হাসিনা সভাপতি, আশরাফ সাধারণ সম্পাদক পুনঃনির্বাচিত

আপডেট : ২৯ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:৪৩
দেশের সবচেয়ে প্রাচীন ও ঐহিত্যবাহী দল আওয়ামী লীগের সপ্তমবারের মতো সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সাধারণ সম্পাদক পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। গতকাল শনিবার বিকালে আওয়ামী লীগের ১৯তম জাতীয় সম্মেলনে সর্বসম্মতভাবে তারা নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগের ৬৩ বছরের ইতিহাসে শেখ হাসিনা ইতিমধ্যে ৩২ বছর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। চলতি মেয়াদে সভাপতির দায়িত্ব পালন করতে পারলে তার একটানা দায়িত্ব পালনের মেয়াদ হবে ৩৫ বছর। বিকাল সাড়ে ৩টায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে কাউন্সিল অধিবেশনে দলের সদ্য বিদায়ী কমিটির প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম সভাপতি হিসেবে শেখ হাসিনার নাম প্রস্তাব করেন। আর এ প্রস্তাব সমর্থন করেন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। বিদায়ী যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব-উল আলম হানিফ সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের নাম প্রস্তাব করলে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক তা সমর্থন করেন। কাউন্সিলররা সবাই এই দুই প্রস্তাব সমর্থন করেন। সেই সঙ্গে নতুন পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের দায়িত্বও নবনির্বাচিত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে দেয়া হয়েছে। বিকাল সাড়ে ৩টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে কাউন্সিল অধিবেশন শুরু হয়। শেখ হাসিনা অধিবেশনে নেতৃত্ব নির্বাচনের আগে পূর্বের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেন। এরপর নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের কাজ শুরু হয়। এই কমিটিতে চেয়ারম্যান ছিলেন এডভোকেট একেএম রহমত আলী এমপি। সদস্য ছিলেন এডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন ও আ ক ম মোজাম্মেল হক। সভাপতি পদে পুনর্নির্বাচিত হওয়ার পর কাউন্সিলে বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমি এবার চেয়েছিলাম আপনারা নতুন নেতৃত্ব আনবেন। আমি পাশে থেকে সহযোগিতা করব। ১৯৮২ সাল থেকে আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসছেন বঙ্গবন্ধ ুকন্যা শেখ হাসিনা। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সময় থেকে শেখ হাসিনা বিদেশে থাকা অবস্থায়ই দলের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। এরপর দেশে ফিরে দায়িত্ব নেন তিনি। নতুন করে নির্বাচিত করায় কাউন্সিলরদের ধন্যবাদ জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আপনারা যে গুরুদায়িত্ব দিয়েছেন তা মাথা পেতে নিলাম। কারণ সামনে নির্বাচন। তিনি বলেন, এবার আমি দায়িত্ব নিলাম। তবে আগামীবার আপনাদের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করতে হবে। কারণ আমার তো বয়স হচ্ছে। দলকে সুসংগঠিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে শেখ হাসিনা বলেন, আগামী দুই মাসের মধ্যে তৃণমূলের সকল সম্মেলন শেষ করতে হবে। যারা সম্মেলন করতে ব্যর্থ হবে সেসব কমিটি বাতিল করা হবে। নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, আমি আশরাফকে সঙ্গে নিয়ে মুরব্বীদের সঙ্গে আলোচনা করে যতদ্রুত সম্ভব নতুন কমিটি ঘোষণা করব। প্রধানমন্ত্রীর সূচনা বক্তব্যের পর সারাদেশ থেকে আগত জেলার শীর্ষ নেতারা বক্তব্য রাখেন। প্রথমে বক্তব্য রাখার সুযোগ পান মাগুরা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডা. সিরাজুল আকবর। এরপর বক্তব্য রাখেন পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শামসুর রহমান শরীফ ডিলু। পাবনার পর বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শওকত হোসেন হিরণ বক্তব্য রাখেন। সূত্র জানায়, সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী আগামী দু’মাসের মধ্যে সাংগঠনিক রিপোর্ট কেন্দ্রে জমা দেয়ার নির্দেশ দেন। কাউন্সিলে শুধু সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচন হলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আজ বা কাল এই পূর্ণাঙ্গ কমিটি এবং ঢাকা মহানগরের কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে। তবে আভাস পাওয়া গেছে, নতুন কেন্দ্রীয় কমিটিতে তেমন কোন চমক থাকছে না। দু’তিনটি পদে রদবদল ছাড়া বিদায়ী কমিটির অধিকাংশ নেতাই নতুন কমিটিতে স্ব স্ব পদে বহাল থাকছেন। সংস্কার ইস্যুতে গত সম্মেলনে বাদ যাওয়া দলের প্রবীণ ৫ নেতার নতুন কমিটিতেও স্থান পাওয়ার সম্ভাবনা কম বলেই জানা গেছে। বিকাল সাড়ে চারটায় সম্মেলনস্থলের পাশেই ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন প্রাঙ্গণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে শুরু হয় দ্বিতীয় পর্বে কাউন্সিলরদের