নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনে নির্বাচন কমিশনের আবেদনে তেমন সাড়া পাওয়া যায়নি। নিবন্ধন আবেদনের আর মাত্র একদিন বাকি থাকলেও এ পর্যন্ত ১টি পুরনোসহ মাত্র ৬টি রাজনৈতিক দল আবেদন করেছে। এর মধ্যে গতকাল বিকালেই তড়িঘড়ি করে ৩টি দল আবেদন করে। আবার যে ৬টি নতুন দল নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে যোগাযোগ করেছে তাদের মধ্যে একটি ‘এখনও গুছিয়ে উঠতে পারিনি’ বলে সময় বাড়ানোর আবেদন জানিয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশন (ইসি) আবেদনের সময় বাড়ানোর কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেনি।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মোঃ শাহ নেওয়াজ ‘ইত্তেফাক’কে বলেন, আগামী সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দল নিবন্ধনের জন্য আজ সোমবার পর্যন্ত আবেদনের সময় নির্ধারণ করে দেয়া হয়। সময় বাড়ানোর বিষয়ে এখনো পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। যারা আবেদন করেছে যাচাই-বাছাই করে তাদের নিবন্ধন দেয়া হবে।
প্রায় ৪ বছর পর গত ২৩ অক্টোবর নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের জন্য গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে নির্বাচন কমিশন। দশম সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে ইচ্ছুক নতুন দলগুলোকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নিবন্ধনের আবেদনের সুযোগ দেয়া হয়। মূলত নির্বাচনের আগ মুহূর্তে হঠাত্ নতুন রাজনৈতিক দল গজিয়ে ওঠা বন্ধ করতে আগেভাগেই এই সিদ্ধান্ত নেয় ইসি। কিন্তু গতকাল রবিবার পর্যন্ত একটি পুরনোসহ ৬টি রাজনৈতিক দল আবেদন করে। দলগুলো হলোঃ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ভাসানী), বাংলাদেশ নিউ সংসদ লীগ, বাংলাদেশ পিপল ডেমোক্রেটিক পার্টি, গণ অধিকার পার্টি, জাতীয় লীগ। আর বাংলাদেশ নিউ জেনারেশন পার্টি নামের একটি দল নির্বাচন কমিশনের কাছে এই আবেদন করেছে যে, তারা নতুন এই দল গঠন করার পর এখনও সবকিছু গুছিয়ে উঠতে পারেননি। এজন্য দলের আহ্বায়ক জাহিদ ইকবাল তার আবেদনে ৩১ মে পর্যন্ত সময় বাড়ানোর অনুরোধ করেছেন।
ইসির সিনিয়র সহকারী সচিব মেজবাহউদ্দিন আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, এ পর্যন্ত ৬টি দল নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছে। রবিবারই ৩টি দল আবেদন করে। আশা করা হচ্ছে আজ শেষদিনে বেশিরভাগ দলই আবেদন করবে।
সম্প্রতি প্রধান বিরোধী দল বিএনপির নেতৃত্বে যে ১৮ দলীয় জোট গঠন হয়েছে তার মধ্যে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত নয় এমন দলগুলোর মধ্যে শুধু ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ভাসানী)-এর পক্ষ থেকে আবেদন করা হয়। দলের মহাসচিব হাসরত খান ভাসানী জানান, নতুন দল হিসাবে নয়, বাংলাদেশের সংসদ নির্বাচনে অতীতে অংশগ্রহণকারী দল হিসাবেই তারা নিবন্ধনের আবেদন জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ নিউ সংসদ লীগ-এর সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট নজরুল ইসলাম জানান, তিনি একসময় কুষ্টিয়াতে জাতীয় পার্টির নেতৃত্বে ছিলেন। দলের সভাপতি শাহীনুল ইসলাম নায়েমের বাড়ি ভেড়ামারায়।
বাংলাদেশ পিপল ডেমোক্রেটিক পার্টি’র নারী বিষয়ক সম্পাদক ঝর্ণা আক্তার বলেন, আমাদের দলের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মোঃ জালাল উদ্দিন। আমরা একসময় জাতীয় পার্টিতে ছিলাম। সম্প্রতি নতুন দল গঠন করে নিবন্ধনের শর্ত অনুযায়ী সবকিছুই করা হয়েছে। ঝর্ণা আক্তার আরো বলেন, দল নিবন্ধনে ২০০৮ সালের চেয়ে এবারে শর্ত পূরণ অনেক কঠিন। আগে কেন্দ্রীয় অফিসসহ কমপক্ষে ১০টি জেলা এবং ৫০টি উপজেলাতে দলের অফিস ও কমিটি থাকার শর্ত দেয়া হয়েছিল। পরে আইন সংশোধন করে কেন্দ্রসহ কমপক্ষে ২১ জেলায় ও ১০০ উপজেলা বা থানাতে দলের কার্যকর অফিস এবং প্রতি উপজেলা বা থানাতে কমপক্ষে ২০০ ভোটার সদস্য থাকার শর্ত দেয়া হয়েছে। নতুন দলের নেতারা জানিয়েছেন, শর্ত কঠিন হওয়ার কারণে অনেক নতুন দল আবেদনের সুযোগ পায়নি। এবার কঠিন শর্ত দেয়া হয়েছে। শর্ত শিথিলের জন্য আদালতের শরণাপন্ন হয়েছে তারা।
শর্ত শিথিলে আদালতে দু’টি রিট
রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের জন্যে কতিপয় শর্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে পৃথক দুটি রিট আবেদন দায়ের করা হয়। হাইকোর্ট গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশের সংশ্লিষ্ট বিধানগুলো কেন সংবিধান বহির্ভূত ও অবৈধ ঘোষণা করা হবে না এই মর্মে রুল জারি করে। বিএনপির বহিষ্কৃৃত নেতা ব্যারিস্টার নাজমুল হুদাসহ সাতজন এবং ডেমোক্রেটিক লীগের সাধারণ সম্পাদক সফিউদ্দিন আহমেদ মনি পৃথক এ রিট আবেদন করেন। রিট আবেদনে বলা হয়, নির্বাচন কমিশন গত ২৩ অক্টোবর রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন আহ্বান সংক্রান্ত একটি গণবিজ্ঞপ্তি দেয়। এতে কমিশনের নিবন্ধন পেতে আগ্রহী রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য কিছু শর্ত দেয়া হয়। যার মধ্যে রয়েছে, স্বাধীনতার পর যেকোন একটি নির্বাচনে দলীয় প্রতীকে একজন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া বা অংশগ্রহণকৃত নির্বাচনে মোট ভোটারের ৫ শতাংশ ভোট পাওয়ার প্রামাণিক দলিল আবেদনের সঙ্গে জমা দিতে বলা হয়। এই দুটি শর্ত পূরণ না করতে পারলে দলের সাংগঠনিক অবস্থা সম্পর্কিত শর্ত দেয়া হয়। এতে বলা হয়, দলের কেন্দ্রীয় কমিটিসহ একটি সক্রিয় কেন্দ্রীয় দপ্তর; অন্যূন এক-তৃতীয়াংশ প্রশাসনিক জেলায় কার্যকর জেলা দপ্তর এবং অন্যূন একশতটি উপজেলা বা ক্ষেত্রমতে মেট্রোপলিটন থানায় কার্যকর দপ্তর এবং প্রতি উপজেলায় বা ক্ষেত্রমতে থানায় অন্যূন দুইশ ভোটার সদস্য হিসাবে দলের তালিকাভুক্ত থাকার সমর্থনে প্রামাণিক দলিল। এই শর্ত পূরণ করে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে আবেদন জমা দিতে বলা হয়। শুনানি শেষে হাইকোর্ট আইন সচিব, প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সচিবকে তিন সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে নির্দেশ দেন।
উল্লেখ্য, নবম সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করেছিল নির্বাচন কমিশন। ওই সময় ১১৭টি দল আবেদন করে এবং পরে খসড়া গঠনতন্ত্র জমা দিয়ে ৩৯টি দল নিবন্ধিত হয়। সংশোধিত গঠনতন্ত্র জমা না দেয়ায় ফ্রীডম পার্টির নিবন্ধন বাতিল করে কমিশন। গণপ্রতিনিধিত্ব (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০০৮ এর বিধান অনুযায়ী বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ৩৮টি। আইন অনুযায়ী নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনীত কিংবা স্বতন্ত্র প্রার্থী ছাড়া অন্য কেউ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবে না।
