আজ মঙ্গলবার শুরু হওয়া নতুন বছরটি হবে রাজনীতির। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন পাঁচ বছর মেয়াদি মহাজোট সরকারের এটিই শেষ বছর। বর্তমান সংবিধান অনুসারে এ বছরই দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সম্ভাবনা রয়েছে বেশি। কারণ সংবিধান অনুসারে মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্বেকার ৯০ দিনের মধ্যে সংসদ নির্বাচন করার বিধান রয়েছে। বর্তমান জাতীয় সংসদের মেয়াদ শেষ হবে ২০১৪ সালের ২৪ জানুয়ারি।
প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নির্দলীয়-নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন করছে। এ দাবিতে বছর জুড়ে তারা নানা কর্মসূচি দেয়ার পরিকল্পনা করছে। কিন্তু বর্তমান সংবিধান অনুসারে নির্বাচন হতে হবে বর্তমান সরকারের অধীনে। সংবিধান নতুন করে সংশোধন ছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করার কোন সুযোগ নেই। বর্তমান সরকার সংবিধান সংশোধন করে নির্দলীয়-নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করেছে।
আর এসব কারণে শুরু থেকেই ২০১৩ সালটি হবে রাজনীতির কৌশলের। সরকারি ও বিরোধী দল দুই পক্ষই তাদের রাজনীতির পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামবে। রাজনীতির এ খেলায় যারা সামনে এগুতে পারবে নির্বাচনের সুফলও তাদের ঘরেই বেশি উঠবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলী খানের মতে, রাজনীতির এ খেলাটা দুই পক্ষেরই খুবই সতর্কতার সাথে দেখতে হবে। যে কোন মূল্যে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার কাজকে এগিয়ে নিতে হবে। আর এজন্য সবার আগে প্রয়োজন হবে সব দলের অংশগ্রহণে একটি সুষুম ও অবাধ নির্বাচন সম্পন্ন করা। এ জন্য এখনই দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা শুরু করা প্রয়োজন। যাতে রাজনীতি নিয়ে, নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা না বাড়ে। তৃতীয় কোন পক্ষ যাতে কোন ধরনের সুযোগ না পায়।
রাজনীতি নিয়ে এ ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যেও বছরের শুরুতেই সুসংবাদ হলো, নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে সংলাপের প্রাথমিক প্রস্তাবনা শুরু হয়েছে। সরকারি দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম গতকাল সোমবার বলেছেন, বিএনপি’র সাড়া পেলে আগামী নির্বাচন নিয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে চায় আওয়ামী লীগ। তিনি বলেন, রাজনৈতিক যে কোন সমস্যা সমাধানের একমাত্র পথ হলো আলোচনা-সংলাপ। যত তাড়াতাড়ি এ আলোচনা শুরু হবে ততই গণতন্ত্রের জন্য মঙ্গল।
সংবিধান সংশোধন করে নির্বাচনের সময় নির্ধারণ করা গেলেও সেই নির্বাচনকালীন সময়ে কোন সরকার ক্ষমতায় থাকবে তা এখনও অমিমাংসিত রয়ে গেছে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে। নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে দুই প্রধান জোটের মধ্যে মতবিরোধ কাটেনি। বিএনপি এখন নির্দলীয়-নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলনে রয়েছে। নতুন বছরের প্রথম মাসেই এ দাবিতে তারা চূড়ান্ত আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করবে বলে জানা গেছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া কোন দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণা স্পষ্টতই জানিয়ে দিয়েছেন বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া।
অন্যদিকে সরকারি দল আওয়ামী লীগ নির্দলীয়-নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা আর চালু করতে চায় না। আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের বিরুদ্ধে নীতিগতভাবে অবস্থান নিয়েছেন। তিনি স্পষ্টতই বলেছেন, বর্তমান সংবিধান অনুযায়ীই আগামী নির্বাচন হবে। তার অর্থ নির্দলীয়-নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মানতে রাজি নন তিনি।
এ পরিস্থিতিতে এক জটিল রাজনৈতিক অবস্থার মধ্য দিয়ে চলবে ২০১৩ সালটি। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে মতৈক্য না হলে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অনিশ্চয়তার বছর হয়ে উঠতে পারে ২০১৩ সাল।
বর্তমান সংবিধান অনুসারে ২৫ অক্টোবরের পর নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করতে হবে। নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে প্রধান দুটি রাজনৈতিক জোটের মধ্যে মতৈক্য ছাড়া নির্বাচনী তফসিল দিয়ে কাজ করা নির্বাচন কমিশনের জন্য এক দুরূহ ব্যাপার হয়ে উঠবে। ইতিমধ্যে নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ করা নিয়ে নির্বাচন কমিশন এক বিশাল অগ্নীপরীক্ষায় পড়েছে। কারণ আওয়ামী লীগ চায়, আগের সীমানাতেই নির্বাচন হোক। আর বিএনপি বলেছে, পুরনো ওই সীমানায় তারা নির্বাচনে অংশ নেবে না।
সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. এটি এম শামসুল হুদা এ ব্যাপারে ইত্তেফাককে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে মতৈক্য ছাড়া নির্বাচন কমিশন জাতীয় সংসদ নির্বাচন করা কঠিন কাজ হবে। আর নির্বাচনকালীন সরকার ঠিক করার কাজটি নির্বাচন কমিশন করতে পারবে না। এটি সরকারকেই করতে হবে। নির্বাচন কমিশনকে বিতর্কে জড়ানো কারো জন্যই ঠিক হবে না।
আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ এ ব্যাপারে ইত্তেফাককে বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অতীত অভিজ্ঞতা এ দেশের মানুষের কাছে ভাল নয়। এখন অনেকের কাছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার মানে এক আতংকের নাম। তাই ওই ধরনের সরকার আর মানুষ চায় না। তবে নির্বাচন নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করতে সকলের মধ্যে ঐকমত্য জরুরি। এজন্য আলোচনা হতে পারে। দেশের মানুষ নৈরাজ্য, সংঘাত চায় না, শান্তি চায়।
বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এ ব্যাপারে ইত্তেফাককে বলেন, নির্দলীয়-নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন জনগণের দাবি। কোন দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে মানুষ অংশ নেবে না। আর যেখানে সাধারণ মানুষের স্বার্থ নেই সে নির্বাচনে বিএনপি যেতে পারে না।
