প্রত্নতাত্ত্বিক খননে একের পর এক বেরিয়ে আসছে মূল্যবান সব নিদর্শন। ক্রমেই উন্মোচিত হচ্ছে শত শত বছর চাপা পড়ে থাকা বরেন্দ সভ্যতার নিদর্শন-জগদ্দল মহাবিহার। সার্বিক বিচারেই নওগাঁর ধামইরহাট জগদ্দল বিহার অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীন নিদর্শন। এটি ছিল মূলত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতকে পাল সম্রাট রামপাল এটি নির্মাণ করেন। বৌদ্ধ ধর্মের গ্রন্থগুলো এখানে অনুবাদ হতো।
জগদ্দল মহাবিহারের অবস্থান নিয়ে এতদিন ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিতর্ক ছিল। ভারতে ইতিমধ্যে জগদ্দল নামের কয়েকটি স্থান খনন করে জগদ্দল বিহার হিসাবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। তবে ”রামচরিতম”-এর উদ্ধৃতিতে এমন তথ্যেও উল্লেখ রয়েছে যে, জগদ্দল মহাবিহারের অবস্থান বাংলাদেশের বরেন্দ অঞ্চলে। প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে এবার ওই বিতর্কের সমাধান হতে চলেছে। “মন্দা নাংস্থিশিতমুঢাং জগদ্দল মহাবিহার চিত্তরাগামু। দধতিং লোকেশমপিমহত্তা। রোদিরিতোর মহিমননু”। উল্লেখিত লাইন দুইটি দ্বাদশ শতকের বিখ্যাত কবি সান্ধ্যাকর নন্দীর রচিত সংস্কৃতি ভাষার রামচরিতম গ্রন্থের। গ্রন্থটিতে জগদ্দল মহাবিহারের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা আছে। জগদ্দল নামটি একটি প্রাচীন সুপ্রসিদ্ধ বৌদ্ধ মহাবিহারের সঙ্গে যুক্ত। রামচরিতমে উল্লেখিত জগদ্দল মহাবিহার বর্তমানের জগদ্দল ধ্বংসাবশেষের মধ্যে লুক্কায়িত রয়েছে।
দীর্ঘ প্রায় ১২ বছর পর আবার ডিসেম্বর মাসে খনন কাজ শুরু হয়েছে। এখনও ছড়িয়ে- ছিটিয়ে রয়েছে অনেক নিদর্শন ও টক্কামারী দিঘিসহ ৩৬০টি দিঘি। ধারণা করা হচ্ছে, বিহারের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া কোতরা নদীপথেই বিহারের ব্যবহূত পাথরগুলো আনা হয়। সেই নদী অস্তিত্ব হারিয়েছে অনেক আগেই। খননকালে আবিষ্কৃত ও প্রাপ্ত নিদর্শনগুলো দেখে আমরা অনেকটাই নিশ্চিত যে, এটিই সেই আলোচিত জগদ্দল বৌদ্ধবিহার। কেননা এই বিহারের কাছাকাছি রয়েছে আরো ছয়টি কালচারাল মাউন্ড।
জগদ্দল বিহারের পশ্চিম বাহুর মধ্যস্থলে খননের কাজ চলছে। এখানে বেরিয়ে এসেছে মূল মন্দির, সামনের দিকের বিশালাকার হলঘরের অংশ ও চারটি বৌদ্ধ ভিক্ষু কক্ষের অংশ বিশেষ। পূর্বমুখী মন্দিরটি প্রায় বর্গাকার। এর তিনদিকে প্রশস্ত প্রদক্ষিণ পথ রয়েছে। প্রবেশপথের প্রশস্ততা এক দশমিক ১২ মিটার। তিনটি ধাপ পেরিয়ে মন্দিরের গর্ভগৃহে প্রবেশ করা যায়। মন্দিরে প্রবেশপথে বিশাল আকারের কালো পাথর দিয়ে চৌকাঠ ব্যবহার করা হয়েছিল। খননকালে তা পতিত অবস্থায় উন্মোচিত হয়েছে। কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশে এ পর্যন্ত যত নিদর্শন পাওয়া গেছে তার মধ্যে জগদ্দল বিহারেই সর্বাধিক কালো ও গ্রানাইট পাথর ব্যবহার করা হয়েছে। এখানে আবিষ্কৃত প্রতিটি নিদর্শনই মূল্যবান। মন্দিরের দেয়ালের সঙ্গে সংযুক্ত চারটি বেদি পাওয়া গেছে। পাওয়া গেছে ২০ ফুট উঁচু পিলার। আবিষ্কৃত হয়েছে কালো পাথরের বৌদ্ধমূর্তিসহ স্তূপ ও ছড়ার নকশাযুক্ত লিনটেল। লিনটেলটির এক সারিতে ৯টি বুদ্ধ ও অন্যান্য মূর্তি রয়েছে।
