রাজনৈতিক অঙ্গনের জাতীয় নেতৃবৃন্দ ও বিশিষ্টজনরা বলেছেন, রাজনীতিতে বর্তমানে গণতান্ত্রিক আচরণ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের খরা চলছে। রাজনীতিকে গ্রাস করেছে অদ্ভুত কৃষ্ণপক্ষ। এই কৃষ্ণপক্ষের কবল থেকে রাজনীতিকে মুক্ত করতে হবে। রাজনৈতিক সৌজন্যবোধ পুনঃরুদ্ধারও এখন খুব বেশি প্রয়োজন। ইংরেজি নতুন বছরের প্রথমার্ধেই যুদ্ধাপরাধের বিচারকাজ সম্পন্নের আশা ব্যক্ত করে তারা বলেছেন, শুধু আদালত ও প্রশাসনিকভাবে স্বাধীনতা বিরোধী চক্রকে মোকাবেলা করা সম্ভব হবে না। এজন্য দরকার সংগ্রাম। আর এই সংগ্রামের জন্য প্রয়োজন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল রাজনৈতিক শক্তি ও ব্যক্তির ঐক্য।
বর্ষীয়ান রাজনীতিক ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক মরহুম আব্দুর রাজ্জাকের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে গতকাল সোমবার রাজধানীর ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইইবি) মিলনায়তনে ‘আব্দুর রাজ্জাক স্মৃতি সংসদ’ আয়োজিত স্মরণসভায় তারা এই ঐক্যের আহ্বান জানান। উল্লেখ্য, ২০১১ সালের ২৩ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন আওয়ামী লীগের নেতা আব্দুর রাজ্জাক।
গতকালের স্মরণ-সভায় জাতীয় সংসদের উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী বলেন, মানুষকে বশে আনার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল আব্দুর রাজ্জাকের। যারা আওয়ামী লীগ করতেন না তারাও রাজ্জাকের কথা শুনতেন। তার মধ্যে কখনও অহংবোধ ছিল না। যারা ঘনিষ্ঠভাবে তার সঙ্গে রাজনীতি করেছেন তাদেরকে সমন্বিতভাবে আব্দুর রাজ্জাকের উপর একটি বই লেখার অনুরোধ জানান তিনি। অপরদিকে, আব্দুর রাজ্জাকের সঙ্গে জীবনের অনেক স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে ডুকরে কাঁদেন তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহচর তোফায়েল আহমদ। ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম নায়ক তোফায়েল বলেন, রাজ্জাক ভাই ছিলেন নেতার নেতা। রাজ্জাক বলতে বঙ্গবন্ধু ছিলেন অন্ধ। রাজ্জাক ভাইয়ের মধ্যে দম্ভ, অহঙ্কার ছিল না। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়ামের সদস্য ও মন্ত্রী না হওয়া সত্ত্বেও মৃত্যুর পর জাতি আওয়ামী লীগের রাজ্জাককে যে সম্মান দেখিয়েছে তা তার জন্য চরম সৌভাগ্যের। মৃত্যুর আগে তিনি (রাজ্জাক) বলে গেছেন, তার জীবনের একটি বড় চাওয়া ছিল, আর তা হল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তোফায়েল আহমদ আরো বলেন, রাজ্জাক ভাই সম্মান ও ইজ্জতের সঙ্গে চলে গেছেন, তিনি সত্যিই ভাগ্যবান। তাকে অনেক কিছু দেখতে হবে না।
আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল বলেন, আব্দুর রাজ্জাক ছিলেন অতুলনীয় সংগঠক। তিনি ছিলেন আজীবন সংগ্রামী ও কর্মবান্ধব নেতা। মানুষ তার কর্মকে আজীবন মনে রাখবে। দলের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেন, আব্দুর রাজ্জাক কত দুঃসাহসিক নেতা ছিলেন তা অত্যন্ত কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছি। তার মৃত্যুতে আমি স্বজন হারিয়েছি।
