‘মা’ কথাটি মুন্নীর কাছে এখন কবিতার মতোই। এই পৃথিবীতে এখন সে কাকে ‘মা’ বলে ডাকবে। মায়ের লাশটি এখন পর্যন্ত শনাক্ত করতে পারেনি। বারবার ছুটে যাচ্ছেন জুরাইন কবরস্থানে। যেখানে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়েছে ৫৯ জনকে। মুন্নীর ধারণা এই ৫৯ জনের মধ্যেই তার মায়ের লাশ থাকবে। মায়ের লাশ শনাক্তের জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক ল্যাবে ডিএনএ নমুনাও তিনি দিয়েছেন। এখন মুন্নী অপেক্ষা করছেন কবে তার মায়ের লাশ শনাক্ত হবে। লাশ শনাক্ত হচ্ছে না বলেই মুন্নী সরকার ঘোষিত আর্থিক ক্ষতিপূরণ পাচ্ছে না। এই পৃথিবী থেকে তার ‘মা’ বিদায় নিলেও বেঁচে থাকার জন্য তার এখন এই আর্থিক সহযোগিতা প্রয়োজন। এ রকম তাজরীন ফ্যাশনে অগ্নিকাণ্ডে নিহত ৫৯ জনের পরিবার এখনও কোনো আর্থিক ক্ষতিপূরণ পায়নি।
বছরের শেষ দিকে এসে দেশের গার্মেন্টস সেক্টরে এই ভয়াবহ আগুন অনেক শ্রমিকের জীবনে এক দুঃসহ স্মৃতি বহন করছে। কেউ হারিয়েছে তার অভিভাবক, কেউ হারিয়েছে তার স্বামী, কেউবা হারিয়েছে তার প্রিয়তমা স্ত্রীকে। আবার বাবা হারিয়েছে তার সন্তানকে। পিতার ঘাড়ে সন্তানের লাশ অথবা স্বামীকে দাফন করতে যাওয়ার সময় স্ত্রীর শেষ আকুতি। এমনই এক অগ্নিকাণ্ডের ট্রাজেডিতে সারাদেশে নেমে আসে শোকের ছায়া। আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর পরিণত হয় অনিশ্চিন্তপুরে। দিনটি ছিল ২৪ নভেম্বর শনিবার। অন্যান্য দিনের মতোই সন্ধ্যা ৭টার পর অতিরিক্ত কাজ চলছিল তাজরীন ফ্যাশনে। অগ্নিকাণ্ড থেকে বেঁচে যাওয়া শ্রমিক স্বপন বলেন, তিনি দোতালায় কর্মরত ছিলেন। ঘটনার পর ফায়ার অ্যালার্ম বেজে ওঠে। তখন তিনি আগুন লেগেছে ভেবে নামতে গেলে ফ্লোর ইনচার্জ তাকে জানান যে কিছু হয়নি। এলার্ম নষ্ট হয়ে গেছে তাই এটি বাজছে। নিচতলায় নেমে দেখেন সূতার গোডাউন থেকে আগুনের পোড়া গন্ধ বের হচ্ছে। তিনি তিন তলায় চলে যান। সেখানে সিকিউরিটির দায়িত্বে কয়েকজন তাকে জানান যে আগুন নেভানোর মহড়া দেখানো হচ্ছে। প্রায় ১০ মিনিট পর নিচতলা থেকে আগুনের ধোঁয়া দোতালার সিঁড়ি (নারী শ্রমিকদের ওঠানামা) দিয়ে ওপরের দিকে বের হতে থাকে। আগুন লাগার পর সিঁড়ি দিয়ে বের হওয়ার জন্য হুড়মুড় করে শ্রমিকরা নামতে থাকে। তবে বেশি সময় ধরে শ্রমিকরা বের হতে পারেনি। আগুনের লেলিহান শিখার কারণে শ্রমিকরা সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে থাকে। অনেকেই তৃতীয় তলা ও চতুর্থ তলার জানালা ভেঙে পাশের নির্মাণাধীন তিন তলা বাড়ির ছাদে লাফিয়ে আত্মরক্ষা করেন।
বেঁচে যাওয়া শ্রমিকরা জানান, আগুন গার্মেন্টসে ছড়িয়ে পড়লে কর্তৃপক্ষ চারতলার কলাপসিবল গেট বন্ধ করে দেয়। অনেক শ্রমিক তৃতীয় তলার জানালা ভেঙে লাফিয়ে আত্মরক্ষা করেন। আবার কারখানার ৭ম ও ৮ম তলা থেকে যেসব শ্রমিক লাফ দিয়ে বাঁচার চেষ্টা করেছিল, তাদের ৯ শ্রমিকেরই নিচে পড়ে মৃত্যু হয়। ভোর থেকে একের পর এক উদ্ধার করা হয় লাশ। চারদিকে স্বজনদের আহাজারি। চোখের সামনে এত বড় মানবিক বিপর্যয়ের দৃশ্য দেখে কেইবা ধরে রাখতে পারে