গণমাধ্যমসহ দেশের সব পেশা ও শ্রেণীর মানুষের কাছে বছরজুড়ে আলোচনা-সমালোচনায় ছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সর্বাধিক আলোচিত পদ্মা সেতু দুর্নীতি, হলমার্কের ঋণ জালিয়াতি, ডেসটিনি এমএলএম বাণিজ্য, রেলওয়ের নিয়োগ বাণিজ্য ও সুরঞ্জিত সেনগুপ্তসহ কয়েক মন্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা এবং চেয়ারম্যানের নানা ধরনের বক্তব্যে বছর জুড়েই গণমাধ্যমে সরব ছিল দুদক। বিশেষ করে পদ্মা সেতুর দুর্নীতির মামলায় সৈয়দ আবুল হোসেনকে আসামি করা হবে কি না? বা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সম্পর্কে সুষ্ঠু অনুসন্ধান হচ্ছে কি না? এবং সোনালী ব্যংকের ঋণ জালিয়াতির ব্যাপারে সংসদ সদস্যসহ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে। দুদক নিয়ে মুখরোচক আলোচনা ছিল চায়ের দোকান থেকে সংসদ, সরকারি দল থেকে বিরোধী দলের সকল পর্যায়ে। ২০১২ সালের দুর্নীতির অভিযোগে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুদক ৩২৭টি মামলা করলেও তাদের করা মামলায় উল্লেখযোগ্য কারও সাজা হয়নি। তবে অতীতের তুলনায় এ বছরটিতে দুদক তাদের কর্মকাণ্ডে অনেক প্রশংসা পেয়েছে।
এ বছরের একেবারে গোড়ার দিকে ৩ জানুয়ারি দুর্নীতি দমন কমিশন বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্নীতি অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ওই সব প্রতিষ্ঠান হচ্ছে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়, ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের দুই অংশ, এলজিইডি, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বিআরটিএ, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন, বিটিসিএল ও রাষ্ট্রায়ত্ত সকল ব্যাংক। অনুসন্ধান করে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে। এমনকি ফিলিপাইনের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাজেদা রফিকুন নেসার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলার পাশপাশি সড়ক বিভাগের বিভিন্ন টেন্ডারের দুর্নীতি নিয়ে মামলা দায়ের করেছে। তবে বছরের শুরুতে ৪ জানুয়ারি ভৈরব সেতু নির্মাণে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দুর্নীতির কোনো সংশ্লিষ্টতা পায়নি বলে দুদক ভৈরব সেতুর দুর্নীতির অনুসন্ধান সমাপ্ত ঘোষণা করে। শুরু হয় দুদক নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা। এরপর দুদক বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মামলা দায়ের করেছে। এগুলো নিয়ে গণমাধ্যম বরাবরই ছিল সরব।
হলমার্ক জালিয়াতি
সোনালী ব্যাংকের সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা ঋণ হলমার্ক কেলেঙ্কারিতে জড়িত থাকা সন্দেহে সোনালী ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের ১১ সদস্যকে ২৫ সেপ্টেম্বর দুদকে হাজির হওয়ার জন্য নোটিশ পাঠায়। এর মধ্যে ছিলেন, সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ও সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান কাজী বাহারুল ইসলাম, পরিচালনা পর্ষদের সদস্য শহিদুল হক মিয়া, সুভাস সিং রায়, জান্নাত আরা হেনরি, কাশেম হুমায়ন, আনওয়ার শহীদ, এএসএম নাইম, কেএম জামাল রোমেল, সাইমুম সরোয়ার কমল, সত্যেন্দ্র চন্দ্র ভক্ত ও প্রদীপ কুমার দত্তকে। ২রা সেপ্টেম্বর দুদকের সেগুন বাগিচার কার্যালয়ে আসেন হলমার্ক কেলেঙ্কারির হোতা হলমার্ক গ্রুপের এমডি তানভীর মাহমুদ, চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলাম ও হলমার্ক গ্রুপের জিএম তুষার আহমেদ। