আর্থিক সূচকে আশার বারতা

আপডেট : ২৮ ডিসেম্বর ২০১২, ১৮:৫১
বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে দেশের অর্থনীতি চ্যালেঞ্জের মুখে ছিল। কারণ ২০০৯ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সঙ্কটে উন্নত বিশ্বসহ বিকাশমান অর্থনীতির দেশগুলোর আর্থিক খাতে সৃষ্ট অস্থিতিশীলতা শুরু হয়। সেই অস্থিতিশীল পরিস্থিতিকে সামাল দিতে না দিতেই ২০১১ ও ১২ পরপর দু’বছরই বিশ্ব অর্থনীতি আবার মন্দার কবলে পড়ে। দু’দফা ওই বিশ্ব মন্দা মোকাবেলা করেও দেশের অর্থনীতি শক্ত ভিতের উপর দাঁড়াতে পেরেছে। সরকারের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের যথোপযুক্ত নীতির কারণে এটা সম্ভব হয়েছে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক বিগত চার বছরের (২০০৯-১২) আর্থিক খাতের সূচকগুলোর উন্নতি বিষয়ে একটি তুলনামূলক প্রতিবেদন তৈরি করেছে। এতে সামষ্টিক অর্থনীতির মুখ্য সূচকসমূহ যেমন- জিডিপি, আমদানি-রপ্তানি, রেমিট্যান্সের অন্তঃপ্র্রবাহ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভসহ বিভিন্ন বিষয় উঠে এসেছে। এদিকে সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জানিয়েছেন, বিশ্বে অর্থনৈতিকভাবে প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ পঞ্চম স্থানে রয়েছে। সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের তালিকায় থাকা চীন, ব্রাজিল, সিঙ্গাপুর ও তুরস্কের পরই রয়েছে বাংলাদেশ। অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী মন্দা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক ঋণমান যাচাইকারী দু’টি প্রতিষ্ঠান স্ট্যান্ডার্ড এন্ড পুওর’স এবং মুডি’স-এর স্বতন্ত্র মূল্যায়নে ২০১০ সালে বাংলাদেশ সন্তোষজন সার্বভৌম ঋণমান অর্জন করে এবং এ ঋণমান যথাক্রমে বিবি মাইনাস ও বিএথ্রি। বিশ্বের অনেক ধনী দেশের ঋণমানে অবনমন ঘটলেও বাংলাদেশ ২০১১ ও ২০১২ সালেও প্রতিষ্ঠান দু’টির রেটিংয়ে একই ঋণমান ধরে রাখতে পেরেছে। যা দেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিকে স্বীকৃতি দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আলোচ্য সময়ে বাংলাদেশে বিশ্বমন্দার প্রভাব যথাসম্ভব সীমিত রাখা তথা সুখী, সমৃদ্ধ ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে সরকারের দীর্ঘমেয়াদী রূপকল্পের পর্যায়ক্রমিক বাস্তবায়নের সুগভীর প্রত্যয়ের প্রেক্ষাপটে আর্থিক ব্যবস্থার উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা আনয়ন, দ্রুত দারিদ্র্য বিমোচন এবং মানব-সমপদ উন্নয়নের জন্যে টেকসই সাম্য-সহায়ক প্রবৃদ্ধি অর্জনে একটি দক্ষ, প্রযুক্তিনির্ভর ও গতিশীল ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলাসহ বাংলাদেশ ব্যাংককে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর, অংশগ্রহণমূলক, মানবিক এবং জনহিতৈষী বৈশিষ্ট্যে রূপান্তর করার জন্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত চার অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে যথাক্রমে পাঁচ দশমিক ৭৪, ছয় দশমিক সাত, ছয় দশমিক ৭১ ও ছয় দশমিক ৩২ শতাংশ। গত চার অর্থবছরে জিডিপি গড় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ছয় দশমিক ২১ শতাংশ, যা আগের চার অর্থবছরের (২০০২-০৫) গড় প্রবৃদ্ধির তুলনায় শূন্য ৭৪ শতাংশ বেশি। চলতি ২০১২-১৩ অর্থবছরে সাত দশমিক দুই শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত চার অর্থবছরে রেমিট্যান্স এসেছে যথাক্রমে নয় দশমিক ৬৯, ১০ দশমিক ৯৯, ১১ দশমিক ৬৫ এবং ১২ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন ডলার। অর্থাত্ গড়ে রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ১১ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলার। মোট অঙ্কে আগের চার