আওয়ামী লীগের জাতীয় ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন আজ

আপডেট : ২৮ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:২৬
উপমহাদেশের ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল, বাংলাদেশে মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগের ১৯তম ত্রি-বার্ষিক জাতীয় সম্মেলন আজ। মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। ‘শান্তি, গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে দিনবদলের প্রত্যয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ’ -এই মূল শ্লোগানকে ধারণ করে আয়োজন করা হয়েছে এবারের সম্মেলন। নিছক নিয়ম রক্ষার এ সম্মেলনে নতুন নেতৃত্বে বড় ধরনের কোন চমকের সম্ভাবনা নেই। তবে জাঁকজমকপূর্ণ এই সম্মেলনকে ঘিরে রীতিমতো উত্সবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। সম্মেলন অনুষ্ঠানের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। এ সম্মেলনের মাধ্যমে আগামী তিন বছরের জন্য নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করা হবে। নতুন নেতৃত্বে সভাপতি পদে শেখ হাসিনা এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম পুনঃনির্বাচিত হতে যাচ্ছেন এটি প্রায় নিশ্চিত। কেন্দ্রীয় কমিটিতে তেমন কোন রদবদলের সম্ভাবনা নেই বলে জানা গেছে। গত কাউন্সিলে ‘সংস্কারপন্থী’ হিসেবে চিহ্নিত কয়েক জন প্রবীণ নেতা কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে বাদ পড়েন। এবারের সম্মেলনে তাদের কাউকে কাউকে মূল্যায়ন করা হতে পারে এমন গুঞ্জন রয়েছে। সম্মেলন স্থল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে বর্ণিল সাজে সাজানো হয়েছে। এছাড়া রাজধানীর প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে বর্ণাঢ্য আলোকসজ্জা, ব্যানার, ফেস্টুন ও দলটির প্রতিষ্ঠাতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বড় বড় প্রতিকৃতি দিয়ে সাজানো হয়েছে। ১০০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৩০ ফুট প্রস্থের নৌকা সদৃশ সুবিশাল মঞ্চ সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। দলীয় প্রতীক নৌকার উপর স্থাপিত মঞ্চের পেছনে রয়েছে জাতীয় সংসদ ভবনের ছবি। সাড়ে ৬ হাজার কাউন্সিলর ও ২০ হাজার ডেলিগেটরসহ প্রায় ৩৫ হাজার লোকের ধারণক্ষমতা বিশিষ্ট দৃষ্টিনন্দন সুবিশাল প্যান্ডেল নির্মাণ করা হয়েছে। সকাল ১১টায় জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে সম্মেলনের উদ্বোধন করবেন বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মাঝে সম্মেলনকে ঘিরে রীতিমতো উত্সবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। সারাদেশ থেকে হাজার হাজার কাউন্সিলর ও ডেলিগেটরা ইতিমধ্যে ঢাকায় এসে পৌঁছেছেন। সকাল ১১টায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে ১৯তম জাতীয় সম্মেলনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। দলীয় সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেলুন ও শান্তির প্রতীক পায়রা উড়িয়ে সম্মেলনের উদ্বোধন করবেন। তিনি জাতীয় পতাকা এবং দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম দলীয় পতাকা উত্তোলন করবেন। এ সময় ৭৩টি সাংগঠনিক জেলা কমিটির সভাপতি কিংবা সাধারণ সম্পাদকরাও একই সঙ্গে দলীয় পতাকা উত্তোলন করবেন। সম্মেলন কেন্দ্রের মূল প্যান্ডেলে স্থান সঙ্কুলানের অভাবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের চতুর্দিকে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে বড় বড় ডিজিটাল পর্দার মাধ্যমে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সম্প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কাউন্সিলরদের উপস্থিতিতে বিকাল তিনটায় অনুষ্ঠিত হবে দ্বিতীয় পর্যায়ের কাউন্সিল অধিবেশন। দলের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছাড়াও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানি, শামসুল হক, জাতীয় চার নেতাসহ প্রতিষ্ঠাকালীন নেতাদের বড় বড় প্রতিকৃতি টানানো হয়েছে পুরো সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মূল মঞ্চসহ চতুর্দিকে। কাউন্সিল উদ্বোধনের পর শোক প্রস্তাব উত্থাপন এবং এক মিনিট নীরবতা পালন করা হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে অভ্যর্থনা উপ-কমিটির চেয়ারম্যান সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী এবং কাউন্সিল প্রস্তুতি কমিটির চেয়ারম্যান শেখ হাসিনা উদ্বোধনী ভাষণ দেবেন। এই অধিবেশনের পর ১০ মিনিট বিরতি দিয়ে শুরু হবে কাউন্সিল অধিবেশন। সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্ট উপস্থাপনের পর ধারাবাহিকভাবে সংশোধিত গঠনতন্ত্র ও ঘোষণাপত্রসহ গত কাউন্সিলের পর দলের সকল আয়-ব্যয়ের হিসাব অনুমোদন নেয়া হবে। এছাড়া সাত বিভাগ থেকে একজন করে কাউন্সিলর বক্তব্য রাখবেন এবং ৭৩ সাংগঠনিক জেলার রিপোর্ট উপস্থাপিত হবে। সব শেষে থাকছে খ্যাতনামা শিল্পীদের পরিবেশনায় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। জানা গেছে, আওয়ামী লীগের আজকের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে চিরবৈরী রাজনৈতিক