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাদেরকে ডাকা হয়। ৩ সেপ্টেম্বর সোনালী ব্যাংক হলমার্কের এমডি তানভীর মাহমুদকে একটি পত্র দিয়ে ১৫ দিনের মধ্যে তার কাছে পাওনা টাকার অর্ধেক ফেরত দিতে বলে। ৭ সেপ্টেম্বর সরকার তানভীরের দেশ ত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ১১ সেপ্টেম্বর হলমার্কের এমডি তানভীর বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে একটি প্রচার বিজ্ঞপ্তি দিয়ে সোনালী ব্যাংকে জানিয়ে দেয় ১৫ দিনে নয়, ব্যাংকের টাকা ফেরত দিতে তাদের ৩০ বছর সময়ের প্রয়োজন। এরপর ২৭ সেপ্টেম্বর দুদক কর্মকর্তারা হলমার্ক কেলেঙ্কারি বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন সোনালী ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের সদস্য কাশেম হুমায়ুনকে।
৮ই অক্টোবর দুর্নীতি দমন কমিশন সোনালী ব্যাংক রূপসী বাংলা শাখা থেকে ঋণের নামে ২ হাজার ৬শ’ কোটি টাকা লুটপাটের দায়ে হলমার্কের এমডি তানভীর, চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলাম, জিএম তুষার আহমেদসহ সোনালী ব্যাংকের বিভিন্ন পর্যায়ের মোট ২৭ জনকে আসামি করে রমনা থানায় একটি মামলা করে। ৭ অক্টোবর মিরপুরের একটি বাসা থেকে র্যাব সদস্যরা গ্রেফতার করে হলমার্ক কেলেঙ্কারির হোতা তানভীর মাহমুদ ও তার ভায়রা তুষার আহমেদকে। গ্রেফতারের সময় তাদের কাছে একটি অবৈধ পিস্তল পাওয়া যায়। ৮ অক্টোবর তাদেরকে আদালতে নেয়া হলে আদালত তানভীর ও তুষারকে ২৯ দিনের রিমান্ডে নেয়ার আদেশ দেয়। ১৪ অক্টোবর হলমার্ক কেলেঙ্কারির অন্যতম সহযোগী সোনালী ব্যাংক রূপসী বাংলা শাখার ম্যানেজার আজিজুর রহমানকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ১৮ অক্টোবর র্যাব-৪ এর সদস্যরা মানিকগঞ্জ শহর থেকে গ্রেফতার করে হলমার্ক গ্রুপের চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলামকে। ১৯ তারিখে আদালত জেসমিনকে ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। ৮ নভেম্বর দ্বিতীয় দফা রিমান্ডে নেওয়া হয় হলমার্ক চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলামকে। ২৭ নভেম্বর আদালত ডেসটিনির সকল সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেয়। এখনো দুদক এই মামলা তদন্ত করছে।
রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে নিয়োগ দুর্নীতি ও
সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত
বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে নিয়োগ দুর্নীতির ৭০ লাখ টাকাসহ ৯ এপ্রিল মাঝ রাতে গ্রেফতার হন সে সময়ের রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের এপিএস ওমর ফারুক, পূর্বাঞ্চল রেলের প্রধান ইউসুফ আলী মৃধা ও রেলওয়ের কমান্ড্যান্ট এনামুল হক। কথা ওঠে নিয়োগ দুর্নীতির ওই টাকা যাচ্ছিল সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের বাসায়। দুদক রেল নিয়োগ দুর্নীতির অভিযোগ আমলে নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করে। মে মাসে অনুসন্ধান শেষে দুদক রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে সাদা সনদ দিয়ে বলে ওই দুর্নীতি ও টাকার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। মামলা করা হয় ওমর ফারুক, ইউসুফ আলী ও এনামুলের বিরুদ্ধে, যদিও গণমাধ্যমে সাক্ষাত্কার দিয়ে ওমর ফারুকের গাড়ি চালক বলেন, ওই টাকা নিয়ে তিনি মন্ত্রীর বাড়িতেই যাচ্ছিলেন। এরপর ৫ অক্টোবর দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি হয় সাবেক রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের এপিএস ওমর ফারুকের গাড়ি চালক পলাতক আজম খানের একটি সাক্ষাত্ প্রচার হওয়ায়। একটি স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলের সঙ্গে সাক্ষাত্কারে আজম খান দাবি করেন, গাড়িতে থাকা টাকা ছিল ঘুষের টাকা এবং ওই টাকা যাচ্ছিল মন্ত্রীর বাসায়। এরপরও দুদক আর এ বিষয়টি নিয়ে আর কোনো অনুসন্ধান করেনি।
