বছরের প্রায় পুরোটা সময় দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কেটেছে অস্থিরতায়। ছাত্র সংগঠনগুলোর ক্ষমতার লড়াই ও ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল মাঝে মাঝেই রূপ নিয়েছে সন্ত্রাসে। ক্যাম্পাস পরিণত হয়েছে রণক্ষেত্রে। ঝরে গেছে তাজা প্রাণ। নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামেন শিক্ষক-কর্মকর্তারা। একের পর এক ক্লাস-পরীক্ষা স্থগিত হয়েছে। অনিশ্চতায় সময় কেটেছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের। উচ্চ শিক্ষাঙ্গনে এ অচলাবস্থা নিরসনে তেমন উদ্যোগও ছিল না চোখে পড়ার মত।
বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের বেপারোয়া আচরণের কারণে চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনের কর্মীদের হাতে দুই ছাত্র প্রাণ হারান। তার কয়েকমাস পরই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে প্রাণ হারান আরো এক কর্মী। ঢাকার বাইরে টেন্ডার-বাজি ও নিয়োগ-বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়ার একাধিক অভিযোগ ছিল ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের ওপর ছাত্রলীগ কর্মীদের হামলার ঘটনাও ঘটে।
আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ ও শিবিরের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৫ জন গুলিবিদ্ধসহ উভয় সংগঠনের ১৫ জন আহত হন। এ ঘটনার প্রতিবাদে বিক্ষুব্ধ কর্মীরা ক্যাম্পাসে ব্যাপক ভাংচুর করে। এছাড়াও পরিস্থিতি শান্ত করতে গিয়ে লাঞ্ছিত হন প্রক্টোরিয়াল বডির ছয় সদস্য। ছাত্রলীগ এবং ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষের পর সিলেট এমসি কলেজ ছাত্রাবাসের চারটি ভবনের শতাধিক কক্ষে আগুন দেয়া হয়। এছাড়া বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) শিক্ষক কর্মকর্তা আন্দোলনে কোন ক্লাস হয়নি, হয়নি কোন পরীক্ষা। আন্দোলনে বুয়েটে দুই মাস এবং ইবিতে চারমাস ক্লাস পরীক্ষা বন্ধ ছিল।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
গত ৮ ফেব্রুয়ারির ঘটনা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ-শিবিরের দিনভর সংঘর্ষে প্রাণ হারান দুই শিবির কর্মী । এ সংঘর্ষে প্রক্টর নাসিম হাসান আহত হন। আহত হন উভয় পক্ষের ৩০ জন। এ ঘটনায় শুধু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় নয়, দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আতংক ছড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকে সাত দিন। গঠিত হয় তদন্ত কমিটি। সংঘর্ষের সময় প্রায় ১০ রাউন্ড গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটে।
সংঘর্ষে প্রাণিবিদ্যা বিভাগের ২য় বর্ষের মুজাহিদুল ইসলাম এবং ইংরেজি ৪র্থ বর্ষের মাছুম বিন হাবিব নিহত হন। নিহত হাবিব ছিলেন শিবিরের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সোহ্রাওয়ার্দী হলের সাধারণ সম্পাদক। মুজাহিদুল ইসলাম ছাত্রশিবিরের সাথী। ৮ ফেব্রুয়ারি ছাত্রলীগ কর্মীদের হামলায় শিবিরের কলা অনুষদ সভাপতি আবুল কালাম আজাদ ও কর্মী নাঈম আহত হন। এ ঘটনার জের ধরে ছাত্রলীগ কর্মীদের সাথে শিবির কর্মীদের সংঘর্ষ শুরু হয়। প্রায় চার ঘন্টা ধরে উভয় পক্ষে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলে। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ এবং গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটে। ঘটনার এক পর্যায়ে প্রতিপক্ষের গুলিতে নিহত হন মুজাহিদ। রাতে ছাত্রলীগ ও ছাত্রশিবির ক্যাম্পাসে মুখোমুখি অবস্থান নেয়। বিভিন্ন হলে উভয় পক্ষের কর্মীরা একে অপরের বেশ কয়েকটি কক্ষ ভাঙচুর করে। আতংক ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে।
