এবার অমর একুশে গ্রন্থমেলা হবে শুধুই প্রকাশকদের। রাজনৈতিক বিবেচনায় দেয়া হবে না কোন স্টল। এছাড়া পহেলা ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হতে যাওয়া এই গ্রন্থমেলায় স্টল বরাদ্দ দেয়া হবে না কোন বেসরকারি সংস্থা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনকে। পাশাপাশি মেলা শুধু বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণেই অনুষ্ঠিত হবে। রাস্তায় থাকবে না কোন স্টল। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে গ্রন্থমেলাকে সামনে রেখে বাংলা একাডেমীর সভাকক্ষে লেখক-প্রকাশকদের নিয়ে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠক শেষে এসব সিদ্ধান্তের কথা জানান একাডেমী কর্তৃপক্ষ।
বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান সাংবাদিকদের জানান, গত কয়েক বছর ধরে প্রকাশক-পাঠকদের সমালোচনার মুখে বাংলা একাডেমী কর্তৃপক্ষ এবার এসব সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে স্টল বরাদ্দের জন্য রাজনৈতিক ও ছাত্র নেতাদের চাপ মোকাবেলায় তিনি সবার সহযোগিতা কামনা করেছেন। তিনি বলেন, মেলার আভিজাত্য বজায় রাখতে এবং প্রকাশকদের যথাযথ সুযোগ সৃষ্টি করতেই অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে স্টল বরাদ্দ না দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সেইসঙ্গে দেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাধাগ্রস্ত করতে মৌলবাদী সংগঠনগুলোর অপতত্পরতাকে বিবেচনায় রেখে মেলার পরিধি কমিয়ে পাঠকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এছাড়া মেলায় আগতদের চলাচলের সুবিধার জন্য দোয়েল চত্বর থেকে টিএসসি পর্যন্ত রাস্তা বন্ধ রাখা হবে। অন্যদিকে মানসম্পন্ন প্রকাশক নির্বাচনের জন্য দেশের স্বনামধন্য লেখকদের সমন্বয়ে চারটি সিলেকশন কমিটি গঠন করা হবে বলে মহাপরিচালক জানান।
একাডেমীর মহাপরিচালকের সভাপতিত্বে গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নেন ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক, কবি বেলাল চৌধুরী, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক কবি রফিক আজাদ, কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন, কবি মুহম্মদ সামাদ, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সহ-সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ, ইউপিএলের প্রধান নির্বাহী মহিউদ্দিন আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. আমজাদ হোসেন, ঢাবি সিন্ডিকেট সদস্য বাহালুল মজনুন চুন্নু, পুস্তক প্রকাশক ও ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আলমগীর সিকদার লোটন, জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশনা সমিতির সহ-সভাপতি ওসমান গনি, নির্বাহী পরিচালক ফরিদ আহমেদ, অবসর প্রকাশনার আলমগীর রহমান, মাওলা ব্রাদার্সের প্রধান নির্বাহী আহমেদ মাহমুদুর রহমান, অন্যপ্রকাশের প্রধান নির্বাহী মাজহারুল ইসলাম, অন্বেষা প্রকাশনের শাহাদাত্ হোসেন প্রমুখ।
বৈঠকে শামসুজ্জামান খান বলেন, ‘ইতোমধ্যেই আমরা ২৩ সদস্যবিশিষ্ট মেলা পরিচালনা কমিটি গঠন করেছি। সে কমিটিই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, মেলা রাস্তায় করা যাবে না। কারণ, গোয়েন্দা সংস্থারা বলছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও নির্বাচনের বছর হওয়ার কারণে রাজনৈতিক অস্থিরতাকে মাথায় রেখে এটা করা যাচ্ছে না। একইভাবে পার্শ্ববর্তী সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেও মেলা নেওয়া যাচ্ছে না। সেজন্য শুধুই প্রকাশকদেরকে নিয়ে মেলা হবে এবং তা প্রাঙ্গণের ভিতরেই থাকবে।’
একাডেমীর প্রাঙ্গণেই মেলার আয়োজন হওয়া উচিত বলে মত দেন ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক। তিনি বলেন, ‘এ মেলা লেখক-পাঠক ও প্রকাশকদের মেলা। সেজন্যই সংগঠন ও বেসরকারি সংস্থাকে স্টল বরাদ্দ দিয়ে ভারাক্রান্ত করা ঠিক হবে না।’ তিনি রাজনৈতিক সংগঠনের সদস্যদের প্রভাব খাটিয়ে স্টল বরাদ্দ না নেওয়ার আহ্বান জানান।
কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন বলেন, অমর একুশের বইমেলা একাডেমীতেই হতে হবে— এটা আমার দাবি। যদি পাঁচজন প্রকাশককে নিয়েও করতে হয়, তাহলেও এখানেই হতে হবে। এ সিদ্ধান্তের ফলে মেলা আয়োজনে আর কোন বাধা থাকবে না। শুধু রাজনৈতিক ও ছাত্র সংগঠনগুলোর চাপ কমাতে হবে। তিনি মানসম্মত বই প্রকাশ করা তরুণ প্রকাশকদের অধিক স্টল বরাদ্দের পক্ষে মত দেন।
মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘এ মেলা কি বাণিজ্যিক মেলা হবে, না প্রকাশনার উত্কর্ষ ও বাংলা সাহিত্যের মান প্রদর্শনের মেলা হবে, তা ভাবার সময় এসেছে।’
ওসমান গনি বলেন, ‘প্রতি বছরই ভুঁইফোড় প্রকাশকরা মেলায় ঢুকে পরিবেশ নষ্ট করে। এবারে তা না হওয়ায় একটি সুন্দর গোছানো মেলা হবে বলে আশা করি।’
ফরিদ আহমেদ বলেন, ‘প্রকাশকরা চায়, গ্রন্থমেলা বাংলা একাডেমীতেই হোক। তবে রাস্তায় যাতে অবৈধ বইয়ের স্টল না বসে এটা একাডেমীকে শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।’
ঢাবি প্রক্টর আমজাদ হোসেন বলেন, ‘মেলার পরিবেশ সুষ্ঠু রাখতে রাস্তায় স্টল না বসানো এবং ছাত্র সংগঠনগুলো যাতে উত্পাত না করে সে বিষয়ে ঢাবি কর্তৃপক্ষ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করবে।’
