এক বিকেলে জাতীয় হূদরোগ হাসপাতালের জরুরী বিভাগে ৫০ বত্সর বয়স্ক এক ভদ্রলোক এসে বললেন-তিন দিন আগে
থেকে আমার বুকে ব্যথা, তরল এন্টাসিড ও গ্যাসের ক্যাপসুল খেলাম, ব্যথা কমে না, কি করি? ইসিজি দেখে ইমার্জেন্সি
মেডিকেল অফিসার জানালেন, আপনার হার্ট এ্যাটাক হয়েছে, সিসিইউতে ভার্তি হতে হবে। রুগী ভদ্রলোক জানতে চাইলেন, সব হার্ট এ্যাটাক কি ইসিজিতে ধরা পরে? ডাক্তার সাহেব বললেন, না, ১০০ জন রুগীর মধ্যে ৩০ জনের ইসিজি
নরমাল পাওয়া যায়।
অন্যভাবে ডায়াগনসিস
করতে হয়। হাসপাতালের
জরুরী বিভাগে রুগীদের
সিংহভাগ আসেন হটাত্
বুকে ব্যথা নিয়ে। বুক ব্যথা
একটি মেডিকেল ইমার্জেন্সি
যাতে দ্রুত চিকিত্সা প্রয়োজন। হার্টের কারণে বা কার্ডিয়াক
বুক ব্যথা একটি জটিল সমস্যা। বুক ব্যথা অন্য কারণে হলেও সঠিক রোগ নির্ণয়ের পূর্ব পর্যন্ত হিসেবে বিবেচনা করে চিকিত্সা চালিয়ে যাওয়া যুক্তিসঙ্গত।
মার্কিন দেশে প্রতিবছর
৭০ লক্ষ এবং যুক্তরাজ্যে
২৭ লক্ষ লোক কার্ডিয়াক বুক
ব্যথার জন্য চিকিত্সকের
শরনাপন্ন হন।
বুক ব্যথা হূদযন্ত্র, শ্বাসতন্ত্র, খাদ্যনালী, বুকের হাড়-মাংস,
নার্ভ বা মানসিক কারণে হতে পারে। হূদযন্ত্রের যে কোন
রোগের অন্যতম উপসর্গ
হচ্ছে বুক ব্যথা। বুক ব্যথা হলে
কারণ নির্ণয়ের পাশাপাশী
হূদযন্ত্রের প্রধান রোগের (ইসকেমিক হার্ট ডিজিজের) চিকিত্সা নিতে হবে।
কার্ডিয়াক বা হার্টের বুক
ব্যথার চরিত্র
১. ব্যথার অবস্থান বুকের কেন্দ্রস্থলে।
২. ব্যথার প্রসারণ- মুখ, গলা, চোয়াল, ঘাড় বা হাতে প্রসারিত হতে পারে।
৩. ব্যথার চরিত্র-বুক ভারী/চাপ লাগা,
বিষম খাওয়ার অনুভূতি, দম বন্ধ হয়ে গলার নীচে চেপে ধরার মত অনুভূতি হতে পারে। ধারালো বস্তুর আঘাতের মত বা ছুড়ির গুতার মত বা পিন দিয়ে ফুটা করার মত অনুভূতি সাধারণত: হয় না। অনেকে এই বুক ব্যথাকে ব্যথা না বলে অস্বস্থি বা বলে থাকেন। কার্ডিয়াক বুক ব্যথা সাধারণত: নিশ্বাস, কাশি বা দেহের নড়াচড়ার সাথে সম্পর্কিত থাকে না।
৪.সহযোগী সমস্যা-কার্ডিয়াক বুক ব্যথার সাথে ঘাম, বমি/বমির ভাব বা শ্বাস কষ্ট হতে পারে।
৫. হ্রাস বৃদ্ধি-কার্ডিয়াক বুক ব্যথা সাধারণত পরিশ্রম ও ইমোশনের সময় বেড়ে যায়। প্রচুর খাবার গ্রহণ ও শীতল তাপমাত্রার এই ব্যথা আরো তীব্র হয়।
যে সব পরীক্ষার প্রয়োজন
১. ইসিজি
২. সিকেএমবি
৩. ট্রপোনিন
৪. এক্সরে
৫. ইকো কার্ডিওগ্রাফি
৬. ব্লাড সুগার
৭. ক্রিয়েটিনিন
৮. সিবিসি ও ব্লাড গ্রুপ
৯.অন্যান্য (প্রয়োজন মত)।
বুক ব্যথার প্রাথমিক চিকিত্সা
যেহেতু ব্যথার কারণ নির্ণয় সময় সাপেক্ষ এবং হার্ট এ্যাটাকের জটিলতা ব্যাপক তাই হার্ট এ্যাটাকের প্রাথমিক চিকিত্সা দেয়া শ্রেয়, যা করতে হবে-
১. পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থা।
২. জিহ্বার নীচে দুই চাপ নাইট্রেট সেপ্র বা একটি নাইট্রেট টেবলেট দিতে হবে।
৩. দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে পৌছার ব্যবস্থা করতে হবে।
হার্ট এ্যাটাকের ঝুকিপূর্ণ অবস্থা
যেসব ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় হার্ট এ্যাটাকের সম্ভাবনা বেশী থাকে-
১. উচ্চ রক্তচাপ
২. ডায়াবেটিস
৩. অতিরিক্ত চর্বি/কোলেষ্টেরল
৪. স্থুলতা
৫. বার্ধক্য
৬. শ্রমহীনতা
৭. খাদ্যে অনিয়ম
৮. শাক সবজি কম খাওয়া
৯. রক্তশুন্যতা
১০. পূর্বপুরুষে হূদরোগ/উচ্চ রক্তচাপ/ডায়াবেটিস
১১. ধূমপান
১২. মদ্যপান
১৩. বেশী টিপ টপ জীবন যাপন
১৪. নেশা, নিষিদ্ধ ঔষধ গ্রহণ
১৫. অনিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন।
তাই চিকিত্সকের পারামর্শ মতে এসব অবস্থার চিকিত্সা ও প্রতিরোধের যথাযথ চেষ্টা করতে হবে।
চিকিত্সা ও প্রতিরোধ
কম বা বেশী যাই হোক বুক ব্যথা কোনভাবেই অবহেলা করা যাবে না। সময়মত হূদরোগ বিশেষজ্ঞ/মেডিসিন বিশেষজ্ঞ বা অভিজ্ঞ প্রাইভেট প্রাকটিশনারের পরামর্শমত চিকিত্সা নিতে হবে এবং উপদেশমত জীবন যাত্রায় পরিবর্তন আনতে হবে। মনে রাখতে হবে “প্রিভেনশন ইজ বেটার দেন ট্রিটমেন্ট”।
শেষকথা
পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আনন্দ হচ্ছে বুক ভরে বিশুদ্ধ নিশ্বাস নেয়া, অন্যতম কষ্ট হচ্ছে বুক ব্যথা। হার্ট এ্যাটাকের জন্য যে বুক ব্যথা তা হিমালয়ের মত ভারী, তীব্র যন্ত্রণাময় ও অসহ্য। হার্ট এ্যাটাকের কষ্ট চিকিত্সা ছাড়া দূর করা যায় না। প্রয়োজন তাত্ক্ষণিক সঠিক চিকিত্সা। নন-কার্ডিয়াক বুক ব্যথার জন্য কারণ অনুযায়ী চিকিত্সা নিতে হবে।