গত ৮ জুলাই ছাত্রলীগ এবং ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষের পর সিলেট এমসি কলেজ ছাত্রাবাসের চারটি ভবনের শতাধিক কক্ষে আগুন দেয়া হয়। নগরীর বালুচর এলাকায় এই সংঘর্ষে আহত হন দুই পক্ষের ১০ জন। চারটি ভবনের ৪২টি কক্ষ সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ৭০টির মতো কক্ষ। দমকল বাহিনী রাত সাড়ে ১০টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণ আনতে সমর্থ হয়। এ ঘটনায় সারাদেশ বিচলিত হয়ে পড়ে। শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ তার নিজ কলেজের আগুনে পোড়ানোর দৃশ্য দেখে আবেগ সংবরণ করতে পারেননি। তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি অভিযুক্তদের খুঁজে বের করে শাস্তির আওতায় আনার ঘোষণা দিলেও কোন কাজ হয়নি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
চলতি বছর ২ অক্টোবরের ঘটনা। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ ও শিবিরের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ৫ জন গুলিবিদ্ধসহ উভয় দলের ১৫ জন আহত হন। এ ঘটনার প্রতিবাদে বিক্ষুব্ধ ছাত্রলীগের নেতা- কর্মীরা ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল ও ব্যাপক ভাংচুর করে। তৈরি হয় ভীতিকর পরিবেশ। এছাড়াও পরিস্থিতি শান্ত করতে গিয়ে লাঞ্ছিত হন প্রক্টোরিয়াল বডির ছয় সদস্য।
ছাত্রলীগ কর্মী সোহেল রানার মৃত্যু
গত ১৫ জুলাই সন্ধ্যায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক গ্রুপের কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে সাধারণ সম্পাদকের সমর্থক সোহেল রানার মাথায় গুলি লাগে। চিকিত্সাধীন অবস্থায় পরদিন ১৬ জুলাই তার মৃত্যু হয়। পদ্মা সেতুর চাঁদা তোলাকে কেন্দ্র করে এই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করলেও তার কোনো প্রতিবেদন আজও প্রকাশিত হয়নি। ২০ নভেম্বরের ঘটনা। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি আখিরুজ্জমান তাকিমকে ধরে নিয়ে গিয়ে রগ কেটে দেয় দুর্বৃত্তরা। এখনো মৃত্যুর সাথে লড়ছে তাকিম। ছাত্রলীগ দাবি করছে, ছাত্রশিবির এই ঘটনা ঘটিয়েছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়
দেশের প্রকৌশল বিদ্যার সর্বোচ্চ শিক্ষায়তন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বছরের একটা বড় অংশ জুড়ে ছিল গভীর সংকটে। অবশেষে প্রোভিসি অপসারণের মধ্য দিয়েই শেষ হয় প্রায় দুই মাসের অচলাবস্থার অবসান। এর আগে দুই মাস ধরে ভিসি ও প্রো-ভিসির অপসারণের দাবিতে লাগাতার অবস্থান ধর্মঘট পালন করেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। গণপদত্যাগ করেন সকল অনুষদের ডিন, বিভাগীয় প্রধান ও ইনস্টিটিউটের পরিচালকরা। আন্দোলনের মুখে গত ১০ জুলাই প্রতিষ্ঠানটি টানা ৪৪ দিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। এর আগে ১৬টি অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে এনে ভিসি ও প্রো-ভিসির পদত্যাগের দাবিতে এপ্রিল-মে মাসে প্রায় এক মাস কর্মবিরতি পালন করেন শিক্ষকরা। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটির নিয়মিত একাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা ব্যাহত হয়। ১৯৬২ সালে বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠার পর বুয়েটে এত বড় এবং দীর্ঘস্থায়ী সংকট তৈরি হয়নি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
৯ জানুয়ারির ঘটনা। বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী জুবায়ের আহমেদকে কুপিয়ে রেখে যায় ছাত্রলীগ নামধারী সন্ত্রাসীরা। তাকে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে নেয়ার পর তিনি মারা যান। এ ঘটনা দেশ জুড়ে আলোড়ন তুলেছিল।
