বিক্ষোভে উত্তাল ভারত

আপডেট : ২৯ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:৩৯
বাঁচতে চেয়েছিলেন। পরিবারের কাছে বাঁচার আকুতিও জানিয়েছিলেন। অনেক মেয়ে সামাজিক নিপীড়ন থেকে বাঁচতে ধর্ষণের পর আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। তবে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল ভারতের দিল্লীতে গণধর্ষণের শিকার মেডিক্যাল ছাত্রী। বাঁচার প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন তিনি। কিন্তু নরপশুদের নির্মম অত্যাচার আর মৃত্যুকে থামিয়ে রাখতে পারেনি কেউ। অবশেষে মৃত্যু এসে নিয়ে গেল তাকে। টানা ১৩ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে গতকাল শনিবার ভোরে চিকিত্সাধীন অবস্থায় সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিরবিদায় নেন ঐ তরুণী। এ ঘটনায় ঘাতকদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলার আবেদন করা হয়েছে। খবর বিবিসি, টাইমস অব ইন্ডিয়া ও এনডিটিভির। তরুণী তার পরিবারের কাছে বাঁচার আকুতি জানিয়েছিলেন বলে জানান চিকিত্সকরা। তার মৃত্যুর খবরে ভারত জুড়ে বিক্ষোভে ফেটে পড়ছে সাধারণ মানুষ। তারা ধর্ষকদের ফাঁসি দাবি করেছে। শোকে মুহ্যমান পুরো ভারত। বড় ধরনের বিক্ষোভ ও সহিংসতার আশঙ্কায় ও নিরাপত্তার স্বার্থে জনসাধারণের জন্য ইন্ডিয়া গেট ও নয়াদিল্লীমুখী সব সড়ক বন্ধ করে দেয়া হয়। দিল্লী জুড়ে ১৪৪ ধারা জারি করা হয় বলে আনন্দবাজার পত্রিকা জানায়।। মানুষকে শহরের কেন্দ্রস্থলে যেতে নিষেধ করা হয়। কয়েকশ’ সশস্ত্র পুলিশ ও দাঙ্গা পুলিশ শহরের বিভিন্ন জায়গায় মোতায়েন করে সরকার। ইন্ডিয়া গেটের কাছাকাছি ১০টি মেট্রো (পাতাল রেল) স্টেশন বন্ধ করে দেয়া হয়। গত কয়েকদিন ধরে ভারতে এ ঘটনার প্রতিবাদে ব্যাপক বিক্ষোভ চলছে। সহিংস প্রতিবাদে একজন পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হয়েছে। তরুণীর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ। তারা শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানান। রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি ওই তরুণীকে সাহসী নারী উল্লেখ করে বলেন, তিনি সত্যিকারের বীর এবং ভারতের তরুণ ও নারীদের প্রতীক। প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এক শোকবার্তায় সবাইকে শান্ত থাকার আহবান জানিয়ে বলেন, তরুণী জীবন যুদ্ধে হেরে গেছেন। কিন্তু আমাদের সকলের উচিত তার মৃত্যুকে বৃথা যেতে না দেয়া। এক বিবৃতিতে তিনি স্বীকার করেছেন, ভারতে সামাজিক পরিবর্তন আসাটা জরুরি এবং এজন্য সকলকে কাজ করতে হবে। দিল্লীর মুখ্যমন্ত্রী শীলা দীক্ষিত বলেছেন, তার মৃত্যু আমাদের জন্য লজ্জার। কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী বলেছেন, তার মৃত্যুকে বৃথা যেতে দেয়া হবে না। এই মৃত্যু আমাদের নারীর নিরাপত্তায় আরো অগ্রণী ভূমিকা পালনে উত্সাহিত করবে। রাহুল গান্ধী বলেন, বিক্ষোভকারীদের দাবি বাস্তবায়ন করতে হবে। নাগরিক হিসেবে প্রত্যেক নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। পুলিশ জানিয়েছে, কেবল দিল্লীর জন্তরমন্তর ও রামলীলা ময়দানে জনসাধারণ শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করতে পারবে। এসব স্থানে বিক্ষোভ করার সময় মুখ্যমন্ত্রী শিলা দীক্ষিত তাদের সঙ্গে যোগ দেন। বিক্ষোভকারীরা তাকে ফিরে যেতে বাধ্য করেন বলে এনডিটিভি জানিয়েছে। জন্তরমন্তরে মোমবাতি প্রজ্বলন করে নিহত ছাত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। বাদ যায়নি বলিউডের অভিনেতা-অভিনেত্রীরাও। মুম্বাইয়ে তারা এক বিক্ষোভে যোগ দেন। শাহরুখ বলেছেন, একজন ছেলে হিসেবে আমি লজ্জিত। নয়াদিল্লী পুলিশের বিশেষ কমিশনার (আইন শৃঙ্খলা) ধর্মেন্দ্র কুমার জানান, গ্রেফতাকৃতদের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০২ ধারা মোতাবেক হত্যা মামলার আবেদন করা হয়েছে। এর আগে এদের বিরুদ্ধে ধারা ৩০৭ (হত্যার উদ্দেশ্যে), ধারা ২০১ (সাক্ষ্য প্রমাণ নষ্ট করা), ৩৬৫ (অপহরণ), ৩৭৬ এর ২জি (গণধর্ষণ), ৩৭৭ (আক্রমণ), ৩৯৪ (ডাকাতির উদ্দেশ্যে আঘাত করা) এবং ৩৪ (একই উদ্দেশ্যে অপরাধ) ধারায় মামলা