অশ্রু। নিহত শ্রমিকদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিল নারী শ্রমিক। এদের মধ্যে ৫১ জন শ্রমিকের লাশ শনাক্ত করে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হলেও বাকি ৫৯টি লাশ এমনভাবে পুড়েছে যে তা চেনার উপায় নেই। লাশগুলো পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে। লাশগুলো আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে লাশগুলো শনাক্ত করে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। নিহত প্রায় সব শ্রমিকের বাড়ি উত্তরাঞ্চলের মঙ্গাপীড়িত এলাকা রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চলে।
মাহফুজা তাজরীন গার্মেন্টেসে অপারেটর হিসেবে কাজ করতেন। অগ্নিকাণ্ডের রাতে তিনি কারখানায় কর্মরত অবস্থায় আগুনে পুড়ে মারা যান। অন্তত তার লাশটি শনাক্ত করে দাফন করা সম্ভব হয়েছে। তবে এ হতভাগিনীর ১৮ মাস বয়সী ছেলে মামুনকে এখনও মিথ্যা সান্ত্বনা দিয়ে রাখা হচ্ছে। মায়ের জন্য কান্নাকাটি করলে তাকে বলা হয়, ‘তার মা কাজে গেছে, শিগগিরই ফিরে আসবে। মাহফুজার মতো আর কোনো দিন ফিরে আসবেন না মিতু বেগম। তার স্বামী সাদ্দাম হোসেন একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। এ দম্পতির একমাত্র শিশু সন্তান মিজানের বয়স ১১ মাস। মা-হারা মিজানের শরীরে এ ক’দিনের মধ্যেই ভাঙন ধরেছে। তাজরীনের ফ্লোর ইনচার্জ কবির হোসেন। স্ত্রী মাহমুদাও তাজরীনে অপারেটর পদে কাজ করতেন। ওই রাতে তারা দু’জন কারখানায় কর্মরত অবস্থায় পুড়ে মারা যান। তাদের শিশু সন্তান মাহফুজ ও মাহী এখন এতিম হয়ে গেছে।
জন্মের এক বছর পরই বাবাকে হারিয়েছিলেন রূপবানু। তারপর থেকে শিশুসন্তানটি সঙ্গে নিয়েই হতদরিদ্র মা নাছিমা বেগমের শুরু হয় বেঁচে থাকার লড়াই। স্কুলের গণ্ডি পেরোনোর আগেই রূপবানুকে বসতে হয়েছিল বিয়ের পিঁড়িতে। মা যৌতুক দিতে পারেননি, শুরু হয় স্বামীর নির্যাতন। অতিষ্ঠ রূপবানু ময়মনসিংহের বাড়ি থেকে পালিয়ে ঢাকায় আসেন। চাকরি নেন তোবা গ্রুপের তাজরীন ফ্যাশনে। রূপবানু স্বপ্ন দেখেন নতুন করে বাঁচার। বৃদ্ধ মায়ের জন্য পাঠান নিজের উপার্জনের একাংশ। এক বছর ভালোই কাটছিল মা-মেয়ের জীবন। কিন্তু তাজরীন ফ্যাশনের আগুন অকালেই রূপবানুর জীবন আর স্বপ্ন পুড়িয়ে অঙ্গার করে ফেলে। মায়ের কাছ থেকেও কেড়ে নিয়েছে তার বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন।
ছয় মাস আগে বিয়ে করেছিলেন মাসুদ এবং জলি। জলি তাজরীন ফ্যাশনে চাকরি করলেও মাসুদ একটি চাকরির সন্ধানে ছিলেন। অগ্নিকাণ্ডের পর মাসুদ তার স্ত্রী জলির লাশটি খুঁজছেন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ফরেনসিক ল্যাবে ডিএনএ নমুনা দেওয়া হয়েছে জলি’র লাশটি শনাক্তের জন্য।
ওরা তিন বোন। লাভলী (২০), লাইলী (১৭) ও পপি (১৫)। বাড়ি রংপুরের গঙ্গাচড়া থানার তিস্তাপাড়ের অভাবীগ্রাম ছালারপাড়। বাবা বাবুল মিয়া রংপুর শহরে রিকশা চালান। লাভলী, লাইলী ও পপির আরও তিন বড় বোন রয়েছে যাদের বিয়ে হয়ে গেছে। অভাবের সংসারে লাভলী চাচাতো ভাই শাহ আলমের মাধ্যমে ঢাকায় চলে আসেন। কাজ নেন তাজরীন ফ্যাশনে। বেঁচে থাকার জন্য লাভলী তার ছোট দুই বোনকে আশুলিয়ায় এনে তাজরীন ফ্যাশনে চাকরি দেন। তারা কাজ করতেন গার্মেন্টসের ৫ম তলায় সুইং শাখায়। অগ্নিকাণ্ডের পর এই তিন বোনের আর খোঁজ মিলছে না। তিন মেয়ে আগুনে নিহত হলেও এখনও বাবুল মিয়া একটি টাকা আর্থিক সহায়তা পাননি।
অগ্নিকাণ্ডে আহত শ্রমিকদের খোঁজখবর নিতে গিয়ে গা শিউরে ওঠা তথ্য দিলেন ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া এক আহত শ্রমিক আলো। তিনি জানান, গার্মেন্টসের দোতলায় একটি শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র (ডে কেয়ার সেন্টার) ছিল। তিনি তার ফ্লোরে যাওয়ার সময় শিশুকেন্দ্রে ২০ জনের মতো শিশু দেখেছিলেন। আগুন লাগার সময় তার ফ্লোর চার তলাতেই দু’তিন সহকর্মী শিশুকেন্দ্রে রাখা তাদের বাচ্চার জন্য কান্নাকাটি করছিলেন। দরজা বন্ধ থাকায় কেউ সন্তানের খোঁজও নিতে পারেননি। একই সঙ্গে আরও কয়েক শ্রমিক নিশি, নুরুন্নাহারও জানান, কারখানায় প্রতিদিন বহু মা-শ্রমিক তাদের বাচ্চাদের নিয়ে যেতেন। শিশুরা থাকত শিশু পরিচর্যা কেন্দ্রে। আগুন লাগার পর এ শিশুদের ভাগ্যে কী ঘটেছে কেউ জানে না।
পরে কারখানায় উদ্ধার তত্পরতা চালানো ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে তারা জানান, কারখানা কর্তৃপক্ষের কেউ তাদের এ ব্যাপারে কিছুই জানাননি। দোতলায় সব কিছু পুড়ে একেবারে ছাই হয়ে গেছে। এ ফ্লোর থেকে কোনো মানবদেহই উদ্ধার করা যায়নি। ফ্লোর থেকে হাত, কানসহ শরীরের নানা টুকরো উদ্ধার করা হয়।
নাম-পরিচয় শনাক্ত না করে জুরাইন দাফন করা ৫৯ জনের মধ্যে ৪০ জনের স্বজন হিসেবে দাবিদার পাওয়া গেলেও বাকি ১৯ জনের স্বজন হিসেবে এখন পর্যন্ত কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে স্বজন হিসেবে দাবি করলেও এখনও ওই ৪০ জনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরির অধ্যাপক ডা. শরীফ আখতারুজ্জামান বলেন, ‘আমরা ৫৯ জনের মরদেহের নমুনা রেখেছি ডিএনএ টেস্টের জন্য। তাদের পরিচয় শনাক্ত করতে হলে মৃতদের স্বজন বলে দাবিদারদের শরীরের নমুনাও সংগ্রহ করতে হবে। কিন্তু গত এক মাসে ৪০ জনের স্বজন এসে ল্যাবে নমুনা দিয়ে গেছে। তবে বাকি ১৯ জনের স্বজন দাবি করে কেউ এখনও আসেনি।’
অগ্নিকাণ্ডে আহত সব শ্রমিক ক্ষতিপূরণ পাননি। পরিচয় নিশ্চিত না হওয়ায় নিহত শ্রমিকের সব পরিবারকে ক্ষতিপূরণও দেওয়া সম্ভব হয়নি। আহত ৪৭ জন শ্রমিককে এক লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। বাকি ২৭ জনের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলে বিজিএমইএ সূত্রে জানা গেছে। ৬ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী ৪৩ জন নিহত শ্রমিকের পরিবারকে ছয় লাখ টাকা করে দিয়েছেন। পরে আরও কয়েকজন নিহত শ্রমিকের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে। প্রতিবেদনে অবহেলার জন্য মালিকপক্ষকে দায়ী করা হয়েছে। এ জন্য আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হলেও সে রকম কোনো উদ্যোগ এখনও শুরু হয়নি।
