আ লো চি ত অ ন্যা ন্য

হরতালে শেষ হলো বছর

আপডেট : ৩০ ডিসেম্বর ২০১২, ১৯:৩৫
৪ থেকে ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১২টি হরতালের মধ্যে ১৮ দল ২টি, বিএনপি ২টি এবং জামায়াত-শিবির পৃথকভাবে ৪টি হরতালের ডাক দেয়। এর বাইরে বাম মোর্চার ১টি, ইসলামী সমমনা ১২ দলের ১টি এবং গড়ব বাংলাদেশ বিপ্লবী দলের ১টি হরতাল ছিল। কুমিল্লার বুড়িচংয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও একদিন সকাল-সন্ধ্যা হরতাল করেছে। বর্তমান মহাজোট সরকারের বিগত প্রায় চার বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক হরতাল হয়েছে এবারের ডিসেম্বর মাসে। মহান বিজয়ের মাসে একদিনের রাজপথ অবরোধসহ বিভিন্ন ধরনের ১৩টি হরতালের মধ্য দিয়ে বিদায় নিচ্ছে ইংরেজি ২০১২ সাল। ডিসেম্বর মাসে বিরোধী দলের কর্মসূচির মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল ৯ ডিসেম্বর সারাদেশে রাজপথ অবরোধ এবং গত ২৬ ডিসেম্বর ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ১৮ দলীয় জোটের গণসংযোগ ও পথসভা কর্মসূচি। সরকারের পরোক্ষ সহায়তায় বাম দলগুলোর ব্যতিক্রমী হরতালটিও ছিল আলোচিত। এর বাইরে ‘গড়বো বাংলাদেশ বিপ্লবী দল’ নামের একটি সংগঠনের শুধু ঢাকায় ডাকা আধাবেলা হরতালটি এক ধরনের হাস্যরসের জন্ম দেয়। ডিসেম্বর মাসজুড়ে হরতাল-অবরোধের কর্মসূচি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ৪ থেকে ২০ তারিখের মধ্যেই এসব হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি ছিল। এরমধ্যে সাপ্তাহিক সরকারি ছুটি শুক্রবার ও শনিবার ছিল যথাক্রমে—৭, ৮, ১৪ ও ১৫ তারিখ, আর ১৬ ডিসেম্বর ছিল মহান বিজয় দিবসের ছুটি। এই পাঁচদিন ছাড়া ছোট-বড় হরতালের (একটি অবরোধসহ) কর্মসূচি ছিল ৪, ৫, ৯, ১০, ১১, ১২, ১৩, ১৭, ১৮, ১৯ ও ২০ ডিসেম্বর। অর্থাত্ এই সময়ের মধ্যে কর্মসূচিহীন তারিখ ছিল কেবল ৬ ডিসেম্বর। অবরোধ ছাড়া ১২টি হরতালের মধ্যে দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতালের কর্মসূচি ছিল ৫টি, জেলা-উপজেলা-বিভাগীয় পর্যায়ে ৩টি সকাল-সন্ধ্যা ও ৪টি আধাবেলা হরতালের কর্মসূচি পালিত হয়েছে। এই ১২টি হরতালের মধ্যে ১৮ দল জোটগতভাবে ২টি, শুধু বিএনপি ২টি এবং জামায়াত-শিবির পৃথকভাবে ৪টি হরতালের ডাক দেয়। এর বাইরে বাম মোর্চার ১টি, ইসলামি সমমনা ১২ দলের ১টি এবং গড়বো বাংলাদেশ বিপ্লবী দলের ১টি হরতাল ছিল। কুমিল্লার বুড়িচংয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও একদিন সকাল-সন্ধ্যা হরতাল করেছে। এবারের বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে প্রথম হরতালের সূচনা করে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক জামায়াতে ইসলামী। গত ৩ ডিসেম্বর রাজধানীসহ সারাদেশে পূর্বঘোষিত প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করতে না দেওয়ার প্রতিবাদে এবং আটক দলটির শীর্ষ নেতাদের মুক্তিসহ নানা দাবিতে ৪ ডিসেম্বর সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল করে জামায়াত। বিএনপিসহ ১৮ দলের অন্য শরিকরা এই হরতালে নৈতিক সমর্থন দেয়। জামায়াতের এই হরতালের আলোচিত দিক ছিল রাজধানীর খিলক্ষেতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের একটি গাড়ি ভাঙচুর। হরতাল শেষে রাতে সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জামায়াত আনুষ্ঠানিকভাবে মার্কিন দূতাবাসের গাড়ি ভাঙচুরের দায়িত্ব স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করেছে, এমনকি ক্ষতিগ্রস্ত গাড়িটির ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও ঘোষণা দেয়। ৪ ডিসেম্বরের হরতালের সমর্থনে বিক্ষোভ করতে গিয়ে আগেরদিন (৩ ডিসেম্বর) দিনাজপুরের খানসামায় সংঘর্ষের সময় পুলিশের গুলিতে নিহত হন শিবির কর্মী মুজাহিদুল। এর প্রতিবাদে দিনাজপুর জেলা জামায়াতের আহ্বানে ৫ ডিসেম্বর স্থানীয়ভাবে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালিত হয়। দলীয় সন্ত্রাসীদের হাতে কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি সারোয়ার আলম পলাশ খুনের প্রতিবাদে ৫ ডিসেম্বর সেখানে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল কর্মসূচি পালন করে স্থানীয় আওয়ামী লীগসহ এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলো। এবারের ডিসেম্বরে বিএনপিসহ ১৮ দলের প্রথম কর্মসূচি ছিল ৯ তারিখ। এদিন পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী ঢাকাসহ সারাদেশে রাজপথ অবরোধ করে ১৮ দল। অবরোধ কর্মসূচি চলাকালে পুরান ঢাকায় নিহত হন নিরীহ পথচারী বিশ্বজিত্ দাস। তিনি ছাড়াও এদিন আরও দু’জন নিহত হন। ১০ ডিসেম্বর নাটোরে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল করেছে বিএনপি। দলের কেন্দ্রীয় স্বনির্ভর বিষয়ক সম্পাদক ও নাটোর জেলা বিএনপির সভাপতি রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে জেলা বিএনপির ডাকে এই হরতাল কর্মসূচি পালিত হয়। একইদিনে সিরাজগঞ্জে আধাবেলা হরতাল করে জামায়াত। ৯ ডিসেম্বর ১৮ দলের অবরোধ কর্মসূচি চলাকালে সিরাজগঞ্জে জামায়াত নেতা ওয়ারেস আলী নিহত হবার প্রতিবাদে এই হরতালের ডাক দেয় জেলা জামায়াত। ঢাকা সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ি পোড়ানো এবং পুলিশের গাড়ি ভাঙচুরের মামলায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ১০ ডিসেম্বর গ্রেফতার হলে পরদিন, ১১ ডিসেম্বর দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতাল করে ১৮ দল। মির্জা ফখরুলের মুক্তির দাবিতে ১২ ডিসেম্বর জেলা বিএনপির ডাকে ঠাকুরগাঁওয়ে সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত হরতাল হয়। মির্জা ফখরুলের মুক্তির দাবিসহ বিভিন্ন ইস্যুতে ১৩ ডিসেম্বর সারাদেশে সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত হরতাল পালন করে ১৮ দলীয় জোট। ১৭ ডিসেম্বর সোমবার ঢাকায় সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত হরতালের ডাক দেয় ‘গড়বো বাংলাদেশ বিপ্লবী দল’ ও ‘গড়বো বাংলাদেশ পার্টি’ নামের দুটি সংগঠন। রাজনীতি থেকে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার অবসর গ্রহণের দাবিতে তারা এই হরতাল ডাকে। তবে ঐদিনও যে একটি হরতাল ছিল তা নগরবাসী কেউ জানতেন না বললেই চলে। কোথাও হরতালের বিন্দুমাত্র প্রভাবও পরিলক্ষিত হয়নি। পরদিন ১৮ ডিসেম্বর মঙ্গলবার দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতালের কর্মসূচি দেয় বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) ও গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা। জামায়াতে ইসলামীসহ সকল সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা এবং একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকাজ দ্রুত শেষ করার দাবিতে তারা এই হরতাল আহ্বান করে। হরতাল সমর্থকরা এদিন রাজপথে মিছিল-সমাবেশ করলেও কোথাও গাড়ি ভাঙচুর কিংবা জ্বালাও-পোড়াওয়ের ঘটনা ঘটেনি। এই হরতালে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ প্রশাসনের পরোক্ষ সহযোগিতা ছিল অনেকটাই দৃশ্যমান। জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমানকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে ১৯ ডিসেম্বর সিলেট বিভাগে এবং দলের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক তাসনীম আলমকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে একইদিনে রাজশাহী বিভাগে সকাল ৬টা থেকে ২টা পর্যন্ত হরতাল করে স্থানীয় জামায়াত। ২০ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল করে ধর্মভিত্তিক কয়েকটি দলের জোট- ইসলামী ও সমমনা ১২ দল। কমিউনিস্টদের কথিত ‘অপতত্পরতা’ বন্ধের দাবিতে ১২ দলের ব্যানারে এই হরতাল ডাকা হলেও চারটি শরিকের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করে। বিদায়ী ২০১২ সালের ডিসেম্বরে প্রধান বিরোধী দলের সর্বশেষ উল্লেখযোগ্য কর্মসূচি ছিল গত ২৬ ডিসেম্বর ঢাকাসহ প্রতিটি মহানগরে ১৮ দলের গণসংযোগ কর্মসূচি। এর অংশ হিসাবে ঐদিন বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়া ঢাকায় পাঁচটি পথসভায় বক্তব্য রাখেন। তার নেতৃত্বে ১৮ দল ঢাকায় ৩২ কিলোমিটার পথ গণসংযোগ করে। বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে হরতাল-অবরোধের কর্মসূচি দেওয়ায় বিরোধী দলের সমালোচনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সরকারি দলের নেতারা। তারা বলেছেন, কার্যত একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকাজ বাধাগ্রস্ত করতে ও যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানোর জন্যই বিজয়ের মাসে কর্মসূচি দিয়েছে বিএনপি। এর জবাবে বিএনপি বলেছে, আওয়ামী লীগও অতীতে বিজয়ের মাসে হরতালসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে।