চার দিন অপেক্ষা শেষে বুধবার আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণার পর প্রেসিডিয়ামের শূন্য দুটি পদ নিয়ে এখন দলের মধ্যে জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে। দলের প্রবীণ নেতা আমির হোসেন আমু ও তোফায়েল আহমেদ আসছেন বলে শোনা যাচ্ছে। আবার অনেকে বলছেন যেহেতু এই দুই নেতার দলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য করা হয়েছে তাই তাদের প্রেসিডিয়ামে ফেরার সম্ভাবনা নেই। আবার গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার ছোট বোন শেখ রেহানা প্রেসিডিয়ামে আসছেন। চট্টগ্রাম থেকে একজন প্রেসিডিয়াম সদস্য নেয়া হতে পারে বলেও অনেকে অনুমান করছেন। এদিকে সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সাবের হোসেন চৌধুরী এমপি কোন কমিটিতে পদ পাননি।
ঘোষিত কমিটি থেকে বিশেষ করে আওয়ামী লীগের মন্ত্রিসভার দইজন প্রভাবশালী সদস্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজুকে প্রেসিডিয়াম থেকে বাদ দিয়ে উপদেষ্টা পরিষদে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। আলোচিত পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির অভিযোগ তোলায় আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক সৈয়দ আবুল হোসেনকে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। এবার কমিটির কোন জায়গায় তার স্থান না হওয়ার বিষয়টি ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে মন্ত্রী পরিষদ সদস্য থেকে আবুল হোসেন পদত্যাগ করার পর দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে তার না থাকার বিষয়টি দাতাদের কাছে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছাবে। এছাড়া শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজুর বিষয়ে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নেতিবাচক ধারণা ছিল। বিশেষ করে নরসিংদীর পৌর মেয়র লোকমান হোসেন হত্যাকাণ্ডের পর সেখানকার পরিস্থিতি বিবেচনা করে তাকে প্রেসিডিয়াম থেকে বাদ দেয়া হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। প্রেসিডিয়ামের অপর সদস্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহিউদ্দীন খান আলমগীরকে প্রেসিডিয়াম পদ থেকে সরিয়ে দেয়ার বিষয়ে আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ ফোরাম ইতিবাচক দিক বিবেচনা করেছে।
দলের শীর্ষ মহলের সাথে ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদটি স্পর্শকাতর হওয়ায় তাকে প্রেসিডিয়াম পদ থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের হিসেব হচ্ছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি যেন কট্টর দলীয় লোক না হন। অবশ্য তাকে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে কমিটিতে জায়গা দেয়া হয়েছে।
নতুন কমিটিতে প্রেসিডিয়াম দুটি পদ এবং বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক পদটি খালি রাখা হয়েছে। জানা গেছে, প্রেসিডিয়ামের দুটি পদে কাকে রাখা হবে তা নিয়ে দলের হাইকমান্ডের মধ্যে মতবিরোধ ছিল। একটি অংশ চেয়েছে কথিত সংস্কারবাদীদের কাছ থেকে দুইজনকে নিয়ে পদ পূরণ করতে। সাবের হোসেন চৌধুরীকে বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদকের শূন্য পদে রাখার জন্য জোর লবিং চলছে। তবে দলের একটি অংশ এই পদে নতুন কাউকে নেয়ার পক্ষে।
আওয়ামী লীগ সূত্র জানিয়েছে, প্রেসিডিয়াম পদে চট্টগ্রাম থেকে একজন নেতাকে দেয়া হতে পারে। কারণ চট্টগ্রামের নেতা আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর মৃত্যুর পর সেখান থেকে আর কাউকে প্রেসিডিয়াম পদ দেয়া হয়নি। উত্তর চট্টগ্রামের প্রভাবশালী নেতা চট্টগ্রাম-১ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন প্রেসিডিয়ামে অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন বলে আভাস পাওয়া গেছে। অপরদিকে প্রেসিডিয়ামের বাকি একটি পদে প্রধানমন্ত্রীর পারিবারিক সদস্যদের মধ্য থেকে একজনকে দেয়া হতে পারে বলেও জানা গেছে।
প্রেসিডিয়ামের নতুন সদস্য মোহাম্মদ নাসিম এবং নূহ-উল-আলম লেনিনের পাওয়ার বিষয়টি আওয়ামী লীগের এবারের কমিটিতে অন্যতম চমক।
গত কাউন্সিলে কথিত সংস্কার ইস্যুতে বাদ পড়া নেতাদের কেউই এবারের কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান পাননি। আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর সাবেক রাজনৈতিক সচিব ও দলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সাবের হোসেন চৌধুরী এবারের কমিটিতে অন্তর্ভুক্তির গুঞ্জন শোনা গেলেও শেষ পর্যন্ত কোন কমিটিতে তার ঠাঁই হয়নি। তবে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য করা হয়েছে সিনিয়র নেতা আবদুল মান্নান এমপিকে। কথিত সংস্কারপন্থি হিসেবে চিহ্নিত সকলেই নতুন কমিটির ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করেছেন।
সাবের হোসেন চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, আওয়ামী লীগের মতো একটি বৃহত্ রাজনৈতিক দলের কাউন্সিল অনুষ্ঠানের চার দিনের মাথায় পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা একটি ইতিবাচক দিক। দলের সামনে এখন অনেক চ্যালেঞ্জ। দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করে আগামী নির্বাচনে বিজয় ছিনিয়ে এনে পুনরায় সরকার গঠন করার লক্ষ্যে এই কমিটিকে কাজ করতে হবে। কমিটিতে যাদের স্থান হয়েছে তারা সকলে সৌভাগ্যবান। তাদের কাছে জাতির প্রত্যাশা অনেক। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাদের আমরা সর্বতোভাবে সহায়তা করবো।
আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, আওয়ামী লীগ দেশের একটি মূল রাজনৈতিক দল। কাউন্সিলের মাধ্যমে এ দলে যারা নতুন করে নেতৃত্বে এসেছেন তাদের অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। নতুন কমিটি ভালভাবে দায়িত্ব পালন করুক এটাই আমার আকাঙ্ক্ষা।
আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক এমপি আখতারুজ্জামান তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, বর্ণাঢ্য কাউন্সিলের মাধ্যমে দলীয় গঠনতন্ত্র মেনেই ৭৩ সদস্যের চমত্কার একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ১৬ কোটি জনসংখ্যার এই দেশে ৭৩ সদস্যের মধ্যে স্থান পাওয়া খুবই দুরূহ ব্যাপার। তাই অনেকের এই কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা যায় নাই। তার মানে এই নয় যে, যাদের কমিটিতে স্থান হয়নি তারা যোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছেন। এখন দরকার সংগঠনের ঐক্য। দৃঢ় ভিত্তির ওপর সংগঠনকে দাঁড় করিয়ে সামনের দিনগুলো আমাদের মোকাবেলা করতে হবে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ একটি ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল। এ দল জাতির প্রাণশক্তি। দলে যারা নেতৃত্বে এসেছেন তাদের জাতির প্রত্যাশা পূরণে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন বর্তমান মহাজোট সরকার চার বছরে অনেক সাফল্য দেখিয়েছে। উন্নয়নের এ ধারাকে অব্যাহত রাখতে দলকে আবার ক্ষমতায় আনার জন্য নতুন নেতৃত্বকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। তিনি নতুন কমিটির সাফল্য কামনা করেন।
