আউটসোর্সিংয়ে সাফল্য
২০১০ সালেই গার্টনারের আউটসোর্সিংয়ে সম্ভাবনাময় ৩০টি দেশের তালিকায় স্থান করে নেয় বাংলাদেশ। তখন থেকেই মূলত আউটসোর্সিংয়ে এক ধরনের জোয়ার তৈরি হয়। আর এই জোয়ারে নতুন গতি আসে সদ্য শেষ হয়ে যাওয়া ২০১২ সালে। বছরের শুরুতেই বেসিস আয়োজন করে সফটওয়্যার মেলা। এই মেলায় ফ্রিল্যান্সিং আউটসোর্সিং নিয়ে ছিল আলাদা সেশন। এ বছরেই দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে অনলাইন মার্কেট প্লেস ইল্যান্স। এই মার্কেটপ্লেসে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। ইল্যান্সের ইউরোপিয়ান শাখার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেতিল জে ওলসেন উপস্থিত থেকে উদ্বোধন করেন ইল্যান্সের বাংলাদেশের কার্যক্রম। ইল্যান্স ছাড়াও ফ্রিল্যান্সার ডটকম তাদের ওয়েব সাইটের বাংলাদেশি সংস্করণ ও চালু করে এ বছর। এ বছরেই দেশে আসেন আউটসোর্সিংয়ের অন্যতম বৃহত্ সাইট ওডেস্কের ভাইস প্রেসিডেন্ট ম্যাট কুপার। কন্ট্রাক্টর অ্যাপ্রিসিয়েশন ডে’র আয়োজনে তিনি উপস্থিত হন এই দেশে। এ বছরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কিছু ফ্রিল্যান্সিং প্রতিযোগিতায় সাফল্যও লাভ করে বাংলাদেশের তরুণরা। আউটসোর্সিং নিয়ে এ বছরে ইউনিপেটুইউসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান প্রতারণামূলক কার্যক্রম চালায়। পরবর্তীতে অবশ্য শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে আউটসোর্সিং নিয়ে দিক নির্দেশনামূলক বেশ কিছু কার্যক্রমও পরিচালনা করা হয়।
অনলাইনে লেনদেন ও ই-কমার্স
২০১১ সালে অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ে চালু হলেও তাতে ৫০০ ডলার লেনদেনের সীমাবদ্ধতা ছিল। এ বছরে এই সীমা বাড়িয়ে করা হয় ২ হাজার ডলার। ফলে ফ্রিল্যান্সাররা সুবিধা লাভ করে। এ বছরে দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে অ্যালার্টপে। তবে অনলাইনে অর্থ লেনদেনের সবচেয়ে জনপ্রিয় সাইট পেপ্যাল এ বছরে যাত্রা শুরু করবে বলে আলোচনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবে পরিণত হয়নি। এদিকে চলতি বছরে ই-কমার্সে এক নতুন গতি লাভ করে বাংলাদেশ। দেশি-বিদেশি প্রচুর ই-কমার্স সাইট যাত্রা শুরু করে এ বছর এবং এসব সার্ভিস সাড়া ফেলে মানুষের মাঝে।
প্রযুক্তির নেতৃত্বে বাংলাদেশ
তথ্যপ্রযুক্তির আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সরব উপস্থিতি ছিল এ বছর। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক এবং আঞ্চলিক সংগঠনগুলোতে বাংলাদেশের নেতৃত্ব লাভ ছিল আমাদের জন্য বিশাল এক সুখবর। তথ্যপ্রযুক্তিতে এশিয়া-ওমেনিয়া অঞ্চলের নেতৃত্বস্থানীয় সংগঠন অ্যাসিসিও’র আগামী ২০১৩-১৪ মেয়াদে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন বাংলাদেশের জেএন অ্যাসোসিয়েটস-এর প্রধান আব্দুল্লাহ এইচ কাফি। আবার তথ্য অধিকার নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংগঠন উইটসা’র পরিচালক নির্বাচিত হন এসএম ইকবাল। ডোমেইন নিবন্ধন নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান ডট অর্গ (.org)-এর সদস্য হিসেবেও এই বছর নির্বাচিত হন বাংলাদেশের টিআইএম নুরুল কবীর।
