বৈদেশিক সাহায্যের অর্থ ব্যবহারে অদক্ষতার কারণে কেবলি লম্বা হচ্ছে পাইপ লাইন। সদ্য সমাপ্ত ২০১২ সালে এর রেকর্ড দাঁড়িয়েছে ১৬শ ৩৩ কোটি ডলার বা ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। এর অধিকাংশই গত দুই বছরের প্রতিশ্রুতির অর্থ। পদ্মা সেতু, ড. ইউনূসসহ আন্তর্জাতিক কিছু ইস্যু নিয়ে বৈদেশিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের কারণে অর্থলগ্নীকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তারই প্রভাবে পাইপ লাইনে থাকা অর্থের পরিমাণ আরো বেড়ে যায়। ২০১২ সালের নভেম্বর পর্যন্ত পাইপলাইনে থাকা অর্থের অংশ বিশেষ ছাড় হলেও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড আরো বাড়তো বলে দাবি করেন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। তাদের মতে, বাস্তবায়নের অদক্ষতার কারণে আকারে শুধু বড়ই হচ্ছে পাইপ লাইনের জমে থাকা বৈদেশিক সাহায্যের পরিমাণ ।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী চলতি (২০১২-১৩) অর্থ বছরের নভেম্বর পর্যন্ত পাইপ লাইনে জমা হয়েছে উন্নয়ন সহযোগীদের ১৬ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার। শুধু ২০১০-১১ এবং ২০১১-১২ —এ দুই অর্থ বছরেই যুক্ত হয়েছে ১০ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন ডলার। কয়েক বছর ধরে ব্যবহার করতে না পায়ায় এ অর্থ যুক্ত হয়েছে। ইআরডির এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আগামী পাঁচ-ছয় বছরের মধ্যে ১০ বিলিয়ন ডলার ছাড় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্ম দক্ষতার উপর এ অর্থ ছাড় নির্ভর করবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিশ্রুতির পরিমাণ
ইআরডি সূত্র জানায়, ২০১১-২০১২ অর্থ বছরে মোট ৪৭৬ কোটি ৪৫ লাখ মার্কিন ডলারের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মধ্যে অনুদান ও ঋণের পরিমাণ যথাক্রমে ১৪৩ কোটি ও ৩৩২ কোটি ডলার। ২০১১-১২ অর্থ বছর বৈদেশিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত ছিল ৬শ কোটি ডলার। যার বিপরীতে প্রতিশ্রুতি অর্জিত হয়েছে প্রায় ৭৮.৬৭ শতাংশ। চলতি ২০১২-২০১৩ অর্থ বছরেও ৬শ কোটি ডলার প্রতিশ্রুতির আশা করছে ইআরডি।
তবে সকল উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে ২০১১-১২ অর্থ বছরে বিশ্ব ব্যাংক থেকে সর্বোচ্চ বৈদেশিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে যার পরিমাণ ১৬২ কোটি ডলার। দ্বি-পাক্ষিক উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে চীন থেকে সর্বোচ্চ প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে, যার পরিমাণ ৫৮ কোটি ৩৭ লাখ ডলার। বৈদেশিক সাহায্যের মোট প্রতিশ্রুতির সিংহভাগ বহু-পাক্ষিক সংস্থা থেকে পাওয়া গেছে। স্বাধীনতা-উত্তরকালে ২০১০-১১ অর্থ বছরে ৫৯৬ কোটি ডলারের সর্বোচ্চ প্রতিশ্রুতি অর্জিত হয়েছিল যার মধ্যে কেবল পদ্মা সেতুর জন্যই প্রতিশ্রুতি ছিল ২৩৩ কোটি ডলার। ২০১১-১২ অর্থ বছরে বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে বৈদেশিক সহযোগিতা সংক্রান্ত মোট ৮৮টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে যার মধ্যে অনুদান চুক্তি ৬৪টি এবং ঋণ চুক্তি ২৪টি।
অর্থ ছাড়ের চিত্র
চলতি অর্থ বছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) ঋণ ও অনুদান মিলিয়ে ৯০ কোটি ৬০ লাখ ডলারের বৈদেশিক সহায়তা এসেছে। এর আগের বছরের সময়কালে এসেছে ৪৩ কোটি ৭৩ লাখ ডলার। অর্থাত্ এ সময়কালে দ্বিগুণের বেশি অর্থ ছাড় করছে উন্নয়ন সহযোগীরা।