দপ্তরহীন মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, দেশে এখন ক্রান্তিকাল চলছে। এসময়ে আব্দুর রাজ্জাকের খুব প্রয়োজন ছিল। মৃত্যুর পর জনতা তার প্রতি যে প্লাবন দেখিয়েছে তাতে প্রমাণ হয়, নেতা ও নেতৃত্বকে কোনভাবে জনতা থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাংলার মাটিতে হবেই উল্লেখ করে আওয়ামী লীগের এই নেতা বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের প্রতিটি ব্যক্তিকে আজ এক প্ল্যাটফর্মে আসতে হবে। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ নেতা শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, সুস্থ হয়ে দেশে ফিরে যুদ্ধাপরাধের বিচারের লক্ষ্যে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করার কাজে নিজেকে নিযুক্ত করার বড় ইচ্ছা ছিল আব্দুর রাজ্জাকের। তিনি কর্মীদের সন্তানের মত আদর করতেন। তিনি ভোগের রাজনীতি করতেন না। তিনি বলেন, কোনো শক্তি যেন যুদ্ধাপরাধের বিচারকাজ বাধাগ্রস্ত করতে না পারে সেজন্য আমাদের ঐক্য হওয়া খুব দরকার। পৃথিবীর কোথাও পরাজিত শক্তি আস্ফাালন দেখাতে পারে না, তারা থাকে চোরের মত। অথচ স্বাধীনতা বিরোধী জামায়াত-শিবির বিচার বন্ধের দাবিতে এখানে হরতাল পর্যন্ত করেছে।
ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, বিএনপি এতদিন বলতো-আমরাও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই। কিন্তু এবার গণসংযোগের নামে বিএনপি সরাসরি জামায়াতকে মাঠে নামিয়েছে। সেখান থেকে জামায়াত ট্রাইব্যুনাল ঘেরাও করার হুমকি পর্যন্ত দিয়েছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট অপরাধীদের সর্বোচ্চ সাজা না দেয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। যুদ্ধাপরাধের বিচারে বাধা দিতে এভাবে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)সহ বিভিন্ন সংস্থা এই বিচার বন্ধের তত্পরতা চালাচ্ছে।
জাসদ সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, আব্দুর রাজ্জাক ছিলেন কর্মীর নেতা ও ঐক্যের নেতা, তিনি ছিলেন নীতি-আদর্শে অটল। তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকাজ শেষ ও রায় কার্যকর করতে হবে। এই বিচার বানচালে খালেদা-জামায়াত যে চক্রান্ত করছে তা ধ্বংস করে দিতে হবে। সাম্প্রদায়িক শক্তি ও জঙ্গীবাদকে রাজনীতির বাইরে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। তাদেরকে চিরদিনের জন্য বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত করতে হবে। এখানে কোনো ছাড় দেয়া যাবে না। তাহলেই আব্দুর রাজ্জাকের আত্মা শান্তি পাবে।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, আমরা ভিন্ন রাজনীতি করলেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে আমাদের অভিন্ন লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। শুধু আইন-আদালত ও প্রশাসন দিয়ে স্বাধীনতা বিরোধী চক্রকে মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। এজন্য সংগ্রাম প্রয়োজন। আওয়ামী লীগ নেতা মোজাফফর হোসেন পল্টু বলেন, কঠিন সময়েও দৃঢ়তার সঙ্গে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার এক অসাধারণ ক্ষমতা-দক্ষতা ছিল আব্দুর রাজ্জাকের।
সাংবাদিক-কলামিস্ট আবেদ খান বলেন, রাজনীতি আজ কৃষ্ণপক্ষের কবলে। আব্দুর রাজ্জাকের সঙ্গে তোফায়েলের ও বিএনপির আব্দুল মান্নান ভুঁইয়াসহ রাজনীতিকদের যে পারস্পরিক শ্রদ্ধার সম্পর্ক ছিল তা এখন যেন হারিয়ে গেছে। রাজনৈতিক সেই সৌজন্যবোধ ফিরিয়ে আনা জরুরি। স্মরণ সভায় সভাপতিত্বকারী শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, আব্দুর রাজ্জাক মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ ছিলেন, মানুষের মুক্তির প্রশ্নে ছিলেন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। উপস্থিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের উদ্দেশে তিনি বলেন, সমমনা সকল রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তিদের নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে।