সাইবার যুদ্ধ বাংলাদেশেও
সারা বছর ধরে প্রযুক্তি বিশ্ব যকন হ্যাকারদের হামলায় তটস্থ ছিল, তখন তার রেশ এসে লাগে বাংলাদেশেও। বাংলাদেশের কয়েকটি সর কারি ওয়েবসাইট বছরের শুরুতেই হ্যাক হয় ভারতীয় হ্যাকারদের দ্বারা। এরপর বাংলাদেশি হ্যাকাররাও পাল্টা আক্রমণ শুরু করে ভারতীয় ওয়েবসাইটগুলোতে। বাংলাদেশ এবং ভারতের হ্যাকাররা পাল্টাপাল্টি হ্যাকিংয়ে মেতে ওটেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ছিল বাংলাদেশের ‘ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকারস’। তারা ফেসবুকসহ বিভিন্ন মিডিয়ায় তাদের হামলার কথা স্বীকার করে নিয়মিত আপডেট দেয়। কয়েক হাজার ভারতীয় সাইট তারা হ্যাক করে বলে তারা জানায়। এ ছাড়া বাংলাদেশ সাইবার আর্মি এবং থ্রি এক্সপায়ার থ্রি সাইবার আর্মি নামেও কয়েকটি হ্যাকারদল সক্রিয় হয়ে ওঠে এই সময়।
ইউটিউব বন্ধ
বছরের মাঝ রেখা পার হতেই ভিডিও শেয়ারিংয়ে জনপ্রিয়তম ওয়েবসাইট ইউটিউবে আপলোড হয় মহানবী হযরত মুহম্মদ (সা.)কে নিয়ে কটাক্ষ করে নির্মিত চলচ্চিত্র। এটি সাড়া ফেলে গোটা মুসলিম বিশ্বে। এই ভিডিও সরানোর অনুরোধ করা গুগলকে প্রায় সব মুসলিম দেশ থেকেই। অনেক দেশেই ইউটিউব বন্ধ করে দেওয়া হয়। সেই তালিকায় নাম লেখায় বাংলাদেশও। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটারি কমিশন থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয় ইউটিউব। এখনও ইউটিউব বন্ধ রয়েছে দেশজুড়ে।
অবশেষে থ্রিজি
বিশ্ব এমন চতুর্থ প্রজন্মের নেটওয়ার্ক বাস্তবায়ন নিয়ে ব্যস্ত। পঞ্চম প্রজন্মের নেটওয়ার্ক নিয়েও কাজ শুরু করেছে কেউ কেউ। সেই হিসেবে বাংলাদেশে তৃতীয় প্রজন্মের নেটওয়ার্ক চালু হওয়াকে অনেকেই ব্যাকডেটেড মনে করলেও বাস্তবতা বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত থ্রিজি নেটওয়ার্ক চালু হওয়াটা ছিল আমাদের জন্য একটি বিরাট সাফল্য। বছরের শেষ ভাগে অক্টোবর মাসে রাষ্ট্রায়ত্ব মালিকানাধীন টেলিটক চালু করে পরীক্ষামূলকভাবে তৃতীয় প্রজন্মের নেটওয়ার্ক। বহুল প্রতীক্ষার পর অবশেষে তৃতীয় প্রজন্মের নেটওয়ার্ক শেষ পর্যন্ত যাত্রা শুরু করায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন প্রযুক্তিপ্রেমীরা। অর্থমন্ত্রী অবশ্য এই বছরের শুরুতেই অন্যান্য অপারেটরের মধ্যেও থ্রিজি নেটওয়ার্ক চালুর আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
ইন্টারনেট সংযোগে নতুন মাত্রা
বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাত এতদিন পর্যন্ত কেবল আন্তর্জাতিক সাবমেরিন কেবলের মাধ্যমেই সংযুক্ত ছিল বিশ্বের সাথে। তবে এ বছরে মূলপথে ইন্টারনেট সংযোগ স্থাপিত হওয়ায় এই নির্ভরতা অনেকাংশেই কমে যাবে। গেল বছরে বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে স্থাপিত হয় এই দ্বিতীয় ইন্টারনেট ব্যাকআপ সংযোগ। ইন্টারন্যাশনাল টেরিস্ট্রিয়াল কেবলের সাথে যুক্ত এই সংযোগ ১০ জিবিপিএস গতি প্রদানে সক্ষম।
বাংলাদেশে গুগল
বিশ্বব্যাপী অনলাইনে রাজত্ব করে যাচ্ছে গুগল। তবে এতদিন পর্যন্ত দক্ষিন এশিয়ার মধ্যে কেবল ভারতেই তারা সরাসরি কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল। এ বছরের শেষভাগে এসে বাংলাদেশেও আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম পরিচালনার ঘোষণা দেয় তারা। গ্রামীণফোনের সাবেক কর্মকর্তা কাজী মনিরুল কবীরকে কনসালট্যান্ট হিসেবে নিয়োগ দেয় তারা। এখনই অবশ্য দেশে কোনো অফিস খুলবে না তারা। তবে বাংলাদেশে তারা তাদের অন্যান্য দেশের মতোই সব ধরনের সেবাই প্রদান করবে।
মেলায় মেলায় বছর পার
গেল বছরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ছিল বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তিপণ্য আর সেবা নিয়ে হরেক রকমের প্রদর্শনী। আইটি কোম্পানিগুলোকে বলতে গেলে এক মেলা শেষ করেই আরেক মেলার প্রস্তুতি নিতে হয়েছে। এত এত মেলায় অবশ্য উদ্ভাবনী প্রযুক্তি পণ্য খুব একটা চোখে পড়েনি। গদবাঁধা কম্পিউটার, ল্যাপটপ, প্রিন্টার, মনিটর, পেনড্রাইভ, অ্যাকসেসরিজ নিয়েই ব্যস্ত ছিল আইটি প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে এই মেলাগুলো এক ধরনের একঘেয়েমি তৈরি করেছে বলেই প্রযুক্তি সংশ্লিষ্টদের অনেকের অভিমত। তবে ঢাকার বাইরেও বিভাগীয় শহরগুলোতে এই ধরনের আয়োজন প্রযুক্তিপ্রেমীদের নতুন নতুন পণ্যের সাথে পরিচিত হতে সহায়তা করছে। এসব মেলার মধ্যে অবশ্য আইটি সার্ভিস নিয়ে কিছু মেলা উত্সাহিত করে তরুণ ডেভেলপারদের।
বাংলাদেশি কিশোরের সাফল্য
কিশোরটির বয়স মাত্র ১৩ বছর। এই বয়সে যখন সবাই কম্পিউটারে গেম খেলতেই ব্যস্ত, তখন শিশির চক্রবর্তী নামের এই কিশোরটি বাংলাদেশের জন্য বয়ে নিয়ে এসেছে এক অসামান্য সম্মান। মাত্র ১৩ বছর বয়সেই সে জেন্ড সার্টিফায়েড ইঞ্জিনিয়ারের স্বীকৃতি লাভ করেছে। ছোটবেলা থেকেই গেম খেলতে পছন্দ করত শিশির। অল্পবয়সেই ফেসবুকসহ ইন্টারনেটের অলি-গলিতে পদচারণা শুরু হয় তার। আর তাতে করেই আগ্রহ তৈরি হয় ইন্টারনেটের ভেতরের খবর জানার। সেই থেকেই সে পিএইচপি শেখা শুরু করে। তখন মাত্র ১০ পেরিয়েছে সে। তারপর বিভিন্ন কোর্স করতে করতে সদ্য শেষ হয়ে যাওয়া বছরের শেষ দিনে সে জেন্ড সার্টিফায়েড ইঞ্জিনিয়ারের স্বীকৃতি লাভ করে। গোটা দেশের জন্যই এটি একটি বিশাল অর্জন।
