বাণিজ্যিক ব্যাংকের মুনাফার কারসাজি তদন্ত করবে বাংলাদেশ ব্যাংক

আপডেট : ০২ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:৩৬
বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তাদের মুনাফা দেখানোর ক্ষেত্রে কোন কারসাজি করছে কিনা তা খতিয়ে দেখবে বাংলাদেশ ব্যাংক। গতবছর অর্থিক খাতে মন্দা বিরাজ করার পরও সমাপ্ত বছরে ব্যাংকগুলোর মুনাফা বেড়ে যাবার বিষয়টি ভাবিয়ে তুলছে নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রীয় ব্যাংককে। খুব শিগগিরই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ১০ থেকে ১২টি দল মাঠে নেমে মুনাফার বিষয়টি পর্যালোচনা করবে। জানা গেছে, খেলাপি ঋণ গোপন করে অথবা বাড়িয়ে মুনাফা দেখানোর মাধ্যমে কোন ব্যাংক বিশেষ সুবিধা নিচ্ছে কিনা তা পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বশীল সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। জানা গেছে, প্রচলিত নীতিমালা অনুযায়ী একটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ যত বেশি থাকে ওই ব্যাংকের নিট বা প্রকৃত মুনাফা তত কমে যায়। খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা মেনে চললে কোন ব্যাংকের বেশি মুনাফা হবার কথা নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা ইত্তেফাককে এ বিষয়ে বলেছেন, একটি ব্যাংক বছর শেষে ১০০ কোটি টাকা পরিচালনা মুনাফা করলে তা থেকে প্রথমেই সাড়ে ৪২ শতাংশ কর্পোরেট ট্যাক্স পরিশোধ করতে হয়। এছাড়া পরিচালন মুনাফা থেকে বিধিবদ্ধ সঞ্চিতি বা সংরক্ষিত রিজার্ভ রাখতে হয় ২০ শতাংশ। বাকি থাকে সাড়ে ৩৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে জেনারেল রিজার্ভ রাখতে হয় আরো ১ শতাংশ। বাকি ৩৬ কোটি টাকা থেকে সংরক্ষণ করতে হয় ঋণের নিরাপত্তা বা সঞ্চিতি। জানা গেছে, যে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ যত বেশি সেই ব্যাংকের প্রভিশনও সংরক্ষণ করতে হয় সে হারে। কোনো ব্যাংকের ৩০০ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ১০০ কোটি টাকা খেলাপি হলে ঋণের শ্রেণী-বিভাগ অনুয়ায়ী সে ব্যাংককে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই সূত্র বলছে, ঋণ নিম্নমান হলে ওই ঋণের বিপরীতে ২০ শতাংশ, সন্দেহজনক হলে ওই ঋণের বিপরীতে ৫০ শতাংশ এবং মন্দ বা কু-ঋণ হলে ওই ঋণের বিপরীতে ১০০ শতাংশ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। কোনো ব্যাংক ১০০ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করলে কর, বিধিবদ্ধ সঞ্চিতি ও জেনারেল রিজার্ভ সংরক্ষণ করার পর বাকি থাকে সাড়ে ৩৬ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণের কারণে ওই ব্যাংকের প্রভিশন সংরক্ষণ করতে যদি ১৫ কোটি টাকা চলে যায় তাহলে বাকি থাকে সাড়ে ১৬ কোটি টাকা। এই সাড়ে ১৬ কোটি টাকা থেকে আবার অনেক ব্যাংক তাদের ব্যাংকের মূলধন বাড়ানোর জন্য ২ থেকে ৩ শতাংশ রিজার্ভে রেখে দেয়। এরপর বাকি থাকে সাড়ে ১৪ কোটি টাকা। অর্থাত্ কোনো ব্যাংক ১০০ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করলে সব বাদ দিয়ে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য থাকবে মাত্র সাড়ে ১৪ কোটি টাকা। এই সাড়ে ১৪ কোটি টাকার ভাগিদার হলেন ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডার ও পরিচালকরা। এই সাড়ে ১৪ কোটি টাকার ওপরই ব্যাংক ডিভিডেন্ড ঘোষণা করলে তার অধিকাংশেরই সুবিধাভোগী হন পরিচালকরা। জানা গেছে, অতিরিক্ত মুনাফা দেখালে কয়েকটি ক্ষেত্রে সরাসরি প্রভাব পড়ে। প্রথমত বেশি মুনাফা করলে পুঁজিবাজারের সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের শেয়ারের দর চাঙ্গা হয়। এতে প্রতারিত হয় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। আমানতকারীরাও ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে আমানত রাখতে প্রলুব্ধ হন। এর সরাসরি সুবিধাভোগী হন ব্যাংক পরিচালকরা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, অতীতে প্রকৃত খেলাপি ঋণ গোপন করাসহ নানা কারসাজির আশ্রয় নিয়ে অতিরিক্ত মুনাফা দেখিয়ে অনৈতিক সুবিধা নেয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এবার অর্থনৈতিক মন্দা ও ব্যাংকগুলোর তীব্র তারল্য সংকটসহ খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার পরও বেশিরভাগ ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা গত বছরের চেয়ে বেশি হওয়ার বিষয়টি ভাবিয়ে তুলছে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত বছর জুড়েই ব্যাংকগুলোতে তীব্র তারল্য সংকট ছিল। এর পাশাপাশি বিদ্যুত্-গ্যাসসহ অবকাঠামো সুবিধার অভাবে বিনিয়োগ স্থবির ছিল। বছরের শেষ সময় সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক কেলেঙ্কারি ধরা পড়ার পর ব্যাংকের মাধ্যমে আমদানি রফতানি কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। গত সেপ্টেম্বরের হিসেবে বেশিরভাগ ব্যাংকের নিট মুনাফা কম হয়েছে। ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অচিরেই ব্যাংকগুলো তাদের অনিরীক্ষিত হিসাব বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে পাঠাবে। একইসঙ্গে ওই হিসাব শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের মাধ্যমে ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের জানাবে। এর পরই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত মুনাফা খতিয়ে দেখতে তদন্ত দল মাঠে পাঠাবে।