অর্থবছরের তুলনায় সাড়ে তিনগুণের বেশি রেমিট্যান্স এসেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (নভেম্বর পর্যন্ত) রেমিট্যান্স এসেছে ৬ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার। প্রতিবেদনে আরো দেখানো হয়েছে, গত চার অর্থবছরের মোট রপ্তানি আয় হয়েছে প্রায় ৭৯ বিলিয়ন ডলার, গড়ে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার। মোট অঙ্কে রপ্তানি আয় বেড়েছে দুই দশমিক ৭৯ গুণ। চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে রপ্তানি আয় হয়েছে ১০ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার, প্রবৃদ্ধি চার দশমিক ৩৬ শতাংশ। বিগত চার অর্থবছরে আমদানি ব্যয়েও প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এ সময়ে মোট আমদানি ব্যয় হয়েছে ১১৫ দশমিক ৩৫ কোটি ডলার, গড়ে ২৮ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন ডলার। মোট অঙ্কে আগের চার বছরের তুলনায় আমদানি ব্যয় বেড়েছে দুই দশমিক ৭৩ গুণ। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে আমদানি ব্যয় হয়েছে ১০ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ কম। ২০০৪-০৫ অর্থবছর শেষে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ ছিল দুই দশমিক ৯৩ বিলিয়ন ডলার, যা বেড়ে ২০০৯-১০, ২০১০-১১ ও ২০১১-১২ অর্থবছর শেষে যথাক্রমে ১০ দশমিক ৭৫, ১০ দশমিক ৯১ ও ১০ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। গত অক্টোবর ২০১২ মাসে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে এবং ২৩ ডিসেম্বর ২০১২ তারিখে রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ১২ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলার। অর্থাত্ রিজার্ভ চারগুণের বেশি বেড়েছে। বর্তমান রিজার্ভ চার মাসের আমদানি দায় মেটানোর জন্যে যথেষ্ট। বাংলাদেশ ব্যাংকের নানা প্রণোদনা ও প্রচারণা এবং স্থিতিশীল টাকার মূল্য এই সাফল্য অর্জনে অবদান রেখে চলেছে। দেশের ব্যাংকিং খাতও বেশ ভালো অবস্থানেই রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততা সংক্রান্ত ব্যাসেল-২ পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়িত হয়েছে। ব্যাসেল-২ মোতাবেক ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের ১০ শতাংশ মূলধন সংরক্ষণের আবশ্যকতার বিপরীতে ব্যাংকগুলো ৩০ জুন ২০১২ তারিখে ১১ দশমিক ৩১ শতাংশ এবং ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১২ তারিখে ১০ দশমিক ৮৫ শতাংশ মূলধন সংরক্ষণ করেছে। শিগগিরই ব্যাসেল-৩ বাস্তবায়নের জন্যেও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। গত চার বছরে ব্যাংকিং খাতের মূলধন ভিত্তির ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। ব্যাংকগুলোর মুনাফার একটা বড়ো অংশ মূলধনে স্থানান্তর হবার কারণে এটি ঘটেছে। ফলে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভিত্তি আরো শক্তিশালী হয়েছে। ২০০৮ সাল পর্যন্ত ব্যাংকগুলোকে ব্যাসেল-১ অনুযায়ী ঝুঁকিভিত্তিক মূলধন সংরক্ষণ করতে হতো। এ নীতিমালা মোতাবেক ২০০৮ শেষে ব্যাংকগুলোর সংরক্ষিত মোট মূলধনের পরিমাণ ছিল ২০ হাজার ৫৭৮ কোটি টাকা। পক্ষান্তরে, ব্যাসেল-২ নীতিমালা মোতাবেক ব্যাংকগুলোর রক্ষিতব্য মূলধনের (রিকোয়ার্ড ক্যাপিটাল) পরিমাণ যেমন বেড়েছে তেমনিভাবে গত চার বছরের ব্যবধানে (জুন ২০১২) ব্যাংকগুলোর সংরক্ষিত মূলধনের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৬ হাজার ২০১ কোটি টাকা। অর্থাত্ উক্ত সময়ে ব্যাংকিং খাতে মূলধন বৃদ্ধি পেয়েছে ৩৫ হাজার ৬২৩ কোটি টাকা। মূলধনের সার্বিক প্রবৃদ্ধি ঘটেছে ১৭৩ শতাংশ। গত ৩১ ডিসেম্বর ২০০৫ এ ব্যাংকিং খাতে শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ১৩ দশমিক ৬০ শতাংশ, তা কমে জুন ২০১২ তারিখে