বিদেশে জুরি বোর্ডে সিনেমা না দিয়ে দেশে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করতে বাধা কোথায়?

আপডেট : ০১ জানুয়ারি ২০১৩, ২০:৫৩
বর্তমানে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের দুরবস্থার কথা সবারই জানা। এ থেকে উত্তরণ কীভাবে হতে পারে তা নিয়ে তাত্ত্বিকরা অনেক লেখালেখি করছেন। গত ২৭ ডিসেম্বর ইত্তেফাকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক কাজী মামুন হায়দারের (আমার শ্রদ্ধেয় রানা স্যার) প্রবন্ধটিও সেই লেখালেখিরই অংশ। এই লেখার মাধ্যমে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন সুদিন আসবে। আমিও আশাবাদি সুদিন আসবে। তবে সুদিন কীভাবে আসবে সেটা নিয়ে কাজী মামুন হায়দারের সঙ্গে আমার কিঞ্চিত্ দ্বিমত আছে। দূরদেশে চলচ্চিত্র উত্সবে বাংলাদেশি ছবি স্থান পাওয়া, দু’ একটি ক্যাটাগরিতে পুরস্কার জেতাকেই স্যার চলচ্চিত্রের দুরবস্থা থেকে মুক্তির ‘অন্যতম’ পথ হিসেবে দেখছেন। অত্যন্ত আশাবাদি ও স্বপ্নবান এ মানুষটি তাই লিখছেন, ‘টেলিভিশনের’ জয়ধ্বনি ‘শুনতে কি পাও’। স্যার স্বপ্ন দেখছেন, হয়তো এই পুরস্কারপ্রাপ্তির মধ্য দিয়েই আমাদের দেশীয় চলচ্চিত্রের মুক্তি ঘটবে। এক্ষেত্রেই আমার ভিন্ন অবস্থান। আমি মনে করি দেশে চলচ্চিত্র নির্মাণ করে বিদেশে প্রদর্শনের মাধ্যমে চলচ্চিত্রের মুক্তি ঘটবে না। বরঞ্চ দেশের দর্শক ছবিকে পছন্দ করলেই চলচ্চিত্রের মুক্তি ঘটবে। তিনটি দৃষ্টান্তের মাধ্যমে যুক্তি তুলে ধরছি— ১. ঋত্বিক কুমার ঘটক তাঁর প্রথম জীবনে কবিতা ও গল্প লিখতেন। একসময় তিনি উপন্যাস লেখা শুরু করলেন। কারণ গল্প-কবিতার চাইতে উপন্যাসের মাধ্যমে বেশি মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব। পরে দেখলেন উপন্যাসের চাইতেও চলচ্চিত্র শক্তিশালী মাধ্যম যার সাহায্যে আরো বিচিত্র ধরনের মানুষের কাছে পৌঁছা সম্ভব। তখন শুরু করলেন চলচ্চিত্র নির্মাণ। বনে গেলেন চলচ্চিত্রের অন্যতম দিকপাল। দর্শকদের সঙ্গে তাঁর গড়ে উঠেছিল সখ্য, যোগাযোগ। ২. সদ্য প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদ। আমাদের এই ‘হুমায়ূন স্যারের’ জনপ্রিয়তা যতখানি না লেখক হিসেবে তার চেয়ে বেশি চলচ্চিত্রকার হিসেবে। চ্যানেল আইয়ে এক টকশোতে স্যার নিজেই বলেছিলেন, চলচ্চিত্র তাকে বেশি জনপ্রিয় করেছে। হুমায়ূন আহমেদের অধিকাংশ চলচ্চিত্র দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠী উপভোগ করেছেন টিভি চ্যানেলে। তাঁর বেশ কয়েকটি সিনেমা হলেও মুক্তি পেয়েছে। তার সঙ্গেও দর্শকদের গড়ে উঠেছিল সখ্য, যোগাযোগ। ৩. আমেরিকার বিখ্যাত পরিচালক ডেভিড লিউলিন ওয়ার্ক গ্রিফিথ (১৮৭৫-১৯৪৮) ১৯ শতকের শুরুতে ১৬০ মিনিটের বিশাল এক চলচ্চিত্র ‘বার্থ অব এ নেশন’ (১৯১৫) নির্মাণের মাধ্যমে হইচই ফেলে দিয়েছিলেন। কেননা সেসময় সবাই ২০ মিনিটের চলচ্চিত্র নির্মাণ করতেই হিমশিম খাচ্ছিলেন। কাজী মামুন হায়দার তাঁর লেখায় ডেভিড লিউলিন ওয়ার্ক গ্রিফিথকে মারাত্মক স্বপ্নবান মানুষ বলে উল্লেখ করেছেন। ‘বার্থ অব এ নেশন’ মুক্তির পর প্রেক্ষাগৃহে দর্শকের ঢল নেমেছিল অর্থাত্ দর্শকদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগও ছিল শক্ত, পোক্ত। কিন্তু বাংলাদেশের যেসব পরিচালকের ছবি বিদেশে পুরস্কার পাচ্ছে তাঁদের সঙ্গে দেশীয় দর্শকদের যোগাযোগ যত্সামান্যই। এ কারণেই কাজী মামুন হায়দার বিদেশে বাংলা ছবির পুরস্কারপ্রাপ্তি দেখে উদ্বেলিত হলেও তাঁর চলচ্চিত্র কোর্সের শিক্ষার্থী হিসেবে আমি খুব বেশি আনন্দিত নই। এ কারণে যে এই পুরস্কারপ্রাপ্তি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পের উন্নয়নে সরাসরি কাজে আসছে না। কেননা তাদের চলচ্চিত্র নিমার্ণের উদ্দেশ্য কেবল জুরি বোর্ডে উপস্থাপন করে পুরস্কার পাওয়া। লক্ষ করুন, ঋত্বিক ঘটক চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন সাধারণ দর্শকদের জন্য। হুমায়ূন আহমেদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। পুরস্কারের লোভে নির্মিত চলচ্চিত্রের পরিচালকদের কাজী মামুন প্রচণ্ড স্বপ্নবান মানুষ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তুলনা করেছেন ওয়ার্ক গ্রিফিথের সঙ্গে। কিন্তু গ্রিফিথও চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন সাধারণ দর্শকদের জন্য এবং তাঁর চলচ্চিত্র দেখার জন্য দর্শকদের ঢল নমেছিল। অন্যদিকে বাংলাদেশের স্বপ্নবান চলচ্চিত্রকারদের সিনেমা দেশীয় দর্শকরা দেখার সুযোগ পান না। কেবল সংবাদপত্রে পুরস্কার পাওয়ার খবর দেখেন। এক্ষেত্রে অবশ্য কেবল মুস্তফা সরোয়ার ফারুকী ব্যতিক্রম। কেননা তাঁর চলচ্চিত্রে ঢল নেমেছিল দর্শকদের। যদিও ভালগারিজমের যে অভিযোগ বাংলা মূলধারার চলচ্চিত্রে বিরুদ্ধে তোলা হয়, ফারুকীর ‘থার্ড পার্সন সিঙ্গুলার নাম্বারে’র বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ তোলা সম্ভব। এবার তার ‘টেলিভিশন’ ফিল্মটি বিদেশে পুরস্কার পাচ্ছে। এটাকে আমি সুখবর তখনই মনে করতাম যদি বিদেশের আগে বাংলাদেশের হলগুলোতে এ ছবি প্রদর্শন করা হতো, দর্শকদের দেখার সুযোগ করে দেয়া হতো। আমি মনে করি তা করা হলে বাংলাদেশের ফিল্মের অনেক উপকার হতো। হয়তোবা বন্ধের মুখে যেসব হল রয়েছে তা আরো কিছুদিন চালু রাখা সম্ভব হতো। কিছু মানুষের কর্মসংস্থান হতো। চলচ্চিত্রপ্রেমীরা বড় পর্দায় ছবি দেখার সুযোগ পেতেন। যাই হোক, বাংলাদেশে মোটামুটি দুই ঘরানার চলচ্চিত্র নির্মাতা দেখা যাচ্ছে। একটি গ্রুপ চলচ্চিত্র বিষয়ক পড়ালেখা গবেষণা না করেই কেবল দেখে দেখে শিখে চলচ্চিত্র নির্মাণ করছেন। তাঁরা কিছুটা সময় সফলও ছিলেন। কিন্তু দিন পালটেছে। যেনোতেনো গল্পে সিনেমা নির্মাণ করে দর্শক টানা আর সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে আরেকটি গ্রুপ— যাদের পুঁজি হলো স্বপ্ন, পড়ালেখা, গবেষণা। কিন্তু নেই টাকা, অভিজ্ঞতা। এক্ষেত্রে এই দুই গ্রুপের সমন্বয় করা যেতে পারে। আমি মনে করি তা হলেই বাংলা চলচ্চিত্র বর্তমানের চেয়ে ভালো অবস্থায় যাবে। তখন দেশীয় দর্শকদের বিনোদিত করার পাশাপাশি বিদেশ থেকে পুরস্কারও আনা যাবে। আসুন প্রথমে চলচ্চিত্রটি দেশের মানুষদের দেখার সুযোগ করে দেই। পরে বিদেশ থেকে পুরস্কার আনি। ইনটেলেকেচুয়াল পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পুরস্কার না জিতে দর্শকপর্যায়ে প্রতিযোগিতা করে বাংলাদেশের ফিল্মকে রক্ষা করি। রাজশাহী