ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কঠিন চ্যালেঞ্জে রয়েছে সরকার। আর এর জন্য অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ, দক্ষ শ্রমশক্তির অভাব এবং অবকাঠামোর দুর্বলতাকে দায়ী করেছে ম্যানিলা ভিত্তিক দাতা সংস্থা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিদ্যুত্ পরিস্থিতির উন্নয়ন, অবকাঠামো তথা যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, সস্তা শ্রমের পণ্য উত্পাদনসহ ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নতি করা প্রয়োজন। অন্যদিকে তৈরি পোশাক শিল্প এবং রেমিটেন্স-এর ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা বৈশ্বিক ঝুঁকি মোকাবেলায় অর্থনীতিকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে বলেও মনে করছে সংস্থাটি। গত বছরের শেষ প্রান্তিকে (সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত) বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনায় এ কথা বলেছে এডিবি।
সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে এডিবি উল্লেখ করেছে, অর্থবছর শেষে প্রবৃদ্ধি তার লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম হবে। তবে কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি বাড়বে। দেশের অভ্যন্তরে চাহিদা কমে যাওয়ায় শিল্প উত্পাদন কমবে। অন্যদিকে বাণিজ্য ও শিল্প উত্পাদন কমে যাওয়ার ফলে সেবা খাতের প্রবৃদ্ধিও কমবে। এ সময়কালে খাদ্যদ্রব্যে মূল্যবৃদ্ধির হার কমে আসলেও খাদ্য বহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। তবে রাজস্ব আয় তার লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী এগিয়ে যাচ্ছে। বিদ্যুতের সংকট সার্বিকভাবে বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য একটি উত্তম ব্যবসায়িক পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। এ অর্থবছরের শুরু থেকেই আমদানি-রফতানি হ্রাস পেয়েছে। বর্তমান বৈশ্বিক মন্দা এবং আভ্যন্তরীণ চাহিদা হ্রাস পাওয়ায় বাংলাদেশের রফতানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তবে ২০১৩ সাল থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংরক্ষণ ব্যবস্থা উঠে যাওয়ার ফলেও আমাদের তৈরি পোশাক শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অন্যদিকে গত বছরের তুলনায় কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি বাড়তে পারে বলেও আশা প্রকাশ করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে গড়ে সাড়ে আট শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য ছিলো সরকারের। রফতানির তুলনায় আমদানির পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়াতে অর্থবছরের শেষে বৈদেশিক দায় মেটাতে চলতি হিসাব স্থিতিতে কিছুটা ঘাটতির সম্মুখীন হবে বাংলাদেশ। তবে জিডিপি’র ৫ শতাংশ বাজেট ঘাটতি মেটাতে অর্থসংস্থানে সক্ষম হবে বাংলাদেশ।
ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০১৫ সাল নাগাদ দেশের প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশে উন্নীত করতে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে বাংলাদেশ। এ লক্ষ্য পূরণ করতে চলতি ২০১২-২০১৩ অর্থবছরেই বাংলাদেশকে মোট জাতীয় আয়ের (জিডিপি) সাড়ে ২৫ শতাংশ বিনিয়োগ থেকে বাড়িয়ে ২৯ দশমিক ৬ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। ২০১০ সালে অবকাঠামো খাতে জিডিপি’র ২ শতাংশ বিনিয়োগ ছিলো। এ হার ২০১৫ সাল নাগাদ ৬ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করতে হবে বিদ্যুত্, গ্যাস এবং যাতায়াতের অবকাঠামো উন্নয়নে।
দ্রুত এবং অপরিকল্পিত নগরায়ন আরেকটি চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। বাংলাদেশকে খুঁজে বের করতে হবে নতুন উন্নয়নের চালিকাশক্তি। তৈরি পোশাক শিল্প এবং রেমিটেন্সের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা বৈশ্বিক ঝুঁকি মোকাবেলায় অর্থনীতিকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। এ ঝুঁকি মোকাবেলায় বাংলাদেশকে সস্তা শ্রমকে কাজে লাগিয়ে পণ্য উত্পাদনের দিকে এগুতে হবে।
দেশের কৃষি খাতে ব্যাপক সাফল্য এসেছে। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুযায়ী কৃষি খাতে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের কথা বলা হয়েছে। এর জন্য কৃষি খাতে আরো নজর দিতে হবে।
শিল্প স্থাপনে জমির সংকট, বিদ্যুত্ সংকট এবং বাণিজ্য সংক্রান্ত সুবিধার অভাবে বৈদেশিক বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তবে অবকাঠামোগত উন্নয়নের বিনিয়োগে বাংলাদেশ বিরাট চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।
দেশের প্রধান রফতানি আয়ের উত্স তৈরি পোশাক শিল্পের বিষয়ে এডিবি উল্লেখ করেছে, বছর শেষে ২৮ বিলিয়ন ডলারের রফতানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন চ্যালেঞ্জ বলে মনে করে এডিবি। অন্যদিকে তৈরি পোশাক শিল্পের পণ্য উত্পাদনে খরচ বেড়ে যাওয়ায় বহির্বিশ্বে রফতানির লক্ষ্য অর্জন চ্যালেঞ্জিং হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্বব্যাপী নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ২০১৩ সালের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-এপ্রিল) আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় রেমিটেন্স প্রবাহ প্রায় ২৫ শতাংশ বাড়বে।