দাঁড়িয়েছে সাত দশমিক ১৭ শতাংশ। দেশের চরম দরিদ্র, ভূমিহীন, বর্গাচাষি, প্রান্তিক কৃষক, দরিদ্র নারী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, নারী উদ্যোক্তাসহ আর্থিক সেবাবঞ্চিত সকল শ্রেণীর মানুষের কাছে এখন ব্যাংক ঋণ ও আর্থিক সেবা পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে। গত চার অর্থবছরে কৃষি ঋণ বিতরণ করা হয়েছে যথাক্রমে নয় হাজার ২৮৪, ১১ হাজার ১১৭, ১২ হাজার ১৮৪ ও ১৩ হাজার ১৩৭ কোটি টাকা। মোট অঙ্কে আগের চার বছরের চেয়ে তিনগুণ বেশি কৃষি ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে ১৪ হাজার ১৩০ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। উপেক্ষিত বর্গাচাষিদের জন্য প্রথমবারের মতো ৫০০ কোটি টাকার একটি উদ্ভাবনীমূলক পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এ কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৪ লাখ ৮১ হাজার বর্গাচাষিকে ৫৭৭ কোটি টাকা অর্থায়ন করা হয়েছে। ২০০৯ সালে চালু হওয়া এ কর্মসূচির আওতায় প্রথমবারের মতো কৃষি ঋণ পাওয়ায় বর্গাচাষিরা প্রকৃতই উপকৃত হচ্ছেন এবং তাদের জীবনমানের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ঋণ পাওয়া বর্গাচাষিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ নারী কৃষক। কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে এসএমই খাতে অর্থায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০১০ সালে এসএমই ঋণ বিতরণ করা হয়েছে ৫৩ হাজার ৫৪৪ কোটি টাকা ও ২০১১ সালে বিতরণ করা হয়েছে ৫৩ হাজার ৭১৯ কোটি টাকা। ২০১২ সালে ৫৯ হাজার ১২ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে সেপ্টেম্বর ২০১২ পর্যন্ত বিতরণ করা হয়েছে ৪৯ হাজার ৬০৪ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৮৪ শতাংশ। দেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই নারী হওয়ায় অর্থনীতির মূল স্রোতে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি ও তাদের উদ্যোক্তা হওয়ার অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে ‘সুযোগের বাতায়ন’ খুলে দিতে কৃষি ও এসএমই খাতে স্বল্প সুদে নারীদের প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। এসএমই খাতের পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের ১৫ শতাংশ অর্থ কেবলমাত্র নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আওতায় এ পর্যন্ত ছয় হাজার ৩৬৫ জন নারী উদ্যোক্তাকে ৪৪৭ কোটি টাকা অর্থায়ন করা হয়েছে। এসএমই ঋণকে কার্যকরী করতে ‘ক্লাস্টার অ্যাপ্রোচ’ পদ্ধতি প্রবর্তন করা হয়েছে এবং ২০-২৫টি জেলায় ক্লাস্টার চিহ্নিত করে ঋণ প্রদান করা হয়েছে। আর্থিক সেবাভুক্তিকরণের অংশ হিসেবে কৃষক ও হতদরিদ্রদের ১০ টাকায় ব্যাংক একাউন্ট খোলার সুযোগ করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ধরনের প্রায় এক কোটি ৩১ লক্ষ ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে, যার মধ্যে কৃষকদের জন্য প্রায় ৯৬ লক্ষ হিসাব খোলা ছাড়াও সরকারের বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধাভোগী ও স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য আরো প্রায় ৩৫ লক্ষ হিসাব খোলা হয়েছে। দরিদ্রবান্ধব অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি স্থিতিশীল আর্থিক খাত গড়ে তুলতে সৃজনশীল আর্থিক সেবা প্রবর্তনেরও ব্যবস্থা করেছে। এজন্য ব্যাংকিং সেবায় মানবিক ধারণার প্রসারে সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) কর্মসূচির ওপর গুরত্বারোপ করা হয়েছে। ব্যাংকগুলোকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, খেলাধুলা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, নারী