বিশ্বজুড়ে নানা রকম প্রাপ্তি, আনন্দ, সাফল্য, হতাশা আর ঘটনার মধ্যে দিয়ে পার হলো আরও একটি বছর, ২০১২। নতুন বছরে পা দিয়ে আমরা পেছন ফিরে তাকাই, আমাদের জন্য কী রেখে গেল বিদায়ী বছরটি। আর তাই আমাদের আজকের আয়োজনে থাকছে বিগত বছরজুড়ে ঘটে যাওয়া এমন কিছু ঘটনা যা আমাদের হূদয় নাড়া দিয়ে যায়।
সেরা দৌড়বিদ বোল্ট
কার্ল লুইসের পর তিনি দ্বিতীয় তারকা যিনি পরপর দুই অলিম্পিক আসরে নিজের দ্রুততার প্রমাণ দিলেন। এই দৌড়বিদের নাম বোল্ট। লন্ডন অলিম্পিকে ১০০ মিটার দৌড়ে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখলেন উসাইন বোল্ট। বোল্ট প্রমাণ করলেন যে, তিনিই বিশ্বের দ্রুততম মানব। কার্ল লুইসের পর বোল্ট দ্বিতীয় তারকা যিনি পরপর দুই অলিম্পিক আসরে নিজের দ্রুততার প্রমাণ দিলেন। তবে এবার বোল্ট আগে গড়া নিজের বিশ্ব রেকর্ড থেকে ০ দশমিক ৫ সেকেন্ড বেশি সময় নিয়েছেন। যুক্তরাজ্যের শাসন থেকে নিজ দেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তির একদিন আগে বোল্টের এই সাফল্য যেন তার দেশের জন্য স্বাধীনতার উপহার। বেইজিং অলিম্পিকে এই দৃশ্যের সঙ্গে বিশ্বের প্রথম পরিচয়। লন্ডনে এর পুনরাভিনয়ে একটু পার্থক্য থাকল। বেইজিংয়ে প্রায় ২০ মিটার বাকি থাকতেই বুক চাপড়ে, দুই হাত ছড়িয়ে উদযাপন শুরু করে দিয়েছিলেন। শুধু অলিম্পিকে কেন, কোথায় ১০০ মিটারে এমন দৃশ্য কেউ দেখেছেন বলে মনে করতে পারেন না। এখানে বোল্টকে সর্বস্ব নিংড়ে দিতে হলো। এর আগে বেইজিংয়ে ৯.৬৯ সেকেন্ড শুধু অলিম্পিক রেকর্ডই ছিল না, ছিল নতুন বিশ্ব রেকর্ডও। এখানে ৯.৬৩ সেকেন্ডে শুধু অলিম্পিক রেকর্ডটাই হলো। ৯.৫৮ সেকেন্ডের বিশ্ব রেকর্ডটাও বোল্টেরই। ১০০ মিটারে ইতিহাসের দ্রুততম তিনটি টাইমিংই এখন তার। সর্বকালের সেরা স্প্রিন্টার হিসেবে তো নাম লেখাই হয়ে গেছে। কিংবদন্তি বললে সমস্যা কী! অলিম্পিকে ১০০ মিটারের সোনা ধরে রাখার কীর্তিতে একজন সঙ্গী আছেন। ক্রীড়াপ্রেমী ব্যক্তিবর্গ মনে করেন যে, বোল্ট পৃথিবীর সর্বকালের দ্রুততম মানব হিসেবে পরিচিত। তিনি ১০০ মিটার দৌড় ৯.৫৮ সেকেন্ডে এবং ২০০ মিটার দৌড় ১৯.১৯ সেকেন্ডে শেষ করেন। বোল্ট নিজের করা বিশ্বরেকর্ড ২০১০ সালে ভেঙে ফেলেন।
চীনের প্রথম নারী নভোচারী
১৬ জুন ২০১২, শনিবার, চীনের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের গোবি মরুভূমিতে অবস্থিত জিনকুয়ান উেক্ষপণ কেন্দ্র থেকে মহাকাশের উদ্দেশে যাত্রা করেছিল লং মার্চ রকেট। আর সেই রকেট বয়ে নিয়ে যায় চীনের নভোযান শেনঝু-৯-কে। তাদের পরবর্তী স্টেশন কক্ষপথে ভেসে চলা আরেক নভোযান তিয়ানগং। এবারের শেনঝু-৯ নভোযানে ছিলেন তিনজন তায়কোনাট। চীনা ভাষায় নভোযাত্রীদের ডাকা হয় তায়কোনাট নামে। তারা হলেন জিং হাইপেং, লিউ ওয়াং এবং লিউ ইয়াং। এই অভিযানের সবচেয়ে বড় এবং চমকপ্রদ খবরটি হলো, এই অভিযানে প্রথমবারের মতো অংশ নিয়েছেন একজন নারী নভোচারী। চীনের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো নারী ‘তায়কোনাট’ মানে নভোচারী হলেন ‘লিউ ইয়াং’। চীনা এয়ারফোর্সের পাইলট লুই ইয়াং দেশটির প্রথম নারী নভোচারী