অন্যদিকে ২০১১-১২ অর্থ বছরে মোট বৈদেশিক সাহায্য ছাড়ের পরিমাণ ২১২ কোটি ৩৩ লাখ ডলার। এরমধ্যে অনুদান ৫৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার এবং ঋণ ১৫৩ কোটি ৫৩ লাখ ডলার। ২০১০-১১ অর্থ-বছরে বৈদেশিক সাহায্য ছাড়ের (১৭৭ কোটি ৬৭ লাখ ডলার) তুলনায় ২০১১-১২ অর্থ বছরে সাড়ে ১৯ শতাংশের বেশি বৈদেশিক সাহায্যের ছাড় হয়েছে। ২০১১-১২ অর্থ বছরে ছাড়কৃত বৈদেশিক সাহায্যের মধ্যে ১৩৭ কোটি ৯৩ লাখ ডলার বহু-পাক্ষিক এবং ৭৪ কোটি ৩৯ লাখ ডলার দ্বি-পাক্ষিক উত্স থেকে পাওয়া গেছে। ২০১১-১২ অর্থ বছরে বিশ্ব ব্যাংক সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক সাহায্য ছাড় করেছে যার পরিমাণ ৬২ কোটি সাড়ে ৮ লাখ ডলার। দ্বি-পাক্ষীয় উেসর মধ্যে জাপান সর্বোচ্চ ২৪ কোটি ৭৬ লাখ ডলার বৈদেশিক সাহায্য ছাড় করেছে।
বাস্তবায়ন দক্ষতা
প্রতি অর্থ বছরের শুরুতে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বৈদেশিক সাহায্যের পরিমাণ সংশোধিত এডিপিতে কমানো হচ্ছে। এ কারণে পাইপ লাইনের আকারও বাড়ছে। চলতি অর্থ বছরে সংশোধিত এডিপিতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ বৈদেশিক সাহায্য কমানোর প্রস্তাব দিয়েছে বলে ইআরডি কর্মকর্তারা বলেন। চলতি ২০১২-২০১৩ অর্থ বছরে ২১ হাজার ৫শ কোটি টাকার বৈদেশিক সহায়তা এডিপিতে ব্যয়ের জন্য লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সংশোধিত এডিপিতে ২ হাজার কোটি টাকা কমানো হতে পারে বলে সূত্র জানায়।
ইআরডির তথ্যানুযায়ী ২০১১-১২ অর্থ বছরে (এডিপি) প্রকল্প সাহায্যের বরাদ্দ ছিল ১৮ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা (২৬২ কোটি ৫০ লাখ ডলার)। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রকল্প সাহায্যের চাহিদা হ্রাস পাওয়ায় এ অর্থ বছরে সংশোধিত এডিপিতে প্রকল্প সাহায্যের বরাদ্দ ১৫ হাজার কোটি টাকা (২০১ কোটি ৪০ লাখ ডলার) নির্ধারণ করা হয়। ২০১০-১১ অর্থ বছরের সংশোধিত এডিপিতে প্রকল্প সাহায্যের বরাদ্দ ছিল ১১ হাজার ৯৩০ কোটি টাকা (১৫৫ কোটি ৩০ লাখ ডলার)।
মোট ঋণ ও দায় পরিশোধ
চলতি অর্থ বছরের শুরুতে অর্থাত্ জুলাই মাস পর্যন্ত সরকারের নেয়া বৈদেশিক ঋণের মোট স্থিতির পরিমাণ ছিলো ২ হাজার ৩৪৪ কোটি ডলার। ২০১১-১২ অর্থ বছরে মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদি বৈদেশিক ঋণের মধ্যে সর্বমোট ৯৬ কোটি ৬৩ লাখ ডলারের সমতুল্য ৭ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। যার মধ্যে আসল ৭৬ কোটি ৯৯ লাখ ডলারের সমতুল্য ৬ হাজার ২৬৬ কোটি টাকা এবং সুদ ১৯ কোটি ৬৪ লাখ ডলারের সমতুল্য ১ হাজার ৫৮১ কোটি টাকা। এ অর্থ বছরে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে আসল বাবদ ৮১ কোটি ১০ লাখ ডলারের সমতুল্য ৬ হাজার ৪৮৮ কোটি টাকা ও সুদ বাবদ ২০ কোটি ৪০ লাখ ডলারের সমতুল্য ১ হাজার ৬৩২ কোটি টাকা বাজেটে বরাদ্দ ছিল। তবে আশার কথা হলো, স্বাধীনতার পর থেকে এ যাবত্ বাংলাদেশ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করতে সক্ষম হয়েছে। এমনকি ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে কিস্তি পুনঃতফসিলকরণের জন্য বাংলাদেশকে কখনো আবেদন করার প্রয়োজন হয়নি বলে ইআরডি জানায়।
উন্নয়ন প্রকল্প সঠিক সময়ে ও সুষ্ঠুভাবে শেষ না হওয়ার কারণ উদঘাটনে পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, উন্নয়ন প্রকল্পের সুফল প্রাপ্তিতে অন্যতম সমস্যা হলো প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যায়ে অত্যধিক বিলম্ব। সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ে যেমন বিলম্ব হয় তেমনি উন্নয়ন সহযোগী পর্যায়েও সময় ক্ষেপণ হয়ে থাকে। তাছাড়া সমন্বয়হীনতা, চুক্তির শর্তাবলী নির্ধারণে মেধা ও জ্ঞানের সঠিক ব্যবহার না হওয়ায় বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয় না। ফলে প্রকল্প প্রণয়নে বিভিন্ন ধরনের আপত্তি উপস্থাপিত হওয়ায় প্রকল্প গ্রহণে ও অনুমোদনে বিলম্ব হয়। আর এ কারণে অর্থের সঠিক ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না।
