দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে প্রায় সব ধরনের কৃষি পণ্যে মূল্য হ্রাসের কারনে গ্রামীণ অর্থনীতিতে মন্দা চলছে। কৃষকের হাতে নগদ অর্থের টান পড়েছে। এক বছরেও অধিক সময় ধরে খাদ্য শস্য ও প্রধান অর্থকরি ফসল পাটের দর পতনের কারনে কৃষকের লোকসান হচ্ছে। উত্পাদন খরচ উঠছে না। এ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে উচ্চবাচ্য নেই।
গত বছর (২০১২) আমন ধান উঠার পর দর পতন শুরু হয়। এখনও তা অব্যাহত রয়েছে। আমনের পর বোরো, আউশ এবং ফের আমন ধানের দাম প্রায় একই রকম রয়েছে। নতুন উঠা আমন ধান ও চালের মূল্য বৃদ্ধির কোন লক্ষন নেই। নিরুপায় হয়ে চাষি কম দরে ধান বিক্রি করছেন। এতে তাদের মাথায় হাত। সরকার এখনও আমন সংগ্রহ অভিযান শুরু করেনি। সুযোগ বুঝে মজুতদাররা কম দামে ধান কিনে মজুত করছে। চাষির উত্পাদন খরচ উঠছে না। ধানের বদলে অন্য ফসল চাষে ঝুঁকছে তারা।
কৃষি সমপ্রসাণ অধিদপ্তরের যশোর আঞ্চলিক অফিস সুত্রে জানা যায়, এবার খুলনা বিভাগের ১০ জেলায় ৬ লাখ ৭ হাজার হেক্টর জমিতে রোপা আমনের চাষ হয়। আবহাওয়া প্রতিকুল থাকায় কৃষককে কষ্ট করে ধান চাষ করতে হয়েছে। ফলন গত বছরের চেয়ে কম হয়েছে। অনেক স্থানে বৈরী প্রকৃতি ও নাবিতে ধান রোপনের কারনে প্রায় ৭৫ হাজার হেক্টর জমির রোপা আমনে শীষ বের হয়নি। ধান কাটা এখন শেষ হয়েছে। ধানের হাট গুলোতে প্রচুর ধান উঠছে। কিন্তু ক্রেতা মিলছে কম। মোটা ধান ৫শ’ টাকা থেকে শুরু করে সাড়ে ৫শ’ টাকা মন (৪০ কেজি) দরে বিক্রি হচ্ছে। চিকন ধান ৬শ’ টাকা মন দরে বিক্রি হচ্ছে। এ অঞ্চলের প্রধান প্রধান ধানের হাট ঝিনাইদহের তেঁতুলতলা, কালীগঞ্জ, ঝিনাইদহ সদর, শৈলকুপা, ভৈরবা, বারোবাজার, কালা, হাট গোপালপুর, হলিধানি, ডাকবাংলা ও হরিণাকুন্ডু, চুয়াডাঙ্গা জেলার জীবননগন, আলমডাঙ্গা, সদর, বদরগঞ্জ ও সরোজগঞ্জ, মেহরপুর সদর, গাংনী ও বামুনদী, কুষ্টিয়ার পোড়াদহ, মশান, ঝাউদিয়া, বিত্তিপাড়া, ভেড়ামারা, আল্লারদরগা, প্রাগপুর, দৌলতপুর ও আমলা, যশোর জেলার চৌগাছা, বারিনগর, ঝিকরগাছা, পুলেরহাট, ঝিকরগাছা, রূপদিয়া, মনিরামপুর, কেশবপুর, বাগআঁঁচরা ও নওয়াপাড়া এবং মাগুরা জেলার আড়পাড়া, শালিখা, সীমাখালী, মাগুরা সদর, লাঙ্গলবাঁধ, শত্রুজিত্পুর, মহম্মদপুর ও বিনোদপুর হাটে বিপুল পরিমান ধান উঠছে বলে ব্যাপারিরা জানায়। কিন্তু যে পরিমান ধান উঠছে বাজারে তার ক্রেতা মিলছে না। স্থানীয় বাজার গুলোতে ধানের প্রধান ক্রেতা চাতাল ব্যবসায়ীরা। চালের দর পতনের কারনে তারা কম পরিমান ধান কিনছে। পাইকারি বাজারে মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ২১-২২ টাকা। আবার শৈলকুপায় মোটা চাল পাইকারি ২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। লোকসান এড়াতে এ অঞ্চলের বহু চাতাল বন্ধ হয়ে গেছে। হাজার হাজার চাতাল শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছে। বোরো ও রবিশস্য চাষ শুরু হয়ে গেছে। বীজ, সার ও অন্যান্য উপকরন কিনতে টাকার প্রয়োজন। বাধ্য হয়ে চাষি কম দরে ধান বিক্রি করছেন। ধানের বদলে গম, ডাল জাতীয় ফসল ও ভুট্টা চাষে চাষি ঝুঁকেছে বলে কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠ পর্যাযের কর্মকর্তারা জানান।
খুলনা বিভাগীয় খাদ্য অফিস সুত্রে জানা যায়, এবার ২২ হাজার ৩শ’ ৫৭ টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে। কিন্তু খুলনা বিভাগের সরকারি খাদ্য গুদাম গুলোতে স্থানাভাব রয়েছে। মোট গুদামের সংখ্যা ৭৭টি। কার্যকর আছে ৭৩টি। বর্তমানে ধারন ক্ষমতা দু’ লাখ ২০ হাজার ২২০ টন। এবার সিদ্ধ আমন চাল প্রতি ২৬ টাকা এবং আতপ চাল প্রতি কেজি ২৫ টাকা সংগ্রহ মূল্য ধার্য করা হয়েছে। এ সামান্য পরিমান চাল কেনায় বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে না। চাল কেনা হয় মিল মালিকদের কাছ থেকে। এতে চাষির কোন লাভ হবে না। ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহল ফায়দা লুটবে বলে আশংকা করা যাচ্ছে।
মেহেরপুর সদর উপজেলার উজলপুর গ্রামের বড় চাষি বাবলু মিয়া জানান, তাদের এলাকার চাষিরা ধান পাটে মার খেয়েছে। এখন সবজি তাদের সম্বল। কৃষি জমির দাম পড়ে গেছে বলে তিনি জানান। ৮ লাখ টাকা দামের এক বিঘা জমির দাম ৪ লাখ টাকাতে নেমে গেছে। শৈলকুপা উপজেলার মনোহরপুর ইউনিয়নের সাবেক মেম্বর রাশেদুল হাসান জানান, কৃষকের হাতে নগদ টাকার না থাকায় তাদের এলাকাতেও কৃষি জমির দাম পড়ে গেছে।
গত বছর নতুন পম উঠার পর প্রতি মন (৪০ কেজি) পাইকারি ৭শ’্ টাকা থেকে সাড়ে ৭শ’ টাকা দরে বিক্রি হয়। চাষির কাছে মজুত গম শেষ হলে দাম চড়তে থাকে। চাষি দাম পায় না। বাম্পার লাভ করে ব্যবসায়ী ও মজুতদাররা। বর্তমানে প্রতি মন সাড়ে ১১শ’ টাকা থেকে ১২শ’ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। জুলাই মাসে নতুন পাট উঠার পর দাম একটু ভাল ছিল। তারপর বাজারে আমদানি বাড়ার সাথে দর পতন হতে থাকে। সাড়ে ৫শ’ টাকা থেকে এক হাজার টাকা মন দরে পাট বিক্রি হয়। পাট চাষে উত্পাদন খরচ বৃদ্ধি পায়। বৈরি আবহাওয়ার কারনে ফলন ও এবার কম হয়। গত দু ’ বছর ধরে কৃষক পাটের ভাল দাম পাচ্ছে না। কৃষকের পাট ফুড়িয়ে গেলে দাম চড়ে। লাভ হয় ব্যবসায়ী ও ফড়িয়াদের। কৃষি পণ্যের মধ্যে চাষি ডাল জাতীয় ফসলের ভাল দাম পায়। স্বল্প সংখ্যক চাষি ডাল জাতীয় ফসল চাষ করে থাকে। গত বছর নতুন পিয়াজ রসুন উঠার পর দাম পড়ে গিয়েছিল। প্রতি মন পিঁয়াজ ৬শ’ থেতে ৭শ’ টাকা এবং রসুন ৫/৭শ’ টাকা মন ধরে বিক্রি হয়। শেষ পর্যায়ে পিঁয়াজের দাম চড়ে প্রতি মন দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত হয়। মজুতদারদের লাভ হয়।
কৃষির প্রধান উপকরন সার, কিট নাশক ও সেচ খরচ বৃদ্ধি পায়। এতে উত্পাদন খরচ বেড়ে যায়। সব মিলিয়ে কৃষক ভাল নেই। অপর দিকে কৃষককে অন্য প্রযোজনীয় শিল্প পণ্য চড়া দামে কিনতে হচ্ছে। সাবান সোডা থেকে শুরু করে কাপড় চোপড়, মশলা পাতি, তেল লবনসহ সব জিনিষের দাম বেড়েছে।