সঙ্গে বৈঠক। দেশের সাত বিভাগের একজন করে বক্তব্য রাখার পর দলের সংশোধিত ঘোষণাপত্র ও আয়-ব্যয়ের অনুমোদনের পরই হয় শুরু হয় আগামী তিন বছরের জন্য দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের গঠন প্রক্রিয়া। তবে কাউন্সিলরদের মধ্যে শেখ হাসিনা আর সভাপতি পদে থাকতে চাইছেন না এই খবর ছড়িয়ে পড়লে প্রতিবাদে মুখর হয়ে ওঠেন তৃণমূল নেতারা। প্রতিটি কাউন্সিলরই শ্লোগান বক্তব্যে জানিয়ে দেন, শেখ হাসিনা ছাড়া আর কাউকে সভাপতি পদে তারা দেখতে চান না। প্রধান নির্বাচন কমিশনার আওয়ামী লীগের সভাপতি পদে শেখ হাসিনাকে সর্বসম্মতিক্রমে নির্বাচিত ঘোষণা করলে উপস্থিত কাউন্সিলর ছাড়াও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সামনে থাকা হাজার হাজার নেতাকর্মী উল্লাসে ফেটে পড়েন এবং হাততালি ও শ্লোগান দিয়ে শেখ হাসিনাকে অভিনন্দিত করেন। দলের অনেক অর্জন সত্ত্বেও তা প্রচারে ব্যর্থতার কথা কাউন্সিলররা তুলে ধরলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দলের এতো অর্জন প্রচারের প্রধান দায়িত্ব তো দলের নেতাদেরই। আমাদের বদ অভ্যাস হচ্ছে আমরা বিরোধী দলের পক্ষ থেকে যা শুনি তা লুফে নেই, হতাশ হই- কিন্তু কাউন্টার জবাব দেই না। এই বদ অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে। বিরোধী দলের প্রতিটি অভিযোগের পাল্টা জবাব দিতে হবে। তিনি প্রতিটি জেলা-উপজেলায় দলের স্থায়ী কার্যালয় নির্মাণের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, এটা করতে যদি কোনো সহযোগিতার প্রয়োজন হয় কেন্দ্রীয়ভাবে তা করা হবে। দ্বিতীয়বারের মতো সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম তার বক্তব্যে’র শুরুতে সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, আওয়ামী লীগ যা বলে তা বাস্তবায়ন করে ঘরে ফিরে। আওয়ামী লীগ হচ্ছে একটি পরিবার। যখনই আওয়ামী লীগ এক হয় পৃথিবীর কোনো শক্তি নেই তখন আওয়ামী লীগকে পরাজিত করতে পারে। তাই সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তার ওপর অর্পিত গুরুদায়িত্ব সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালনের অঙ্গীকার করে তিনি বলেন, অতীতের মতো আগামীতেও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সবাইকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। ঘোষণাপত্র অনুমোদন যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্যাপক সংশোধিত আওয়ামী লীগের ঘোষণাপত্র কাউন্সিলদের বৈঠকে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই ঘোষণাপত্রে যেসব সংশোধন আনা হয়েছে তা কাউন্সিল সভায় তুলে ধরেন। তিনি জানান, সংশোধিত ঘোষণাপত্রে ‘বিএনপি-জামায়াত জোটের ৫ বছরের দুঃশাসন, নিপীড়ন-নির্যাতন’, বর্তমান মহাজোট সরকারের ৪ বছরের উন্নয়ন ও সাফল্যে এবং জাতিসংঘে গৃহীত শান্তির মডেল বিস্তারিতভাবে সংযোজন করা হয়েছে। এছাড়া সংসদে পাস হওয়া পঞ্চদশ সংবিধান সংশোধনের আলোকেও ঘোষণাপত্রের অনেক জায়গায় কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে। খুব শিঘ্রই ঘোষণাপত্র ছাপিয়ে সারাদেশের নেতাকর্মীদের কাছে পৌঁছে দেয়া হবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। এরপর দলের আয়-ব্যয়ের হিসাবও অনুমোদন নেয়া হয়। দলের কোষাধ্যক্ষ এ এইচ এন আশিকুর রহমান এমপি আয়-ব্যয়ের হিসাব তুলে ধরে বলেন, ব্যাংকে দলীয় ফ্যান্ডে ৮ কোটি ২৫ লাখ ৪৯ হাজার টাকা গচ্ছিত রয়েছে। এছাড়া আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের পাশে দলের জন্য ৪ শতাংশ জায়গা কেনা হয়েছে। বিভিন্ন প্রকাশনা ও তা বিক্রিবাবদ এক কোটি ৪২ লাখ টাকা, দান থেকে ৫ কোটি ৫ লাখ এবং চাঁদা আদায় বাবদ এক কোটি ৩৮ লাখ টাকা আয় হয়েছে। বিভিন্ন মহলের অভিনন্দন আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সপ্তমবারের মতো সভাপতি এবং সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সাধারণ সম্পাদক পদে পুন:নির্বাচিত হওয়ায় অভিনন্দন জানিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন। শেখ হাসিনা ও সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে অভিনন্দন জানিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ক্যাপ্টেন (অব.) এবি তাজুল ইসলাম, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) হেলাল মোর্শেদ খান, ভাইস চেয়ারম্যান সুলতান উদ্দিন আহমেদ রাজা, শামছুল কাওনাইন কুতুব, মাহমুদুল হক, মহাসচিব (প্রশাসন) এমদাদ হোসেন মতিনসহ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের নেতৃবৃন্দ। কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের যুগ্ম-মহাসচিব সফিকুল বাহার মজুমদার টিপু স্বাক্ষরিত এক অভিনন্দন বার্তায় এ তথ্য জানানো হয়। পৃথক বিবৃতিতে অভিনন্দন জানিয়েছেন আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা মো:আবু কাওছার ও সাধারণ সম্পাদক পংকজ দেবনাথ, বাংলাদেশ টিএন্ডটি শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেল ইউনিয়ন-সিবিএ।