লর্ডস, ব্রিসবেন, কলকাতায় যে ব্যাটিং তাণ্ডব দেখিয়েছেন; তা মনে রাখা মানুষ আজ আর খুব বেশি নেই। মাঠে যে জাদু ছিল অধিনায়ক হিসাবে, তাতে মুগ্ধ নয় এই প্রজন্ম। তারপরও সেদিনের কিশোরের কাছেও তিনি ছিলেন প্রিয় এক চরিত্র—ক্রিকেটের এক প্রতিশব্দ। টেলিভিশনে ক্রিকেট মানেই নেপথ্যে ছিল তার কণ্ঠ—হাই, দিস ইজ টনি গ্রেগ!
এই জাদুকরী, রোমাঞ্চকর কণ্ঠ আর শোনা যাবে না। আর কেউ টেলিভিশনে চিত্কার করে বলে উঠবে না—ওফ ডিয়ার, হোয়াট আ শট!
চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গেল সেই টনি গ্রেগের কণ্ঠ। গত অক্টোবর মাসে ধরা পড়া ফুসফুস ক্যান্সারে ৬৬ বছর বয়সে এই পৃথিবী থেকে গতকাল বিদায় নিলেন সাবেক ইংলিশ অধিনায়ক ও অলরাউন্ডার টনি গ্রেগ।
এই কদিন আগে পর্যন্তও ধারাভাষ্য কক্ষে নিয়মিত থাকা টনির আকস্মিক এই বিদায়ে পুরো ক্রিকেট অঙ্গনই শোকাভিভূত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে এই সময়ের দর্শকরা প্রচণ্ডভাবে আঘাত পেয়েছেন প্রিয় ধারাভাষ্যকারকে হারিয়ে। সেইসঙ্গে ক্রিকেট বিষয়ক ওয়েবসাইটে তার বিশ্লেষণী কলাম এবং সেমিনারে বক্তৃতার কথাও স্মরণ করছেন ভক্তরা।
টনি গ্রেগের আসল পরিচয় অবশ্যই ক্রিকেটার। দক্ষিণ আফ্রিকায় জন্ম নেয়া অলরাউন্ডার গ্রেগ মূলত খেলতেন সাসেক্সের হয়ে। সেখান থেকেই ইংল্যান্ডের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলা শুরু। ইংল্যান্ডের হয়ে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যে ৫৮টি টেস্ট ও ২২টি ওয়ানডে খেলেছেন। ৬ বার ইনিংসে ৫ উইকেট নিয়েছেন, ৮টি টেস্ট সেঞ্চুরি করেছেন। ফর্মের তুঙ্গে থাকা অবস্থাতেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে আজীবন নিষিদ্ধ হন।
নিষিদ্ধ হওয়ার পেছনে ছিল আধুনিক ক্রিকেটকে বদলে দেয়া সেই ক্যারি-পেকারের ‘ওয়ার্ল্ড ক্রিকেট সিরিজ’-এ খেলা। ফলে ৩০ বছর বয়সে শেষ হয়ে যায় তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার। এরপরই ক্যারি-পেকারের চ্যানেল নাইন-এ যোগ দেন বিশেষজ্ঞ হিসাবে। সেই থেকে আমৃত্যু ছিলেন চ্যানেল নাইনের ধারাভাষ্য দলের সদস্য।
সেইসঙ্গে ফ্রি ল্যান্সার হিসাবে বড় বড় ক্রিকেট টুর্নামেন্টে ধারাভাষ্যকার হিসাবে কাজ করতেন। সর্বশেষ শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ধারাভাষ্যকার ছিলেন।
বাংলাদেশের দর্শকদের সঙ্গেও টনি গ্রেগের সঙ্গে সম্পর্ক আজকের নয়। ১৯৯৮ সালের মিনি বিশ্বকাপে ভাঙা ভাঙা উচ্চারণে ঢাকা, বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম বলে জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন। একইসঙ্গে বাংলাদেশের টেস্ট স্ট্যাটাস প্রাপ্তির সমালোচনা করে অজনপ্রিয়ও হয়েছিলেন।
অবশেষে সব জনপ্রিয়তা-অজনপ্রিয়তার ঊর্ধ্বে উঠে গেলেন টনি গ্রেগ। শুরুতে ফুসফুসে ব্রংকাইটিস হয়েছে বলে জানা গিয়েছিল। পরে জানা গেল সেটা ছিল ক্যান্সার। অবশ্য শেষ সময়ে ক্যান্সারের চিকিত্সা চলা অবস্থায় হার্টঅ্যাটাকেই মৃত্যু হয় এই কিংবদন্তীর।
এক নজরে টনি গ্রেগ
পুরো নাম : অ্যান্থোনি উইলিয়াম গ্রেগ
জম্ম : ৬ অক্টোবর, ১৯৪৬, কুইন্সটাউন, কেপ প্রভিন্স,
দক্ষিণ আফ্রিকা
মৃত্যু : ২৯ ডিসেম্বর, ২০১২ (৬৬ বছর), সিডনি,
নিউ সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া
উচ্চতা : ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি (১.৯৮ মিটার)
ব্যাটিং : ডানহাতি
বোলিং : ডানহাতি মিডিয়াম পেসার ও অফ স্পিনার
দলের ভূমিকা : অলরাউন্ডার
জাতীয় দল : ইংল্যান্ড
টেস্ট অভিষেক : অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে, ম্যানচেস্টার, ৮ জুন, ১৯৭২
শেষ টেস্ট : অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে, ওভাল,
৩০ আগস্ট ১৯৭৭
ওয়ানডে অভিষেক : অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে, ২৪ আগস্ট, ১৯৭২
শেষ ওয়ানডে : অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে, ৬ জুন, ১৯৭৭
টেস্ট ক্যারিয়ার (ব্যাটিং/ফিল্ডিং)
ম্যাচ রান সর্বোচ্চ গড় ১০০ ৫০ ক্যাচ
৫৮ ৩৫৯৯ ১৪৮ ৪০.৪৩ ৮ ২০ ৮৭
ওয়ানডে ক্যারিয়ার (ব্যাটিং/ফিল্ডিং)
ম্যাচ রান সর্বোচ্চ গড় ১০০ ৫০ ক্যাচ
২২ ২৬৯ ৪৮ ১৬.৮১ ০ ০ ৭
টেস্ট ক্যারিয়ার (বোলিং)
ম্যাচ উইকেট ৪ উইকেট ৫ উইকেট ১০ উইকেট ইনিংস সেরা বোলিং ম্যাচ সেরা বোলিং
৫৮ ১৪১ ৬ ৬ ২ ৮/৮৬ ১৩/১৫৬
ওয়ানডে ক্যারিয়ার (বোলিং)
ম্যাচ উইকেট সেরা বোলিং চার উইকেট
২২ ১৯ ৪/৪৫ ১
ঘরোয়া ক্রিকেট
১৯৬৫-১৯৭০ (বোর্ডার), ১৯৬৬-১৯৭৮ (সাসেক্স), ১৯৭০-১৯৭২ (ইস্টার্ন প্রভিন্স)।
ক্রিকেট জগতের শোক
‘টনি ছিল লড়াকু এক ক্রিকেটার। যে কোনো দলের বিপক্ষেই সে ছিল সমান আগ্রাসী। অসাধারণ এক অলরাউন্ডার ছিল সে। খেলোয়াড়ী জীবন শেষে ভাষ্যকার হিসেবে দারুণ বিশ্লেষণ ক্ষমতা দেখিয়েছে সে। তার আত্মার শান্তি কামনা করি’
—ডেনিস লিলি
সাবেক অস্ট্রেলীয় পেসার
‘আমি দুইদিন আগেই তার সাথে কথা বলেছি। তার চলে যাওয়ার খবর আমাকে খুব ধাক্কা দিয়েছে। তার চলে যাওয়ায় ক্রিকেট অনেক কিছু হারালো। ব্যক্তিগতভাবে উনি ছিলেন আমার আদর্শ। ভাল ও খারাপ সময়ে উনি আমাকে অসাধারণ পরামর্শ দিতেন।’
—মাইকেল ক্লার্ক
অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক
‘টনি মাঠে ছিল একটু ছাড় না দেওয়া এক বিপক্ষের যোদ্ধা। সমানভাবে সে মাঠের বাইরে ভাল বন্ধু। নিজেকে সে সফল টেস্ট ক্রিকেটার ও অধিনায়ক হিসেবে অধিষ্ঠিত করেছে। স্লিপে সে অন্যতম সেরা ফিল্ডার ছিল।’
—গ্রেগ চ্যাপেল
অস্ট্রেলিয়ার সাবেক অধিনায়ক
‘আমি জানি একজন খেলোয়াড় হিসেবে সে আদর্শ কিনা। তবে শুধু ভাষ্যকার হিসেবেই তাকে মনে রাখতে হবে। কারণ ভাষ্যকার হিসেবে সে ছিল বিশেষ কিছু। সে খেলাটি ভালোবাসতো এবং খেলাটির জন্য অনেক কিছু করেছে’
—রড মার্শ
সাবেক অস্ট্রেলীয় উইকেটরক্ষক
‘টনি ক্রিকেটের জন্য অনেক করেছেন এবং সব সময় বুঝতেন তিনি কি চান। আমরা সবাই তার অভাব অনুভব করব।’
—শেন ওয়ার্ন
সাবেক অস্ট্রেলীয় লেগ স্পিনার
‘ক্রিকেট বিশ্বে তুমি সেরা পদচিহ্ন রেখে গেছ। গ্রেগ পরিবারের প্রতি আমার শোক রইল।’
—ব্রায়ান লারা
সাবেক ক্যারিবিয় অধিনায়ক
‘ভয়াবহ, ভয়াবহ সংবাদ। এটা আঘাত দিয়েছে। ক্রিকেটীয় সম্প্রদায়ের সবাই বিহবল এই সংবাদে।’
—অ্যাডাম গিলক্রিস্ট
অস্ট্রেলিয়ার সাবেক উইকেটরক্ষক
‘চেন্নাইয়ে এসে নেমেই জানলাম সে চলে গেছে। তার পরিবারের প্রতি সহানুভূতি রইল। সেরা মানুষ এবং ক্যারিয়ার তার। তার শূন্যতা অনুভূত হবে।’
—ডেভ হোয়াটমোর
পাকিস্তানের কোচ
