যা মামলা কখনো তামাদি হয়ে যায় না। কিন্তু দুই দুইবার ক্ষমতায় আসার পর খালেদা জিয়া কেন তার স্বামীর হত্যার বিচার করলেন না? জাতি তা জানতে চায়। প্রধানমন্ত্রী স্মরণ করিয়ে দেন, বিরোধী দলীয় নেত্রী থাকা অবস্থায় গুলিস্তানে প্রকাশ্য জনসভায় খালেদা জিয়া বলেছিলেন, এরশাদ জিয়াউর রহমানের হত্যাকারী। অথচ যাকে তিনি স্বামী হত্যাকারী বললেন, সেই এরশাদের কাছ থেকে খালেদা জিয়া গাড়ি, বাড়ি ও অর্থ নিয়েছেন। বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন। কী ভাবে তিনি স্বামী হত্যাকারীর কাছ থেকে সুবিধা নেন তা জাতি জানতে চায়। নগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এম এ আজিজের সভাপতিত্বে শুরু হয় সম্মেলনের প্রথম অধিবেশন। অনুষ্ঠানের শুরুতেই শেখ হাসিনার বিশ্ব শান্তির মডেল জাতিসংঘে সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহীত হওয়ায় সম্মেলনে যোগদানকারী হাজার হাজার নেতাকর্মী দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দিত করেন। প্রথমেই শোকপ্রস্তাব উত্থাপন করেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য হাজী মোহাম্মদ সেলিম। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্মেলনস্থলে আসার আগেই কানায় কানায় ভরে যায় সম্মেলন প্রাঙ্গণ। দ্বিতীয় অধিবেশন শুরুর আগে নগর কমিটির নেতাদের সমর্থন নিয়ে ঢাকা মহানগর কমিটি গঠনের সম্পূর্ণভার শেখ হাসিনার ওপর অর্পণ করা হয়। উপস্থিত কাউন্সিলর ও ডেলিগেটরা তাতে সমর্থন জানান। আগামীকাল শনিবার আওয়ামী লীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলনের পর কেন্দ্রীয় ও মহানগর দুটি কমিটিই ঘোষণা করা হবে বলে জানা গেছে। প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী মুলত বুধবার ঢাকার পথসভায় খালেদা জিয়ার বিভিন্ন বক্তব্যের জবাব দেন। তিনি বলেন, খালেদা জিয়া যখনই ক্ষমতায় আসেন তখনই দেশের মানুষের ঘুম হারাম হয়ে যায়। দেশের প্রতিটি ঘরে ঘরে জোট সরকারের অত্যাচার-নির্যাতনের চিহ্ন আজও স্পষ্ট। তার পুত্র সম্পর্কে খালেদা জিয়ার মন্তব্যের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা ছেলে-মেয়েদের উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করেছি। আমার পুত্র বিশ্বখ্যাত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করেছে, মেয়েও খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করেছে। কিন্তু খালেদা জিয়া তার দুই পুত্রকে কী শিক্ষা দিয়েছেন? সরকারি কোষাগার থেকে অর্থ নিয়ে উনি তার ছেলেদের জন্য কী ডিগ্রি এনেছেন? যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে তার সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আমাদের নির্বাচনী অঙ্গীকার। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কাজ শুরু করেছিলেন, প্রায় ২১ হাজার যুদ্ধাপরাধী কারাগারে বন্দী ছিল। কিন্তু জিয়াউর রহমান মার্শাল ‘ল’ অর্ডিন্যান্স দিয়ে এই বিচার বন্ধ করে দেন এবং যুদ্ধাপরাধীদের কারাগার থেকে ছেড়ে দিয়ে রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, খালেদা জিয়া ক্ষমতায় গিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রী বানিয়ে তাদের গাড়িতে বাড়িতে লাখো শহীদের রক্তস্নাত জাতীয় পতাকা তুলে দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ভোটারবিহীন নির্বাচনে এমপি বানিয়ে পাশে বসিয়েছেন। বিশ্বব্যাংকের প্রসঙ্গ টেনে শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপি-জামায়াত জোটের দুর্নীতির কারণেই বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশে অর্থায়ন বন্ধ করে দিয়েছিল। এখন বিশ্বব্যাংক বলছে দুর্নীতি নয়, দুর্নীতির চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু এর নেপথ্যে বা পেছনে কে আছে আমরা তা জানি। আমরা দুর্নীতি করতে ক্ষমতায় আসিনি, আমরা জনগণের কল্যাণের জন্য এসেছি। হলমার্ক বা ডেসটিনির কেলেঙ্কারির ঘটনা আমরাই ধরেছি। বিএনপির আমলেই তো এদের উত্থান হয়েছিল। হাওয়া ভবন থেকেই হলমার্কের উত্থান। সংগঠনকে শক্তিশালী করে গড়ে তোলা এবং সরকারের চার বছরের সাফল্যে জনগণের মাঝে তুলে ধরার জন্য দলের নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, ক্ষমতায় থাকতে দুর্নীতি করে বিএনপি-জামায়াত বিপুল পরিমাণ কালো টাকার মালিক হয়েছে। আর আমাদের আছে মনোবল আর দেশের জনগণের প্রতি আস্থা। তাই যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগসহ দলের প্রতিটি নেতা-কর্মীকে সদা প্রস্তুত থাকতে হবে। সংগঠনকে শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে হবে। সম্মেলনে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন সংসদ উপনেতা ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। সৈয়দ আশরাফুল তার বক্তৃতায় বার বার তাগিদ দেয়ার পরও ঢাকা মহানগরীতে দলের সদস্য সংগ্রহ অভিযান শুরু করতে না পারা এবং একটি থানা বা ওয়ার্ডে কাউন্সিল করে কমিটি পুনর্গঠন করতে না পারার জন্য বর্তমান কমিটির প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।