দায়ের করা হয়। এ ঘটনায় ছয় ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা হচ্ছে বাসচালক রাম সিং ও তার ভাই মুকেশ, অক্ষয় ঠাকুর, পাবন এবং বিনয়। এছাড়া গ্রেফতারকৃত অপরজনের বয়স কম বলে জানানো হয়েছে। তার বয়স পরীক্ষা করতে আদালতে আবেদন করা হবে বলে পুলিশ জানিয়েছে। তবে ‘নবভারত টাইমস’ নামে একটি অনলাইন পত্রিকা জানিয়েছে, প্রাপ্তবয়স্ক হতে তার এক মাস বাকি। এই ছেলেটিই সবচেয়ে বেশি নির্যাতন করেছে মেয়েটির ওপর। অথচ কিশোর হওয়ায় তার শাস্তি হবে কম। অপ্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে গ্রেফতার হওয়ায় আদালতে তার বিচার জুভেনাইল জাস্টিস অ্যাক্টের অধীনে কিশোর অপরাধী আদালতেই হবে বলে জানা গেছে। তবে যেহেতু কিছুদিনের মধ্যেই সে প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে যাবে, তাই তাকে কিশোর অপরাধী সংশোধন কেন্দ্রে রাখা যাবে না। তাকে তিহার জেলেই রাখা হবে। এই আইন অনুযায়ী, অপরাধ যাই হোক না কেন, অপ্রাপ্তবয়স্ক অপরাধীর সাজা সর্বোচ্চ ৩ বছর। ছাত্রীর মৃত্যুর পর দেয়া এক বিবৃতিতে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুশীল কুমার সিন্ধে বলেছেন, সরকার অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিতকরণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এছাড়া এ ধরনের ঘটনা যাতে আর না ঘটে সে লক্ষ্যে সরকার আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধন করে ধর্ষকদের কঠোর শাস্তির বিধান করতেও অঙ্গীকারবদ্ধ। এ ঘটনায় বহিষ্কার করা হয়েছে পুলিশের দুই কর্মকর্তাকে। এক পুলিশ কমিশনার জানান, আগামী ৩ জানুয়ারি মামলার অভিযোগপত্র দিতে পারেন। অভিযোগপত্র ১ হাজার পৃষ্ঠার হতে পারে। এই মামলা পরিচালনায় সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী দয়ান কৃষ্ণাণকে বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর নিয়োগ দেয়া হয়। তিনি কোন পারিশ্রমিক নেবেন না। তার ময়না তদন্ত সিঙ্গাপুর হাসপাতালে সম্পন্ন হয়েছে। শিগগিরই এর রিপোর্ট তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে আসবে। গত ১৬ ডিসেম্বর ধর্ষণ ও মারধরের পর ২৩ বছরের ওই ছাত্রীকে তার বন্ধুসহ দিল্লীর রাস্তায় চলন্ত বাস থেকে ফেলে দেয় বাসের স্টাফরা। সংখ্যায় তারা ছিল ৬ জন। সিঙ্গাপুরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শুক্রবার তার মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার করে। তাকে সিঙ্গাপুরে স্থানান্তর করার আগে তার দুইবার হার্ট এ্যাটাক হয় বলে ডাক্তাররা জানিয়েছেন। ২৭ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে নেয়ার আগে দিল্লীতে হাসপাতালে তিনবার অস্ত্রোপচার করা হয়। এ ছাড়া তার ফুসফুস ও মস্তিষ্কে সংক্রমণ হয়েছিল, তলপেটেও গুরুতর জখম ছিল। দিল্লী হাসপাতালের চিকিত্সকরা জানিয়েছেন, সর্বাঙ্গে ব্যথা নিয়েও ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দুইবার জবানবন্দি দিয়েছিলেন তিনি। ধর্ষণের ওই ঘটনা এবং ধর্ষণকারীদের বিস্তারিত বর্ণনাও দিয়ে যান তিনি। ধর্ষকদের বিচারও দাবি করেছিলেন। ধর্ষণের শিকার ওই ছাত্রীর পরিবারের আশা, তার এই মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ভারতের ভূমি যেন নারীদের জন্য নিরাপদ হয়। যেন আর কারো জীবনে এবং কারো পরিবারে এ ধরনের পরিণতি না আসে। মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে গতকাল ভোর পৌনে ৫টায় (স্থানীয় সময়) চিকিত্সকরা ওই তরুণীকে মৃত ঘোষণা করেন। এ সময় তার পাশে পরিবারের সদস্যরা ছাড়াও ছিলেন ভারতের হাইকমিশনার। ওই তরুণীর লাশ ও তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আসতে দিল্লী থেকে একটি বিশেষ বিমান পাঠানো হয়। ভারতীয় সময় গতকাল বিকাল ৪টা নাগাদ তার লাশ দিল্লী পৌঁছানোর কথা ছিল। তবে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত জানা গেছে, তরুণীর লাশ নিয়ে তার পরিবার সিঙ্গাপুর থেকে দেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছে। ধর্ষিত তরুণীর পরিচয় এখন পর্যন্ত প্রকাশ করা না হলেও ভারতের কয়েকটি সংবাদ মাধ্যম তাকে ‘আমানত’ নামে সম্বোধন করছে।