উন্নয়ন, প্রতিবন্ধী, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবার, দুস্থ ও অসহায় মানুষের কল্যাণ ইত্যাদি খাতে সিএসআর- এর আওতায় আর্থিক সাহায্য ও সেবা সমপ্রসারণের তাগিদ দেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ব্যাংকগুলো এ ব্যাপারে তাদের কর্মসূচি জোরদার করেছে। সিএসআর খাতে ব্যাংকগুলো গত চার বছরে ব্যয় করেছে যথাক্রমে ৪১, ৫৫, ২৩৩ ও ২২২ কোটি টাকা। ২০১২ সালের জুন মাস পর্যন্ত এ খাতে ব্যাংগুলো ১০১ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে এসব উদ্যোগের ইতিবাচক প্রভাব এরই মধ্যে পড়তে শুরু করেছে। যেমন-কৃষি উত্পাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, গ্রামীণ দারিদ্র্য লাঘব এবং সামগ্রিকভাবে গ্রামীণ জনসাধারণের জীবনমানে গুণগত পরিবর্তন এসেছে। আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক গত চার বছরে সরকারের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার স্বপ্ন পূরণের ধারাবাহিকতায় তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে যে কোনো প্রতিষ্ঠানের তুলনায় অগ্রগামী রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, সর্বোচ্চ দক্ষতা ও নিপুণতার সঙ্গে সেবা দিতে বাংলাদেশের ব্যাংকিং তথা আর্থিক খাতকে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিসমৃদ্ধ করে গড়ে তুলতে বাংলাদেশ ব্যাংক পাঁচ বছর মেয়াদি (২০১০-১৪) একটি কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে সর্বাধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিতকরণের জন্য নেটওয়ার্কিং, ইআরপি, ব্যাংকিং অ্যাপ্লিকেশন, এন্টারপ্রাইজ ডাটা ওয়্যারহাউজ, ওপেন ডাটা ইনিশিয়েটিভ, ওয়েবসাইট ও ইন্ট্রানেট উন্নয়ন, ই- টেন্ডারিং, ই-রিক্রুটমেন্টসহ ৮৫টি সফট্ওয়্যার বাস্তবায়িত হয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ কার্যক্রমকে ত্বরান্বিত করার জন্য গোএএমএল সফট্ওয়্যার চালু করতে যাচ্ছে। দেশের ব্যাংক ব্যবস্থাও দ্রুতই প্রযুক্তিকে বরণ করে নিচ্ছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তিগত পদক্ষেপের কল্যাণে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে সেবা, গতি ও দক্ষতাকে এক সূত্রে গাঁথা সম্ভব হয়েছে। ফলে শিগগিরই সম্পূর্ণ পেপারলেস ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। মূল্য স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য প্রুডেন্সিয়াল রেগুলেশনগুলোকে আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম রীতি-পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান ও আইনগত কাঠামোকে আরো শক্তিশালী করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া বাণিজ্যিক ব্যাংকের গ্রাহকদের স্বার্থ সংরক্ষণ, কৃষি ঋণ, এসএমই অর্থায়ন ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিষয়ে জনসচেতনতা এবং ব্যাংকিং চ্যানেলে বৈদেশিক রেমিট্যান্স প্রেরণে জনসাধারণকে উত্সাহিতকরণে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে। দেশকে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও পরিবেশবান্ধব টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের দিকে এগিয়ে নেয়া, দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর উদ্ভাবনী শক্তিকে নিয়ন্ত্রণমুক্ত রাখা ও এর সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং সমাজের পিছিয়ে পড়া দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে আর্থিক সেবার আওতায় নিয়ে আসার কৌশলগত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্যই বাংলাদেশ ব্যাংক গত চার বছরে এসব উন্নয়নমুখী কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে এসবে সুফল আসতে শুরু করেছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে।