হার্ডিঞ্জ ব্রিজের শতবর্ষ

আপডেট : ৩১ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:৫৪
চলতি বছর নির্মাণের ১০০ বছর পূর্ণ করলো হার্ডিঞ্জ ব্রিজ। ১৯১২ সালে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় পদ্মা নদীর উপর এই আকর্ষণীয় ইস্পাত রেলসেতুটি নির্মাণ শুরু করে তত্কালীন ব্রিটিশ সরকার। সেই সময়কার ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জের নামে ব্রিজটির নামকরণ করা হয়। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, তত্কালীন ব্রিটিশ সরকার ব্রিজটি নির্মাণের পর ১০০ বছরের গ্যারান্টি দিয়ে বলেছিল, এ সময়ের মধ্যে এর কোন প্রকার পরিবর্তন ঘটবে না। বাস্তবে তেমন কোন পরিবর্তন আসলেই ঘটেনি। তবে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বোমাবর্ষণে ব্রিজটির একটি গার্ডার (ইস্পাতের বিম) ধসে পড়ে। পরে সেটি মেরামত করা হলেও বর্তমানে কিছুটা দেবে যাওয়ায় সেতু দিয়ে ধীরগতিতে ট্রেন চালাতে হয়। এ কারণে এবং গ্যারান্টির সময়কাল পার হওয়ায় অবিলম্বে সেতুটি সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী ও রেল বিভাগের লোকজন। ইতিহাস ঘেটে জানা গেছে, ১৮৮৯ সালে ব্রিটিশ সরকার ভারত উপমহাদেশে রেল যোগাযোগের ব্যাপকতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে পদ্মা নদীর ওপর রেলসেতু নির্মাণের পরিকল্পনা করে। বিশেষ করে ভারতের দার্জিলিং ও পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামে যাতায়াতের সুবিধার্থে কুষ্টিয়া ও পাবনা জেলার মাঝখানে পদ্মা নদীর ওপর ব্রিজটি নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু করে। তত্কালীন ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ের প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে ১৯০৮ সালে ব্রিজটি নির্মাণের জন্য তত্কালীন ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ার রবার্ট উইলিয়াম গেইলসকে ইঞ্জিনিয়ার ইনচিফ, ব্রিজের মূল নকশা প্রণয়নের জন্য স্যার এস এম বেনডেলেগকে ও প্রকল্প প্রণয়নের জন্য স্যার ফ্রান্সিস সিপ্রং এবং ঠিকাদার হিসাবে ব্রেইথ ওয়াইট এন্ড কার্ককে দায়িত্ব দেয়া হয়। ১৯১০ সালে ব্রিজের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। কূপ খনন শেষে বসানো হয় ১৬টি স্প্যান; যার প্রতিটি ‘বিয়ারিং টু বিয়ারিং’ এর দৈর্ঘ্য ৩শ’ ৪৫ ফুট এবং উচ্চতা ৫২ ফুট। প্রতিটি স্প্যানের ওজন ১ হাজার ২৫০ টন। ব্রিজটির মোট দৈর্ঘ্য ১.৮ কিলোমিটার। ব্রিজটি নির্মাণে ৩০ লাখ টন ইস্পাত, ২ লাখ ৯৯ হাজার টন ইট এবং ১ লাখ ৭০ হাজার ড্রাম সিমেন্ট লেগেছে। ব্রিজের ১ হাজার গজ ভাটি থেকে ৬ কিলোমিটার উজান পর্যন্ত ১৬ কোটি ঘন ফুট মাটি ও ২ কোটি ৩৩ লাখ ৭০ হাজার ঘনফুট পাথর ব্যবহার করে গাইড বাঁধ নির্মাণ করা হয়। প্রায় ৩ কিলোমিটার প্রস্থ নদীর দু’পাশে বাঁধ দিয়ে ১ দশমিক ৮১ কিলোমিটার এলাকা সংকুচিত করা হয়। ২৪ হাজার শ্রমিকের অক্লান্ত পরিশ্রমের পর ১৯১৪ সালে এর নির্মাণ কাজ শেষ হয়। ১৯১৫ সালের ১ জানুয়ারি পরীক্ষামূলক ডাউন লাইন দিয়ে প্রথম মালগাড়ি (ট্রেন) চালানো হয়। একই বছরের ৪ মার্চ ডাবল লাইন দিয়ে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল শুরু করে। তখনকার সময় ব্রিজটি তৈরিতে মোট ব্যয় হয় ৩ কোটি ৫১ লাখ ৩২ হাজার ১শ’ ৬৪ টাকা। বর্তমানে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের চেয়েও লম্বা সেতু অনেক আছে। কিন্তু কিছু কিছু কারণে এ ব্রিজটি বিখ্যাত। এর একটি কারণ হচ্ছে, এ ব্রিজের গভীরতম ভিত; পানির প্রায় ১৬০ ফুট নিচে। সেই সময় এটাই ছিল সবচেয়ে গভীরতম ভিত্তি। ব্রিজটি আর্কষণীয় হওয়ায় ইঞ্জিনিয়ার রবার্ট উইলিয়াম গেইলস’কে সাফল্যের পুরস্কারস্বরূপ ‘স্যার’ উপাধিতে ভূষিত করে ব্রিটিশ সরকার।