তা ন ভী র মা হ মু দ

কারসাজির শীর্ষে হলমার্ক

আপডেট : ৩০ ডিসেম্বর ২০১২, ১৯:৩৬
বিদায়ী বছরে আলোচিত কিংবা সমালোচিত যাই বলি না কেন যে কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে তার মধ্যে হলমার্কের আর্থিক কেলেঙ্কারি নিঃসন্দেহে সবাইকে নাড়া দিয়েছে। কোটি বা শত কোটি নয়, হাজার হাজার কোটি টাকার জালিয়াতির ঘটনা অতীতের যেকোনো রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। ২০০২ সালে পাঁচটি ব্যাংক থেকে ওম প্রকাশ নামের এক ভারতীয় ব্যবসায়ী কারচুপি করে ৩শ’ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছিল। অন্যদিকে ২০০৭ সালে চট্টগ্রামের নুরুন্নবী নামক এক ব্যবসায়ীর জাল করা স্থানীয় এলসি দিয়ে ৬২২ কোটি টাকা গায়েব করে দেওয়ার মতো ঘটনাও বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। বিদায়ী ২০১২ সালে ডেসটিনি গ্রুপের অপকর্মকে খোদ কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘হায় হায় কোম্পানি’ উপাধি দেয়। এর পরেই প্রকাশ পায় সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখায় (সাবেক শেরাটন) জালিয়াতির তথ্য। সোনালী ব্যাংকের ব্যর্থতাই হোক অথবা যোগসাজই হোক, হলমার্ক নামক অখ্যাত একটি গ্রুপের ২ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকাসহ রূপসী বাংলা শাখা থেকে ভুয়া ও প্রশ্নবিদ্ধ জালিয়াতির মাধ্যমে মোট ৩ হাজার ৬শ’ কোটি টাকা আত্মসাত্ করা হয়েছে। হলমার্ক ঘটনায় যারাই জড়িত থাকুক না কেন এর কর্ণধার তানভির মাহমুদের নাম জেনেছে সাধারণ মানুষ। দাবি অনুযায়ী কাগজে-কলমে ৮০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিক হলমার্ক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর মাহমুদ, তার স্ত্রী ও কোম্পানির চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলাম ইতোমধ্যেই গ্রেফতার হয়েছেন। আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন। দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর নিকট খোলা চিঠি। অন্যদিকে ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় জালিয়াতির ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হবার পর সমঝোতার ভিত্তিতে টাকা আদায়কে গুরুত্ব দিয়েছে সোনালী ব্যাংক। আর এ সুযোগ কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে হলমার্ক গ্রুপ। ব্যাংক থেকে অবৈধভাবে তুলে নেওয়া টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য দীর্ঘমেয়াদের সুযোগ চেয়েছে ওই গ্রুপ। যেভাবে উত্থান অক্টোবরে মামলার পর তানভীর ও হলমার্কের জিএম তুষারকে র্যাবের সহায়তায় মিরপুরের একটি বাসা থেকে গ্রেফতার করে দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক টিম। এর কয়েকদিন পর ব্যাংকের ব্যবস্থাপক আজিজ ও তানভীরের স্ত্রী জেসমিনকে গ্রেফতার করা হয়। তানভীর ঢাকার সিএমএম আদালতে স্বীকারোক্তি অনুযায়ী তিনি ১৯৮৭ সালে মানবিক বিভাগ থেকে এসএসসি এবং ১৯৮৯ সালে আখাউড়া শহীদ স্মৃতি ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ১৯৯৬ সালের শেষদিকে বাবার কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা নিয়ে ৫ হাজার টাকা ভাড়ায় ২৫ হাজার টাকা অ্যাডভান্স দিয়ে তালতলায় হলমার্ক প্যাকেজিং ফ্যাক্টরি দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। তারপর ধীরে ধীরে ব্যবসা বাড়তে থাকে। ২০০৮ সালে ৮/৯টি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয় হলমার্ক গ্রুপ। বর্তমানে যার ৬৫টি চলমান প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ১৫টি প্রতিষ্ঠান গঠন প্রক্রিয়াধীন আছে। এর মধ্যে গার্মেন্ট ৩৪টি। সবগুলো প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে বর্তমানে প্রতিষ্ঠানগুলোতে ৪০ হাজার শ্রমিক আছে। তানভীরে জবানবন্দি অনুযায়ী