বান্দরবানে ঐতিহ্যবাহী রাজপুণ্যাহ উত্সব শুরু

আপডেট : ০৩ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:৫২
বান্দরবানে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী রাজপুণ্যাহ উত্সব শুরু হয়েছে। প্রজাদের কাছ থেকে জুমের বাত্সরিক খাজনা আদায়ের জন্য রাজবাড়ি মাঠে ৫ দিনব্যাপী জুমের বাত্সরিক খাজনা আদায়ের অনুষ্ঠান ঐতিহ্যবাহী রাজপুণ্যাহ উত্সব (পইংজ্রা) শুরু হয়েছে গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান বীর বাহাদুর এমপি বলেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নে আন্তরিক আওয়ামী লীগ সরকার। পার্বত্যাঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় পার্বত্য শান্তি চুক্তি সম্পাদন করেছে এবং চুক্তি বাস্তবায়নে নানামুখী উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। শুধু সরকারের সদিচ্ছা থাকলে চলবে না, পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে পার্বত্যবাসীকেও আন্তরিক হতে হবে। প্রধান অতিথি আরো বলেন, পার্বত্যাঞ্চলের প্রধান সমস্যা হচ্ছে ভূমি। এই সমস্যা পার্বত্যাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। ভূমি জটিলতা নিরসনে পার্বত্যাঞ্চলের ঐতিহ্য বোমাং সার্কেল, চাকমা সার্কেল এবং মং সার্কেল তিন রাজাকেও ঐক্যবদ্ধভাবে ভূমিকা রাখতে হবে। পার্বত্যাঞ্চলের উন্নয়ন সার্কেল চীফদের ঐক্যবদ্ধভাবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাত্ করা উচিত পার্বত্যাঞ্চলের সমস্যা সমাধানে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বান্দরবান বোমাং সার্কেলের ১৬তম রাজা ক্যসাইন প্রু প্রকাশ কেএসপ্রু বলেছেন, রাজপুণ্যাহ উত্সব সার্বজনীন। ১৮৭৫ সালে ৫ম তম বোমাং রাজা সাক হ্ন ঞো’র আমল থেকে বংশ পরম্পরায় প্রতিবছর ধারাবাহিকভাবে রাজপুণ্যাহ উত্সব হয়ে আসছে। এটি পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহ্যের একটি অংশ, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পার্বত্যাঞ্চলের পাহাড়ি-বাঙালি সকলে এই উত্সবে অংশ নেয়। বোমাং রাজা আরো বলেন, পার্বত্যাঞ্চলের উন্নয়নে ভূমিকা রেখে চলেছে বোমাং সার্কেল এবং আগামীতেও রাখবে। প্রজাদের কল্যাণে বোমাং সার্কেলের প্রশাসনিক পদ্ধতিগুলোকেও আরো আধুনিক করে গড়ে তোলা হবে। মৌজা হেডম্যান এসোসিয়েশন গঠন এবং কার্বারীদের সঙ্গে প্রজাদের সম্পর্ক বাড়াতে নানামুখী উদ্যোগ নেয়া হবে। এসময় বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ক্যশৈ হ্লা, বান্দরবান ৬৯ পদাতিক রিজিয়নের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শাসম্ উল হুদা, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব বাসুদেব আচার্য, জেলা প্রশাসক কেএম তারিকুল ইসলাম, পুলিশ সুপার কামরুল আহসান, দাতা সংস্থা ইউএনডিপির পার্বত্যাঞ্চল প্রকল্প সমন্বয়কারী রবার্ট স্টোর, পৌর মেয়র মোহাম্মদ জাবেদ রেজা, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য সাধুরাম ত্রিপুরা মিল্টনসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং মৌজা হেডম্যান-কার্বারীরা উপস্থিত ছিলেন। গতকাল রাজপুণ্যাহ উত্সবে উদ্বোধনী দিনে বোমাং সার্কেলের ১৬তম রাজা ক্যসাইন প্রু (কেএসপ্রু) ঐতিহ্যবাহী রাজকীয় পোশাক পরিধান করে রাজবাড়ী থেকে অনুষ্ঠানস্থলে নেমে আসেন। তার সৈন্য-সামন্ত, উজির-নাজির, সিপাহী শালাররা রাজাকে মঞ্চস্থলে নিয়ে যায়। বোমাং রাজা সিংহাসনে উপবিষ্ট হলে সারিবদ্ধভাবে বান্দরবান জেলার ৭টি উপজেলার ৯৫টি মৌজা এবং রাঙ্গামাটি জেলার কাপ্তাই ও রাজস্থলী দু’টি উপজেলার ১৪টি মৌজাসহ মোট ১০৯টি মৌজার হেডম্যান, ৮ শতাধিকেরও বেশি কারবারী, রোয়াজারা রাজাকে কুনিশ করে জুমের বাত্সরিক খাজনা ও উপঢৌকন রাজার হাতে তুলে দেন। এবারের রাজপুণ্যাহ হচ্ছে বর্তমান বোমাং রাজা ক্যসাইন প্রু (কেএসপ্রু)র ১ম এবং বংশ পরম্পরায় ১৩৭তম রাজপুণ্যাহ মেলা। জানা গেছে, ১৮৭৫ সালে ৫ম বোমাং রাজা সাক হ্ন ঞো’র আমল থেকে বংশ পরম্পরায় ধারাবাহিকভাবে প্রতিবছর ঐতিহ্যবাহী রাজপুণ্যাহ উত্সব অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। বংশ পরম্পরায় বোমাং রাজপ্রথা অনুযায়ী রাজ পরিবারের সবচেয়ে বয়জ্যেষ্ঠ পুরুষ রাজা নির্বাচিত হয়ে আসছেন। রাজপুণ্যাহ মেলায় রয়েছে নাগর দোলা, সঙ্গীত, পুতুল নাচ, মৃত্যুকূপসহ ব্যতিক্রম নানা আয়োজন। বসেছে হরেকরকম জিনিসপত্রের দোকান। এছাড়া রয়েছে রাতব্যাপী যাত্রানুষ্ঠান। রাজপুণ্যাহ উত্সব পরিণত হয়েছে পাহাড়ী-বাঙালির মিলন মেলায়। শুধু বান্দরবান, রাঙামাটি নয়, রাজপুণ্যাহ মেলা দেখতে ভিড় জমিয়েছে দেশি-বিদেশি হাজারো পর্যটকও।