এ ছাড়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকট ছিল প্রায় বছর জুড়েই। একটির সাথে মিলে সৃষ্টি হয় আরেকটি সংকট। গত জানুয়ারিতে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী জুবায়ের আহমেদ নিহত হওয়ার ঘটনায় শিক্ষক সমাজের ব্যানারে শিক্ষকরা এবং ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ ব্যানারে সাধারণ শিক্ষার্থীরা হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে আন্দোলন করেন। ১০ মার্চ গণিত বিভাগে নিয়োগ নিয়ে ভিসির বাসভবন ঘেরাও করেন শিক্ষকরা। ১৮ মার্চ ভিসির পদত্যাগের একদফা দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন শিক্ষকরা। এ আন্দোলন একটানা চলতে থাকলে ১৭ মে পদত্যাগে বাধ্য হন অধ্যাপক শরীফ এনামুল কবির। অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন ভিসি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন ২০ মে। দায়িত্ব গ্রহণের সময় তিনি ১৯৭৩ সালের অ্যাক্ট অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার ঘোষণা দেন। তারই ধারাবাহিকতায় ২০ জুলাই ভিসি প্যানেল নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
নিয়োগ বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া অস্থিরতায় কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় অচল ছিল প্রায় চার মাস। আর পরীক্ষা স্থগিত হয়েছে প্রায় সাড়ে তিনশ’। অন্যদিকে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসের কারণে নিরাপত্তাহীনতায় ছিল সাধারণ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। দীর্ঘদিন ধরে এ অবস্থা চললেও সংকট নিরসনে সরকারের পক্ষ থেকে কোন পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। সব মিলিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগেছেন প্রতিষ্ঠানের ১২ হাজার শিক্ষার্থী।
অচলাবস্থার এই চারমাসে ভিসি প্রায়ই ক্যাম্পাসে অনুপস্থিত ছিলেন। ফলে প্রশাসনিক সকল কাজ বন্ধ ছিল। দেশের প্রায় সবগুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে হলেও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষে ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা কাটেনি। চার মাস অচলাবস্থার পর গত ২৭ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি এম আলাউদ্দিনকে অব্যাহতি দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আব্দুল হাকিমকে নতুন ভিসি নিয়োগ দেয়া হয়।
গত ৮ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের ২২৭তম সিন্ডিকেটে বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিজ্ঞাপিত) ৯২টি পদের বিপরীতে ১২৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেয়ার পর থেকেই অচল হয়ে আছে ৩৪ বছরের পুরনো এই বিশ্ববিদ্যালয়টি। এসবের দায়ভার এড়াতে ইবি প্রশাসন ঈদ উল আজহার নির্ধারিত ছুটির ৮দিন আগেই ১৪ অক্টোবর হল বন্ধ ঘোষণা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের অভিযোগ, মন্ত্রণালয়ের উদাসীনতার কারণে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি অচল হয়ে আছে। ৪ শতাধিক পরীক্ষা স্থগিত হয়ে আছে। একের পর এক পিছানো হচ্ছে প্রথম বর্ষ স্নাতক ভর্তি পরীক্ষা।
শিক্ষার্থীরা জানান, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, ছাত্র ও শিক্ষক সংগঠনগুলোর আন্দোলন, ছাত্রলীগের সংঘর্ষ, হামলা, বোমাবাজি, ভাংচুরসহ নানারকম অস্থিরতার মধ্যে দিয়ে কাটছে প্রতিটি দিন। ব্যাহত হয়েছে শিক্ষা। বাড়ছে সেশনজট।