বিগত ২০০৪-২০০৫ সালের দিকে গার্মেন্ট থেকে লোকাল ব্যাক টু ব্যাক এলসি পাওয়ার পর সোনালী ব্যাংকের হোটেল শেরাটন শাখায় হলমার্ক প্যাকেজিংয়ের নামে অ্যাকাউন্ট খোলেন তানভীর। বর্তমানে ওই শাখায় ৫৭টি অ্যাকাউন্ট রয়েছে। অক্টোবর মাসে তানভীর মাহমুদ, চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলাম, মহাব্যবস্থাপক (জিএম) তুষার আহমেদ ও সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক ও ডিজিএম (সাময়িক বরখাস্ত) একেএম আজিজুর রহমানসহ ২৭ জনের বিরুদ্ধে রমনা থানায় পৃথক ১১টি মামলা দায়ের করে দুদক। এজাহারের তথ্য অনুযায়ী দেখা যায়, সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা হোটেল শাখা থেকে হলমার্ক মোট ২ হাজার ৬৮৬ কোটি ১৪ লাখ টাকা আত্মসাত্ করে। এর মধ্যে স্বীকৃত বিলের বিপরীতে পরিশোধিত (ফান্ডেড) অর্থ হচ্ছে ১ হাজার ৫৮৮ কোটি ৪৯ লাখ ৩৪ হাজার ৮৭৭ টাকা। গ্রেফতারের পর তানভীর মাহমুদের দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি অনুযায়ী সোনালী ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের একজন সদস্যকেই ঘুষ বাবদ দিয়েছেন ৩ কোটি টাকা। ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে শাখা ম্যানেজারসহ বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের দিতে হয়েছে আরও অন্তত ২ কোটি টাকা। মোট টাকার পরিমাণ ৫ কোটিরও বেশি অবৈধ প্রক্রিয়ায় ঋণ পেতে খরচ করেছেন তিনি। তানভীর যেসব ব্যাংক কর্মকর্তাদের বিষয়ে তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ঘুষের তথ্য দিয়েছেন তাদের মধ্যে এ পর্যন্ত চারজন গ্রেফতার হয়েছেন। এই তালিকায় রয়েছেন সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা হোটেল শাখার ম্যানেজার আজিজুর রহমান, সোনালী ব্যাংক জিএম কার্যালয়ের জিএম মীর মহিদুর রহমান, প্রধান কার্যালয়ের ডিএমডি সফিজ উদ্দিন আহমেদ ও শেখ আলতাফ হোসেন। হলমার্কের যত সম্পত্তি হলমার্কের দেওয়া প্রতিবেদনে দেখা গেছে, হলমার্ক গ্রুপের থাকা ৮৮টি গাড়ির মূল্য ধরা হয়েছে ৫০ কোটি টাকা। এ ছাড়া সোনালী ব্যাংকের হোটেল শেরাটন শাখায় মর্টগেজ করা জমির পরিমাণ ১৮৫ দশমিক ৩৭ বিঘা। প্রতি শতাংশ জমির বাজার মূল্য ২৪ লাখ ৭৭ হাজার ধরে এ জমির মূল্য হয় এক হাজার ৫১৫ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। সোনালী ব্যাংকের একই শাখায় মর্টগেজের জন্য জমাকরা জমির বাজার মূল্য ২৮ লাখ ৫৫ হাজার ধরে ৮৬ দশমিক ৬৪ বিঘা জমির মূল্য ৮১৬ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। ঢাকায় ক্রয় করা ছয় দশমিক ছয় বিঘা জমি রয়েছে এ গ্রুপের। প্রতি শতাংশ চার কোটি হিসাবে যার বাজার মূল্য ৮শ’ কোটি টাকা। এ ছাড়া অন্যান্য স্থানে হলমার্কের ১৩৬ দশমিক ৫০ শতাংশ জমি রয়েছে, যার বাজার মূল্য এক হাজার ২৪৩ কোটি ২১ লাখ টাকা। ৮০টি শেড ও চারটি সাত তলা বিল্ডিং রয়েছে তাদের। যার বাজারমূল্য এক হাজার কোটি টাকা ধরেছে ব্যাংক ও সার্ভে টিম। একইভাবে গার্মেন্ট ব্যবসায়ী এ গ্রুপের ১শ’ লাইন নিট, ১শ’ লাইন ওভেন মেশিন, ২০৪টি নিটিং মেশিন, ৪৫ টন ড্রাইং মেশিন, স্পিনিংসহ সকল ধরনের এক্সেসরিজ মেশিনের দাম ধরা হয়েছে ৪শ’ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এদিকে কাভার্ডভ্যান থেকে শুরু করে বিলাসবহুল গাড়ি রয়েছে এ গ্রুপের। এসব গাড়ির মধ্যে প্রাডো দুটি, পাজেরো তিনটি, রয়েল ক্রাউন দুটি, প্রিমিয় এফ চারটি, এম (আউটলেন্ডার) পাঁচটি, রেভো ফোর তিনটি, করোলা জি ১৩টি, প্রবক্স তিনটি, সাকসিড দুটি এবং মার্ক টু, লেক্সাস হ্যারিয়ার, ক্লুজার জিপ ও ফিলডার কার রয়েছে একটি করে। এ ছাড়া হাইচ ও মাইক্রো নামের মাইক্রোবাস রয়েছে ১৮টি, পিকআপ ২১টি এবং বড় ছোট মিলিয়ে কাভার্ড ভ্যান রয়েছে আটটি। হলর্মাক কলেঙ্কারির সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব কী হতে