পদ্মা সেতু
পদ্মা সেতু প্রকল্পের পরামর্শক নিয়োগের ব্যাপারে কানাডীয় কোম্পানি এসএনসি লাভালিনের দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ ওঠার পর গত বছরের সেপ্টেম্বরে ২৯১ কোটি ডলারের পদ্মা সেতু প্রকল্পে ১২০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি স্থগিত করে বিশ্ব ব্যাংক। এরপর দুর্নীতির অনুসন্ধানে সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, সাবেক পররাষ্ট্র মন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী, সেতু সচিব মোশাররফ হোসেনসহ ২৯ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে দুর্নীতি দমন কমিশন। অপরদিকে বিশ্ব ব্যাংকের শর্তানুযায়ী বিশ্ব ব্যাংকের পর্যবেক্ষক ওকাম্পো ও তার সঙ্গী টিমোথি টং ও রিচার্ড অল্ডারম্যানের বিশেষজ্ঞ প্যানেল দেশে এসে দুদকের তদন্ত পর্যবেক্ষণ করেন। তিন দিনের সফর শেষে তারা যাওয়ার সময় দুদককে বেশ কিছু পরামর্শ দেন। এর পর ২ ডিসেম্বর দ্বিতীয় দফায় দেশে আসে বিশ্ব ব্যাংকের প্যানেল। গত ৫ ডিসেম্বর বিশ্ব ব্যাংকের তিন পর্যবেক্ষকের সঙ্গে দুই দফা বৈঠক করেন দুদক কর্মকর্তারা। ওই বৈঠকের পর দুদক চেয়ারম্যান বলেছিলেন, দুর্নীতির ‘ষড়যন্ত্র’ যে হয়েছিল, সে বিষয়ে বিশ্ব ব্যাংক ও দুদক ‘একমত’ হলেও কার কার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হবে—সে বিষয়ে মতৈক্য হয়নি। শেষ পর্যন্ত মতৈক্য ছাড়াই ঢাকা ছাড়েন বিশ্ব ব্যাংকের প্যানেল। দীর্ঘ নাটকীয়তার পর বিশ্ব ব্যাংকের পরামর্শকে আমলে না নিয়েই রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ছাড়ায় গত ১৭ ডিসেম্বর পদ্মা সেতু দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের মামলার এজহার দায়ের করে দুদক। এজহারে তিনজন বিদেশিসহ পদ্মা সেতু প্রকল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত চার সরকারি কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়। তবে মামলার এজহারে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন ও সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরীর ব্যাপারে উল্লেখ করা হয়েছে, দরপত্র প্রক্রিয়াকরণের বিভিন্ন পর্যায়ে তদানীন্তন যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, কানাডিয়ান পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এসএনসি-লাভালিন ও অন্যান্য প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সাক্ষাত্ দেন। এসএনসি লাভালিনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাবেক মন্ত্রীর সাক্ষাতের ক্ষেত্রে সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী যোগাযোগ স্থাপনকারীর ভূমিকা পালন করেন। তা ছাড়া রমেশ শাহ’র (এসএনসি লাভালিনের ভাইস প্রেসিডেন্ট) নোটবুকে কাজ পাওয়ার পর পদ্মা পিসিসি (প্রজেক্ট কমার্শিয়াল কস্ট/ প্রজেক্ট কমিটমেন্ট কস্ট) হিসেবে দরপত্র মূল্যের বিভিন্ন পার্সেন্টেজ প্রদানের হিসাবে তাদের বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে।
গত ২৬ ডিসেম্বর পদ্মাসেতু প্রকল্পের পরামর্শক নিয়োগে দুর্নীতির ষড়যন্ত্র মামলায় প্রধান দুই আসামি সেতু বিভাগের সাবেক সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া ও সেতু কর্তৃপক্ষের নদী শাসন বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কাজী মো. ফেরদৌসকে আটক করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
