আধুনিক যুগে সংবাদ মাধ্যমকে ‘ফোর্থ স্টেট’ বলা হয়। সংবাদপত্রকে বলা হয় ‘স্টোর হাউস অব নলেজ’। এ সকল বিশেষণ সংবাদপত্র বা সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে যোগ হওয়ার প্রধান কারণ হলো, সঠিক জ্ঞানভিত্তিক জাতি গঠনে এর ভূমিকা। আর বাংলাদেশের জন্মপূর্ব থেকে বাংলাদেশের জন্মদান ও বেড়ে ওঠার সময়ে কোনো সংবাদপত্র উপরি-উল্লিখিত ভূমিকা পালন করে থাকলে তা দৈনিক ইত্তেফাকই পালন করেছে।
ইত্তেফাকের সঙ্গে আমার পরিচয় ছোটবেলাতেই। বছর বিশেক আগে। আমাদের ঔষধের ফার্মেসিতে আব্বা ইত্তেফাক রাখতেন। মফস্বলের বাজারে তখনও পত্রিকা পড়ার রেওয়াজ অতটা দেখা যেতো না। নেহাত্ জ্ঞানপিপাসু, সচেতন ও রাজনীতির সঙ্গে জড়িত লোকজন পেপার পড়তে আসতেন। আমি বাজারে গেলে ইত্তেফাকের টারজান কার্টুনের অংশটা খুব আগ্রহের সঙ্গে পড়তাম। এভাবে ইত্তেফাকের সঙ্গে আমার পরিচয়। এমনকি ছোটবেলায় সংবাদপত্র বলতে ইত্তেফাককেই বুঝতাম। আর বড় বেলায় এসে ইত্তেফাকের গুরুত্ব ভিন্নভাবে বুঝেছি। ভাবতে অবাক লাগে যে আজ থেকে বিশ বছর আগে ইত্তেফাক জাতীয় দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সঙ্গে শিশুদের চাহিদার কথাটাও মাথায় রেখে ছাপা হতো। আজও ইত্তেফাক পড়ি। ইত্তেফাকে লিখি। ইত্তেফাক আমার এ বয়সের তৃষ্ণা একইভাবে নিবারণ করে চলেছে।
বীর দর্পে ইত্তেফাক ষাট বছরে পা রাখলো। ১৯৫৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর এদেশের সাংবাদিকতার প্রাণপুরুষ তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার হাতে যে দৈনিক পত্রিকাটির সূচনা, তা আজও প্রতিদিন ভোরে তাজা খবরের ডালি নিয়ে পৌঁছে যাচ্ছে দুয়ারে দুয়ারে। জন্মলগ্নে তত্কালীন পাকিস্তানের সেই কঠিন সময়ে সত্য প্রকাশের আরো সুকঠিন যে দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছিল পত্রিকাটি, গত ঊনষাট বছরে তা থেকে বিচ্যুত হয়নি কখনো। দীর্ঘ এই পথপরিক্রমায় বাঙালি জাতির নানা সংকটে-সাফল্যে, আনন্দে-বেদনায়, গৌরবে-অহংকারে ইত্তেফাক সঙ্গে ছিল। মহান রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান থেকে বাঙালি জাতির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ অর্জন স্বাধীনতা— সবকিছুতে ইত্তেফাক যে সমস্ত বাধাবিপত্তি তুচ্ছ করে দায়িত্ব পালন করেছে, এদেশের ইতিহাসই তার সাক্ষী। সুদীর্ঘকাল ধরে এই দায়িত্ব পালন সম্ভব হয়েছে ইত্তেফাকের প্রতি এদেশের সাধারণ মানুষের ভালোবাসা ও অকুণ্ঠ সমর্থনের কারণে। ইত্তেফাক ১৯৫৩ সালের পর থেকে জাতির ক্রান্তিলগ্নে যে সকল লেখা ছেপেছে তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ লেখা, সম্পাদকীয় ও উপ-সম্পাদকীয়গুলো যদি ধারাবাহিকভাবে পুনঃপ্রকাশ করতো, তবে নতুন প্রজন্ম আজ ইতিহাস বিকৃতির মাঝেও জাতির সত্য ইতিহাস নতুন করে জানতে পারতো।
ইত্তেফাককে যে কারণে অনন্য মনে হয়— ১. সকল আদর্শ, দল বা মতের পাঠক, লেখক এখানে সমান গুরুত্ব পায়। ২. সকল আদর্শের লেখক সমানভাবে তার মতামত প্রকাশের সুযোগ পায়, তা সে হোক আস্তিক বা নাস্তিক, সেক্যুলার বা ননসেক্যুলার, পুিঁজবাদ বা সমাজতন্ত্রপন্থি বা ইসলামপন্থি। কিন্তু কিছু সংবাদপত্র আছে যারা তাদের পছন্দের আর্দশের বাইরের কোনো লেখকের লেখা সহজে ছাপাতে চায় না। অর্থাত্ ইত্তেফাক সত্যিকার অর্থে মানুষের চিন্তা ও স্বাধীন মতামত প্রকাশে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। ৩. তরুণ লেখকদের লেখা ও ভাবনা প্রকাশে সুযোগ দিয়ে চিন্তা ও যুক্তিশীল তরুণ প্রজন্ম গঠনে প্রধান ভূমিকা পালন।
ইত্তেফাকের দৃঢ়পদে এগিয়ে যাওয়ার পেছনের রহস্য হলো— এর পেশাদারিত্ব, এর জীবন ও সমাজ ঘনিষ্ঠ চাহিদা পূরণে সক্ষমতা। সুশাসনের প্রশ্নে, মানবাধিকারের প্রশ্নে, আত্মমর্যাদার প্রশ্নে এবং সাধারণ মানুষের সত্য জানবার অধিকারের প্রশ্নে ইত্তেফাকের আপসহীনতা। ইত্তেফাক হাজার বছর বেঁচে থাক বাঙালির কলমে, মুখে ও প্রাণের দাবিতে। ইত্তেফাক বেঁচে থাক যত দিন বাংলাদেশ ও বাঙালি বেঁচে থাকে। ইত্তেফাক বেঁচে থাক নিরপেক্ষতা ও সত্য প্রকাশে নির্ভীক হয়ে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