পারে? বিশ্লেষকদের মতে এই কেলেঙ্কারির কারণে আমানতকারীরা সোনালী ব্যাংক এবং সার্বিকভাবে ব্যাংকিং খাতের উপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলতে পারে। অর্থাত্ ব্যাংকিং খাত সর্ম্পকে আমানতকারীদের মধ্যে এক ধরনের নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হতে পারে। আর্থিক কেলেঙ্কারি পূর্বেও হয়েছে কিন্তু হলমার্কের ঘটনার আস্থাহীনতার ফলাফল হতে পারে সুদূর প্রসারী। আমরা যদি শেয়ার বাজারের কথাই চিন্তা করি তাহলে দেখতে পাবো যে, বাজারে অনেক ভালো ভালো নতুন শেয়ার এলেও শুধুমাত্র আস্থাহীনতার কারণে বাজার ঘুরে দাঁড়াচ্ছে না। চার হাজার কোটি টাকা তেমন একটা ব্যাপার নয় এবং গণমাধ্যম অযথাই একটা ছোটখাটো বিষয় নিয়ে অতি বেশি লেখালেখি হচ্ছে। অর্থমন্ত্রীর এমন মন্তব্য সম্পর্কে বিশ্লেষকরা বলছেন উনি হয়তো সম্ভাব্য আস্থাহীনতা লাঘবের চিন্তা থেকেইে হয়তোবা ওই বক্তব্য দিয়েছিলেন। আর্থিক খাতের ওপর আস্থাহীনতা তৈরি হলে ব্যাংকগুলোতে তারল্যের চাপ আরও ঘনীভূত হবে। আমরা যদি বহির্বিশ্বের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাবো যে, যুক্তরাষ্ট্রে গৃহ নির্মাণ শিল্পে দাম পড়ে যাওয়ার কারণে অনেক ব্যাংক খারাপ সম্পদ দ্বারা ভারাক্রান্ত হয়ে পথে বসে যায়। জাপানের ক্ষেত্রেও এমনই ঘটেছিল। আবার অনেক সময় শেয়ার বাজারের কারণেও এমনটি হতে পারে। তবে কোনো জামানত ছাড়াই শুধুমাত্র নকল কাগজ দেখিয়ে অর্থ নেওয়ার ঘটনা বাংলাদেশের আর্থিক কেলেঙ্কারিতে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। সোনালী ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, এ অর্থ কেলেঙ্ককারি জন্য দোষীদের শাস্তির চেয়ে ব্যাংক থেকে অবৈধভাবে তুলে নেওয়া টাকা আদায়কেই প্রথম থেকেই প্রাধান্য দিয়ে আসছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। আর এ সুযোগকে কাজে লাগাতে চাচ্ছে হলমার্ক গ্রুপ। অনেকেই এতদিন ধরে বলে আসছিলেন সোনালী ব্যাংক থেকে হলমার্ক গ্রুপ যে পরিমান টাকা নিয়েছে তা পরিশোধ করার জন্য পর্যাপ্ত টাকা নেই ওই গ্রুপের কাছে। তাদের কথা জবাব দিতেই হলমার্ক গ্রুপ তাদের সম্পত্তির হিসাব দিয়েছে সোনালী ব্যাংকে। এত বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনায় শুধু গুটি কয়েক ব্যক্তি দায়ী নয়, এর সাথে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছাড়াও ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জড়িত রয়েছে বলে জানা যায়। বিশেষ করে সোনালী ব্যাংকের একজন পরিচালকের দিকেই ইঙ্গিত ছিল যিনি নেপথ্যে কলকাঠি নেড়েছেন। তবে এর জন্য ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাও কম দায়ী নয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনার মূল চালিকাশক্তি ও অভিভাবক বাংলাদেশ ব্যাংককে নানাভাবে দুর্বল করে রাখা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনেক দায়িত্ব ও ক্ষমতা হরণ করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগটি আবার চালু করা হয়েছে। এ বিভাগের অধীনে শুধু সোনালী ব্যাংকই নয়, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর দক্ষতা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। পরিচালক নিয়োগেও হয়েছে রাজনীতিকীরণ। গণমাধ্যমের কল্যাণে হলমার্ক কেলেঙ্কারি সবার চোখ খুলে দিয়েছে বটে, কিন্তু দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে ঠিক একইভাবে এই বিল ব্যবসার মাধ্যমে আরও বহুগুণ অর্থ তুলে নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এক হলমার্কই শেষ নয়। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সাথে সম্মিলিতভাবে এ ধরনের কারসাজির ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের ব্যবসায়িক সুনাম। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।