হিসেবে একটি মহাকাশ অভিযানে যোগ দেন। চীনা বিমান বাহিনীর ৩৩ বছর বয়সী এই পাইলট চীনের মহাকাশ অভিযাত্রার ইতিহাসে চিরদিনের জন্য নাম লেখালেন। এখানে উল্লেখ্য যে, এই নিয়ে আটটি দেশের অন্তত অর্ধশত নারী মহাশূন্য পরিভ্রমণ করেছেন। তবে নিজস্ব প্রযুক্তি নিয়ে মহাশূন্যে নারী নভোযাত্রী পাঠিয়েছে এখন পর্যন্ত কেবল যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া। সম্প্রতি এই অভিযানের মাধ্যমে চীনও সেই কাতারে শামিল হলো। এই নিয়ে আরও তিনবার নভোচারী পাঠালো চীনা কর্তৃপক্ষ। তার মধ্যে বিগত ২০০৮ সালের ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কারণ প্রথমবারের মতো চীনা নভোচারী মহাশূন্যে হেঁটে বেড়ান। গত বছর নভেম্বরে প্রথমবারের মতো মহাশূন্যে নভোযানের সঙ্গে ডকিং করিয়ে আরও সাফল্য অর্জন করে চীন। আর এইবার নভোচারীদের সাহায্যেই তারা সেই কাজটি সফলভাবে করেন।
দ্বিতীয়বার জয় হলো ওবামার
আমেরিকায় সাধারণ ভোটারদের সরাসরি ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন না। বরং সাধারণ ভোটের ফলাফলের ভিত্তিতে প্রাপ্ত ইলেক্টোরাল কলেজের ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। কোনো রাজ্যে যে প্রার্থী সাধারণ ভোটে জয়ী হন, তিনিই সেই রাজ্যের সবক’টি ইলেক্টোরাল কলেজের ভোট পান। এ প্রক্রিয়ায় নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য একজন প্রার্থীকে কমপক্ষে ২৭০টি ইলেক্টোরাল কলেজ ভোট নিশ্চিত করতে হয়। ভোটের এই জটিল ধাঁধাটির সমাধান করে দ্বিতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে আমেরিকার জনগণকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন বারাক ওবামা। এটি ২০১২ সালের আলোচিত ঘটনাগুলোর মধ্যে অন্যতম। নিজের বিজয় নিশ্চিত হওয়ার পর শিকাগোতে এক জনসভায় ওবামা আশা প্রকাশ করে বলেছেন, ‘আমেরিকার জন্য শুভদিন আসছে। দেশের প্রতিটি মানুষ সেই শুভদিনের সব সুফল ভোগ করবেন। প্রত্যেকের জন্যই থাকবে সমান সুযোগ।’ এর আগে এক টুইটার বার্তায় নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে ওবামা বলেন, ‘এই জয় ভাগ্যগুণে পাওয়া নয়। এটি কোনো দুর্ঘটনাও নয়। আপনারা যারা আমাকে সমর্থন দিয়েছেন, তারাই এ জয় ছিনিয়ে এনেছেন।’ সমর্থকদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ব্যক্ত করে ওবামা আরও বলেন, এই জনসমর্থনের প্রতি সম্মান রেখে তিনি আরও চার বছর দেশের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাবেন। ওহাইও, পেনিসেলভানিয়া, উইসকনসিন, আইওয়া এবং নিউ হ্যাম্পশায়ারের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যগুলোতে জয়ী হওয়ায় ওবামার বিজয় নিশ্চিত হয়ে যায়। এদিকে, নির্বাচনে পরাজয় স্বীকার করে নিয়ে ওবামাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন মিট রমনি। ওবামার নিশ্চিত বিজয়ের খবর পাওয়ার পর স্ত্রী অ্যান ও রানিং মেট পল রায়ানকে সঙ্গে নিয়ে বোস্টনে নিজের নির্বাচনী দপ্তরে উপস্থিত হন তিনি। সেখানে সমর্থকদের উদ্দেশে রমনি বলেন, ‘আমি এইমাত্র প্রেসিডেন্ট ওবামাকে টেলিফোন করে অভিনন্দন জানিয়েছি।’ তিনি বলেন, আগামী চার বছর প্রেসিডেন্ট ওবামা আমেরিকানদের সঠিক পথেই নিয়ে যাবেন বলে বিশ্বাস করেন তিনি।