প্রধান প্রতিপক্ষ বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়াসহ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সকল রাজনৈতিক দলের নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এছাড়া দেশের খ্যাতনামা বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, বিভিন্ন চেম্বারের ব্যবসায়িক নেতৃবৃন্দ, সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিকসহ নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তবে জামায়াতসহ যুদ্ধাপরাধী ও উগ্র সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত কোনো রাজনৈতিক দলের নেতাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি আওয়ামী লীগের সম্মেলনে। কেন্দ্রীয় সম্মেলনকে ঘিরে পুরো সোহরাওয়ার্দী উদ্যানসহ আশেপাশের এলাকায় নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলা হয়েছে। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের সামনের গেট শুধু ভিআইপিদের যাতায়াতের জন্য এবং বাংলা একাডেমীর সামনে রমনা কালী মন্দিরের প্রবেশ গেট, জাতীয় তিন নেতার মাজার সংলগ্ন গেট এবং টিএসসির সামনের গেট দিয়ে কাউন্সিলর, ডেলিগেটস এবং আমন্ত্রিত অতিথিদের যাতায়াতের ব্যবস্থা করা হয়েছে। শুক্রবার বিকালেই এসএসএফ, সেনাবাহিনীসহ বিপুল পরিমাণ র্যাব এবং প্রশিক্ষিত কুকুর দিয়ে পুরো উদ্যানে নিরাপত্তা তল্লাশী চালিয়েছে। দলীয় কাউন্সিলের ইতিহাস: রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী রোজ গার্ডেনে জন্মলাভের পর ১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগের প্রথম কাউন্সিলে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি, শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৩ সালে ময়মনসিংহে দলের দ্বিতীয় কাউন্সিলে মওলানা ভাসানি সভাপতি পুনর্নির্বাচিত ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ’৫৫ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত তৃতীয় কাউন্সিলে একই কমিটি বহাল থাকে। ’৫৭ সালে কাগমারি সম্মেলনকে ঘিরে মওলানা ভাসানী দল ভেঙ্গে ন্যাপ করলে আওয়ামী লীগের মওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগিশ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব অপরিবর্তিত থাকেন। ’৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি হলে আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ড স্থগিত করা হয়। দীর্ঘ ৬ বছর পর ’৬৪ সালে দলকে পুনরুজ্জীবিত করা হয়। এতে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে তর্কবাগিশ-মুজিব অপরিবর্তিত থাকেন। ’৬৬ সালের কাউন্সিলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন তাজউদ্দীন আহমদ। এরপর ’৬৮ ও ’৭০ সালের কাউন্সিলে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক অপরিবর্তিত থাকেন। এই কমিটির মাধ্যমেই পরিচালিত হয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। দেশ স্বাধীন হবার পর ’৭২ সালের সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন বর্তমান রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান। ’৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু দায়িত্ব ছেড়ে দিলে সভাপতি হন এ এইচ এম কামরুজ্জামান। সাধারণ সম্পাদক হিসেবে জিল্লুর রহমান বহাল থাকেন। ’৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর আওয়ামী লীগের রাজনীতি আবারও স্থগিত করা হয়। ’৭৬ সালে ঘরোয়া রাজনীতি চালু হলে অওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করে মহিউদ্দিন আহমেদ সভাপতি ও সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী সাধারণ সম্পাদক হন। ’৭৭ সালে এই কমিটি ভেঙ্গে আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। আহ্বায়ক হন সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন। ’৭৮ সালের সম্মেলনে আবদুল মালেক উকিল সভাপতি ও আবদুর রাজ্জাক সাধারণ সম্পাদক হন। ’৮১ সালের সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতেই তাকে সভাপতি এবং আবদুর রাজ্জাক সাধারণ সম্পাদক পদে বহাল থাকেন। এরপর শেখ হাসিনা দেশে ফিরে ঐতিহ্যবাহী এই রাজনৈতিক দলটির হাল ধরেন। ’৮৩ সালে আবদুর রাজ্জাক দলত্যাগ করে বাকশাল গঠন করলে সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক করা হয়। ’৮৭ সালের সম্মেলনে শেখ হাসিনা সভাপতি ও সাজেদা চৌধুরী সাধারণ সম্পাদক হন। ’৯২ ও ’৯৭ সালের সম্মেলনে শেখ হাসিনা সভাপতি ও জিল্লুর রহমান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ২০০০ সালের বিশেষ কাউন্সিলেও একই কমিটি বহাল থাকে। এরপর ২০০২ সালের ২৬ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে শেখ হাসিনা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন আবদুল জলিল। সর্বশেষ ২০০৯ সালের ২৪ জুলাই অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের সর্বশেষ কাউন্সিলে শেখ হাসিনা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। সর্বশেষ এই কাউন্সিলেই বাঘা বাঘা নেতাদের সাইডলাইনে রেখে অপেক্ষাকৃত তরুণদের নিয়ে গঠন করেন চমক সৃষ্টিকারী বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটি।