চট্টগ্রামের হালদা নদীতে বড় জাতের রুই, কাতল, মৃগেল ও কালি বাউস মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্রে এসব মাছের জিনব্যাংক বিপন্ন হওয়ার আশংকা ব্যক্ত করেছেন গবেষক- বিশেষজ্ঞরা। আন্তর্জাতিকভাবে সুপরিচিত দেশের একমাত্র স্থানীয় জাতের কার্প প্রজাতির মাছের প্রজননস্থল চট্টগ্রামের হালদা নদীতে সরকারি প্রকল্পের অধীনে স্থানীয় হ্যাচারিতে উত্পন্ন পোনা ছাড়ার ঘটনায় গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা এই আশংকা ব্যক্ত করেছেন।
গবেষকদের অভিমত সরকারি প্রকল্পের অধীনে হ্যাচারিতে উত্পাদন করা যে সব মাছ হালদায় ছাড়া হয়েছে সেগুলো উত্পাদনে বিশেষজ্ঞ মনিটরিং ছিলো না। ফলে হ্যাচারির মালিকরা হালদা থেকে সংগ্রহ করা মাছের ডিম থেকে উত্পাদিত রেণুপোনা এবং সেগুলোকে বড় করে আদৌ হালদায় ছেড়েছে কি না এ নিয়ে শংকা দেখা দিয়েছে। কারণ ইতিপূর্বে এভাবে হালদায় অবমুক্ত করা মৃগেল জাতীয় মাছগুলো হালদায় প্রাকৃতিকভাবে উত্পন্ন মৃগেল মাছের মতো বড় হচ্ছে না বলে স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে একজন হালদা গবেষক অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। সরকারি মত্স্য অফিসের কর্মকর্তারা অবশ্য দাবি করেছেন হ্যাচারিতে উত্পন্ন ও বর্ধিত হালদার আসল মাছই হালদা নদীতে ছাড়া হয়েছে।
বাংলাদেশের বিশ্বখ্যাত মাছের একমাত্র প্রাকৃতিক মত্স্য প্রজননস্থল হালদা নদী গবেষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মনজুরুল কিবরিয়া ইত্তেফাককে বলেন, হালদা নদীতে এখানকার আসল জাতের মা মাছ তথা রুই, মৃগেল,কাতল ও কালি বাউস মাছের প্রাকৃতিক জিন ব্যাংক বিনষ্ট হয়ে যাওয়ার সমূহ আশংকা দেখা দিয়েছে। এখানে স্থানীয় জাতের যে বিশাল রুই মাছ পাওয়া যায় তা বাংলাদেশের আর কোথাও পাওয়া সম্ভব নয়। তিনি জানান, তার কাছে অভিযোগ এসেছে সরকারি প্রকল্পের অধীনে বিভিন্ন হ্যাচারি থেকে যেসব মৃগেল মাছ হালদা নদীতে ছাড়া হয়েছে সে সব মাছের বড় হওয়া বা গ্রোথ কমে গেছে। ফলে আশংকা করা হচ্ছে, হালদার পোনা বড় করার কাজে নিয়োজিত হ্যাচারিগুলো আসল পোনা থেকে উত্পন্ন মাছ নদীতে না ছেড়ে বাইরে থেকে সংগৃহীত অনুন্নত জাতের পোনা হালদায় ছেড়েছে। এভাবে চলতে থাকলে বিশ্বখ্যাত মাছের এই প্রাকৃতিক প্রজননস্থলটি হাইব্রিড কৃত্রিম ও ছোট মাছে ছেয়ে যাবে। এখানকার আসল মাছ হারিয়ে যাবে বলে তিনি আশংকা ব্যক্ত করেন। তিনি আরো বলেন, হ্যাচারিতে হালদার আসল পোনাই বর্ধিত করা হয়েছে বিষয়ে প্রশ্ন উঠছে। কারণ সেগুলো তত্ত্বাবধান করেছে মত্স্য অধিদপ্তরের সাধারণ কর্মচারীরা। দেশে হালদার মাছের পোনার ব্যাপক চাহিদা থাকায় সেগুলো বিক্রি করে দিয়ে তার পরিবর্তে হ্যাচারিতে বর্ধিত অনুন্নত জাতের মাছ হালদায় ছাড়া হতে পারে বলেও তিনি আশংকা ব্যক্ত করেন। কারণ মাছ উত্পাদন ও বর্ধিতকরণ প্রক্রিয়ায় তার জানা মতে যথাযথ বিশেষজ্ঞ মনিটরিং ছিল না। তবে মৃগেল মাছের মতোই বিষয়টি স্পষ্টভাবে বোঝা যেতে অন্তত আরো দু’বছর অপেক্ষা করতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। কারণ প্রকল্পের এই উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় মৃগেল মাছের গ্রোথের ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব দেখা দেয়ায় এই প্রশ্নটি এখন রুই মাছের ব্যাপারেও দেখা দিয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা মত্স্য কর্মকর্তা প্রভাতি দেব ইত্তেফাককে বলেন, হ্যাচারিতে হালদার আসল পোনা মাছই বড় করা হয়েছে। হালদায় মা মাছের সংখ্যা বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রায় ৫৪৭টি রুই মাছ সমপ্রতি হালদা নদীতে অবমুক্ত করা হয়েছে। এগুলো এ নদীতে ক্রমান্বয়ে বড় হয়ে প্রতিটি মাছ আসল মাছের সমান হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তিনি জানান, মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে এখানে হালদার মত্স্য প্রজননস্থল উন্নয়নে একটি প্রকল্প ২০০৭ সালের জুলাই থেকে চালু রয়েছে।