হারিকেন স্যান্ডি
যুক্তরাষ্ট্রে বিগত ১০০ বছরের মধ্যে স্যান্ডি সবচেয়ে বেশি শক্তি নিয়ে তাণ্ডব চালিয়েছে। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণে নিউ ইয়র্ক রাজ্যকে বিপর্যস্ত এলাকা ঘোষণা করেছেন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। হারিকেন স্যান্ডি হচ্ছে প্রলয়ঙ্করী গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড় যা আটলান্টিক মহাসাগর থেকে ২০১২ সালের অক্টোবরের শেষ দিকে সৃষ্ট হয়। এ ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে ইতোমধ্যেই জ্যামাইকা, বাহামা, হাইতি, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা প্রমূখ দেশসমূহে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি, জলোচ্ছ্বাস, ব্যাপক বৃষ্টিপাত, নিম্নাঞ্চল তলিয়ে যাওয়া, বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে যাওয়াসহ আরও ক্ষতি সাধন হয়। ২২ অক্টোবর ক্যারিবীয় সাগরের পশ্চিমে মৌসুমী ঝড় হিসেবে হারিকেন স্যান্ডির সৃষ্টি হয়। পরবর্তী মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে এটি খুব দ্রুত শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং ছয় ঘণ্টার ব্যবধানে মৌসুমী ঘূর্ণিঝড়ে রূপান্তরিত হয়। গ্রেটার এন্টিলেজের উত্তর দিক দিয়ে এটি ধীরে ধীরে অগ্রসর হয় ও কার্যত স্থির ছিল। জ্যামাইকায় আঘাত হানার পূর্বে ২৪ অক্টোবর স্যান্ডি তার রূপ পরিবর্তন করে হারিকেনের আকার ধারণ করে। উত্তরদিকে অগ্রসর হওয়ার পথে স্যান্ডি পুনরায় নদীতে প্রবেশ করে ও ২৫ অক্টোবর ভোরে কিউবায় দ্বিতীয়বারের মতো প্রবেশ করে। তখন এটি ক্যাটাগরি ২ হারিকেনে রূপান্তরিত হয়। ওইদিনই সন্ধ্যার দিকে এটি দুর্বল হয়ে পড়ে ও ক্যাটাগরি ১ শক্তিমানের হয়। ২৬ অক্টোবরের প্রথম প্রহরে উত্তর অভিমুখে রওয়ানা দিয়ে বাহামায় আছড়ে পড়ে। কার্যত ২৭ অক্টোবর ভোরে এটি দুর্বল হয়ে মৌসুমী ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয় কিন্তু সকালের পর স্যান্ডি পুনরায় শক্তিশালীরূপে ক্যাটাগরি ১ হারিকেনে পরিণত হয়। ইডিটি সময় অনুযায়ী ২৯ অক্টোবর সকাল ঠিক আটটার পূর্বে স্যান্ডি উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমের অভিমুখী হয় এবং পূর্বে ধারণাকৃত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপকূলে আঘাত হানে। ওইদিনই সন্ধ্যায় স্যান্ডিকে মৌসুমী ঘূর্ণিঝড়ের মেয়াদ শেষ হয়েছে বলে ঘোষণা করা হয় যদিও এটি তখনও ক্যাটাগরি ১ মাত্রার শক্তিশালী ছিল। ২৯ অক্টোবর রাত আটটায় নিউ জার্সির আটলান্টিক সিটির দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে ঘণ্টায় ৫ মাইল (৮ কিমি) বেগে অগ্রসর হয়ে চূড়ান্ত আঘাত হানে।
মঙ্গলে কৌতূহল
মহাকাশ গবেষণায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে গবেষণা সংস্থা নাসার বিশেষ যান ‘কিউরিসিটি’। মঙ্গলের ভূ-পৃষ্ঠে কিউরিসিটির চাকা স্পর্শ করার সাথে সাথে পৃথিবীর মানুষ মহাকাশ গবেষণায় পৌঁছে গেল নতুন মাইলফলকে। ‘কিউরিসিটি রোভার’ যাকে বলা হয় মঙ্গলের সায়েন্স ল্যাবরেটরি এটির পিছনে নাসার প্রায় এক দশকের মতো পরিশ্রম এবং ২.৫ বিলিয়ন ডলারের উপরে ব্যয় হয়েছে। যদিও এটা বলা হচ্ছে মঙ্গল গ্রহের জন্য এটি সবচেয়ে অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরি যার তুলনা হয় শুধু এটির সাথেই। ‘কিউরিসিটি’ মঙ্গল গ্রহে অবতরণ সফলভাবে অবতরণ করে। ‘কিউরিসিটি’ প্রতি ঘণ্টায় ১৩০০০ মাইল বেগে চলে, ৮ মাসে ৩৫২ মিলিয়ন মাইল অতিক্রম করে মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে। আকারে পাজেরো জিপের সমান এই রোবোটিক ২ বছরের মতো সময় মঙ্গল গ্রহের ছবি, জিওলোজিক্যাল ও রাসায়নিক ডাটা সংগ্রহ করবে। মঙ্গলের ইকুয়েডরের কাছাকাছি দক্ষিণ গোলার্ধে একটি ক্রেটারে অবতরণ করেছে ‘কিউরিসিটি’। ‘কিউরিসিটি’ অবতরণের মুহূর্তে নিজের চাকা ও মঙ্গলের উপর নিজের ছায়ার ছবি পাঠাতে সক্ষম হয়েছে। ‘কিউরিসিটি’ মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলে পৌঁছে নিজের ‘শেল’ থেকে বেরিয়ে আসে ও একটি প্যারাসুটে ভর করে মঙ্গলের বুকে অবতরণ করে। অবতরণের সময় ‘কিউরিসিটি’ ৭ মিনিট মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলে ছিল। এ সময়টা ছিল খুবই ঝুঁকিপূর্ণ, কোনো ধরনের অ্যাকসিডেন্ট ঘটলে পুরো মিশনের উদ্দেশ্য ব্যাহত হতো। ‘কিউরিসিটি’র পাঠানো ডাটা অনেক সায়েন্টিফিক রিসার্চে ব্যবহার হবে। তন্মধ্যে, ‘কিউরিসিটি’ মঙ্গলে কোনো সময় কোনো ধরনের ‘প্রাণের’ অস্তিত্ব ছিল কি না, বা বর্তমানে কোনো প্রকারের ‘প্রাণ’ আছে কি না তাও দেখবে। পৃথিবীতে ‘প্রাণের’ সৃষ্টি হয়েছিল, নাকি অন্য কোনো গ্রহ থেকে ‘প্রাণ’ এখানে এসেছিল তা বুঝার জন্য ‘কিউরিসিটি’র পাঠানো ডাটা ব্যবহার করা হবে।
সিরিয়া বিপর্যয়
সমাধান নয়, যুদ্ধের পথ বেছে নিয়েছে সিরিয়ার সরকার ও বিদ্রোহীরা। জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণ মিশনের সমাপ্তি ঘোষণার সময় সিরিয়া প্রসঙ্গে এমন মন্তব্য করেন শান্তিরক্ষা মিশনের প্রধান অ্যাডমন্ড মুলেট। জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণ মিশনের চার মাসের কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। সিরিয়া এশিয়ার মধ্যপ্রাচ্যের একটি রাষ্ট্র। এর সরকারি নাম আরব প্রজাতন্ত্রী সিরিয়া। ২০১২ সালটি সিরিয়াবাসীদের জন্য খুব সুখকর ছিল না। পরিস্থিতি খুব খারাপের দিকে যায়। সিরিয়া বিষয়ে যখন সমগ্র পাশ্চত্য এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাদের উত্কণ্ঠার কথা জাতিসংঘকে জানাচ্ছে এবং জাতিসংঘও সিরিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন ঠিক তখনই ইরানের চিন্তা-ভাবনা আলাদা। ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্র বিষয়ক সংসদীয় কমিটির প্রধান আলাউদ্দিন বুরুজারদি এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, সিরিয়া পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হয়েছে এবং ক্রমেই তা আরও উন্নতির দিকে যাচ্ছে। সিরিয়ার হামা ও দেইর আজ-জোরসহ কয়েকটি শহরে সেনাবাহিনীর হাতে বহুসংখ্যক সশস্ত্র বিদ্রোহী নিহত হওয়ার পর তিনি এ মন্তব্য করেন। অ্যাডমন্ড মুলেট বলেন, জাতিসংঘের মিশনের পর্যবেক্ষকরা সেখানে শান্তি স্থাপনের কোনো সম্ভাবনা দেখতে পাননি। সরকার ও বিদ্রোহীরা যে হারে সংঘাতের পথে এগোচ্ছে সেখানে সহিংসতা কমিয়ে আনার জন্য রাজনৈতিক আলোচনা ও মধ্যস্থতার সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। এর আগে সিরিয়া প্রসঙ্গে বৃহত্ শক্তিগুলোর পরস্পরবিরোধী অবস্থানের কারণে জাতিসংঘের শান্তি প্রচেষ্টা কোনো গতি পায়নি—এমন দাবি করে পদত্যাগ করেন কফি আনান। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদেও সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের ভবিষ্যত্ প্রশ্নে পশ্চিমা শক্তিগুলো ও রাশিয়া পরস্পরবিরোধী অবস্থান নিয়ে আছে।
গণ ধর্ষণকে কেন্দ্র করে উত্তাল ভারত
চলন্ত বাসে ডেন্টাল কলেজ ছাত্রী গণধর্ষিত হওয়া ও তার মৃত্যুর ঘটনায় প্রতিবাদ বিক্ষোভে রাজধানী নয়াদিল্লিসহ সারা ভারত এখন উত্তাল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তা কোনোমতেই নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না ধর্ষকদের চরম শাস্তির দাবিতে ফুঁসে ওঠা আপামর জনতাকে। রাজধানী দিল্লিতে বাসে গণধর্ষণের পর ভারতজুড়ে তোলপাড় চলছে। ধর্ষকদের প্রতি গণঘৃণায় দেশে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ভারত যে বৃহত্তম গণতন্ত্রের দেশ; তা এই ঘৃণা ও প্রতিবাদের বিস্ফোরক পরিস্থিতিতে অনুধাবন করা যাচ্ছে। মানুষের তীব্রতম প্রতিবাদের মুখে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন। তিনি আবেগাপ্লুত ভাষায় বলেছেন—তিনিও তিন কন্যার পিতা। জনগণকে সংযত থাকার আবেদন জানান তিনি। ওদিকে দুর্ধর্ষ অপরাধীদের আখড়া তিহার জেলে ধর্ষক রামসিংকে নেওয়া হলে সেখানে কয়েদিরাও তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করেন। তারা গণধোলই দিয়ে তাদের ঘৃণার প্রকাশ করেন। স্বাধীন চলাচল মানুষ মাত্রের মৌলিক অধিকার। তা তিনি নারী বা পুরুষ যাই হোন না কেন। রাজধানী দিল্লিতে সেই অধিকারের স্বীকৃতি আছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সেই অধিকার বাস্তবায়নে ব্যত্যয় ঘটেছে। রাষ্ট্রকে তাই এই মৌলিক সমস্যার দিকে তাকাতে হবে। বিক্ষোভ প্রশমনে এরই মধ্যে দিল্লিকে নারীদের জন্য নিরাপদ রাজ্য হিসেবে তৈরি করতে সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে নৈশপুলিশ, বাসের চালক ও তার সহযোগীকে তল্লাশি এবং বাসে টিনের জানালা ও পর্দা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এ ছাড়া ১৬ ডিসেম্বর রাতের ওই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে দুই পুলিশ সদস্যকে বরখাস্ত করা হয়েছে। সরকার ধর্ষণকারীদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের প্রতিশ্রুতি দিলেও বিক্ষোভকারীরা অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মৃত্যুদণ্ড দাবি করছেন। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিসহ বিভিন্ন শহরে দিন দিন নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনা বেড়েই চলেছে। ইভটিজিং ও ধর্ষণের ক্রমবর্ধমান ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে অনেকে দিল্লিকে ‘ধর্ষণের নগরী’ পর্যন্ত বলে থাকেন।
বিলাওয়াল ভূট্টো
পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে আসছেন। তার মা বেনজির ভুট্টোর পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী পালনের মধ্য দিয়ে তিনি রাজনীতির মাঠে পা রেখেছেন। প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারির ঘনিষ্ঠ সূত্র হতে জানা যায়, সিন্ধু প্রদেশের নাওদেরার কাছে গারহি খোদা বক্সে অনুষ্ঠিত বৈঠকের মাধ্যমে বিলাওয়ালের সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ। এ ছাড়া বিলাওয়াল আগামী বছরের সাধারণ নির্বাচনে পিপিপির প্রচারণায় অংশ নেবেন। এ বৈঠকে বিলাওয়াল ও তার বাবা আসিফ আলী জারদারি বক্তব্য দেন। ধারণা করা হচ্ছে, এ অনুষ্ঠানে জারদারি আগামী সাধারণ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা। তবে সূত্র জানায়, এ ব্যাপারে এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। জাতীয় পরিষদ বা পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের পাঁচ বছর পূর্ণ হবে আগামী মার্চে। পিপিপির নেতারা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, আগামী এপ্রিল বা মে মাসে সাধারণ নির্বাচন হতে পারে। একই সঙ্গে চারটি প্রাদেশিক পরিষদেও নির্বাচন হবে। বেনজির ভুট্টোর হত্যাকাণ্ডের পাঁচ বছর পূর্তির দিনে দক্ষিণাঞ্চলীয় সিন্ধ প্রদেশে এক জনসভায় ২৪ বছর বয়সী বিলাওয়াল ভুট্টো আবেগময় এক ভাষণে তার রাজনৈতিক ধ্যানধারণা তুলে ধরেছেন। বিলওয়াল ভুট্টো-জারদারি ২০০৭ সালে পিপিপি’র চেয়ারম্যান নিযুক্ত হওয়ার পর এতদিন প্রকাশ্য রাজনীতি থেকে নিজেকে বিরত রেখেছিলেন। তার প্রধান কারণ অল্প বয়স এবং ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ডে পড়াশোনা শেষ করছিলেন তিনি। মায়ের পঞ্চম মৃত্যু বার্ষিকীতে পাকিস্তানের রাজনীতিতে সরব অভিষেক হয়েছে জুলফিকার ভুট্টোর নাতি এবং বেনজির ভুট্টো বর্তমান প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারির ছেলে বিলওয়াল ভুট্টোর।
প্রণব মুখার্জি
ভারতের স্বাধীনতার ৬৫ বছর পরে প্রথম বাঙালি রূপে রাইসিনা হিলসের বাসভবনে আগামী পাঁচ বছরের জন্য নিজেকে নিশ্চিত করলেন প্রণব মুখার্জি। এনডিএ প্রার্থী লোকসভার সাবেক স্পিকার মেঘালয়ের ভূমিপুত্র পিএন সাংমাকে ৭১ শতাংশের বেশি ভোটে হারিয়ে ভারতের রাষ্ট্রপতি পদে ইউপিএ প্রার্থী প্রণব মুখার্জি নির্বাচিত হলেন। ২৫ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন তিনি। আশ্চর্যজনকভাবে তিনি শুধু ইউপিএ বা বামদলগুলোর নয় কর্নাটক ও গুজরাটের ১৪ জন বিজেপি বিধায়কের ভোট পেয়েছেন। ক্ষমতাসীন কংগ্রেস দলের প্রভাবশালী নেতা ছিলেন তিনি। তার এই দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে এর আগে তিনি ভারতের অর্থ, পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিমণ্ডলেও তার সুখ্যাতি রয়েছে। ২০০৮ সালের ১০ অক্টোবর প্রণব মুখার্জি ও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কন্ডোলিসা রাইস সেকশন ১২৩ চুক্তি সই করেন। তিনি আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডার, বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও আফ্রিকান উন্নয়ন ব্যাংকের বোর্ড অব গভর্নরসের সদস্য। প্রণব মুখার্জির রাজনৈতিক কর্মজীবন অত্যন্ত বর্ণময়। প্রায় পাঁচ দশক ভারতীয় সংসদের সদস্য তিনি। ১৯৬৯ সালে কংগ্রেসের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি প্রথমবারের মতো রাজ্যসভার সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৭৫, ১৯৮১, ১৯৯৩ ও ১৯৯৯ সালে রাজ্যসভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৩ সালে কেন্দ্রীয় শিল্প উন্নয়ন উপমন্ত্রী হিসেবে প্রথম ক্যাবিনেটে যোগদান করেন। ক্যাবিনেটে ক্রমান্বয়ে পদোন্নতির পর ১৯৮২ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত তিনি ভারতের অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। রাজনৈতিক জীবনে তিনি ভারতের পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা, যোগাযোগ, রাজস্ব ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনের বিরল কৃতিত্বের অধিকারী।
আমেরিকায় বন্দুকধারী ট্র্যাজেডি
আমেরিকার কানেক্টিকাট অঙ্গরাজ্যের একটি প্রাইমারি স্কুলে গোলাগুলির ঘটনায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ ২৭ জন নিহত হয়েছে। এতে আহত হয়েছে ১৪ জন। বন্দুকধারী এক ব্যক্তির গুলিতে এ হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। নিহতদের মধ্যে স্কুলের প্রিন্সিপাল এবং মনোবিদ রয়েছেন। কানেক্টিকাটের স্যান্ডি হুক এলিমেন্টারি স্কুলে এ ট্র্যাজেডি ঘটেছে। আমেরিকার আরও কয়েকটি স্কুলে এ ধরনের গুলির ঘটনায় বহু শিক্ষক-শিক্ষার্থী হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। ধারণা করা হচ্ছে, একই ধরনের ২০০৭ সালে ভার্জিনিয়া টেকের ঘটনায় ৩২ জনের মৃত্যুর পর এটিই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রাণহানির ঘটনা। রাজ্যের গভর্নর ড্যানিয়েল ম্যালো দুর্ঘটনার শিকার পরিবারের সাথে বৈঠক করছেন বলে জানিয়েছেন তার এক মুখপাত্র। ঘটনার সময় বিদ্যালয়ে একটি অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি চলছিল। হামলায় নিহতদের মধ্যে হামলাকারী ও তার মাও রয়েছে। বুরেটপ্রুফ জ্যাকেট পরে প্রায় একশ রাউন্ড গুলি ছোড়ে ওই বন্দুকধারী। হামলাকারীর মৃতদেহ স্কুলের ভেতরে পাওয়া গেছে। মূলত লানজারের লক্ষ্য ছিল তার মা এবং ওই ক্লাসরুম। গুলিবিদ্ধ হয়ে ১৮ শিশু ঘটনাস্থলেই মারা যায় এবং দু’জনকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যায়। ২০ বছর বয়সী হামলাকারীর নাম রায়ান লানজা। অ্যাডামের মা ওই স্কুলেরই শিক্ষক। মাকে হত্যার পর অ্যাডাম আত্মহত্যা করেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। মার্কিন ইতিহাসে স্কুলে গোলাগুলির ঘটনায় একে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি বলে মনে করা হচ্ছে।
