রতন টাটা :একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি

আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০১৩, ১৯:৩৪
রতন টাটার বাবা নাভাল টাটাকে দত্তক নেন টাটা গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা জামশেদজি টাটার নিঃসন্তান ছোট ছেলে। ১৯৪০ দশকের মধ্যভাগে নাভাল টাটার সঙ্গে তার প্রথম স্ত্রী সোনি অর্থাত্ রতন টাটার মায়ের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। তখন রতন টাটার বয়স ছিল সাত। আর ছোট ভাই জিমিয় বয়স ছিল পাঁচ বছর। তখন থেকে দাদী লেডি নাভাজবাই তাদের লালন পালন করেন। অনেক বছর পরে নাভাল টাটা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। সেখানে নয়েল টাটা নামে এক সন্তান রয়েছে। ১৯৯১ সালে জে আর ডি টাটা যখন রতন টাটাকে টাটা গ্রুপের চেয়ারম্যান করেন তখন বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালানোর অভিজ্ঞতা নেই বলে নিন্দুকেরা গলা ফাটাতে থাকে। তবে নিন্দুকের মুখে ছাই ঢেলে ২১ বছর সফলভাবে দায়িত্ব পালন করে গত ২৮ ডিসেম্বর নিজের জন্মদিনে দায়িত্ব থেকে বিদায় নিয়ে নেন চির কুমার রতন নাভাল টাটা। সমাপ্তি ঘটে একটি অধ্যায়ের। ভারতের একটি সাধারণ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত করেন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান হিসাবে। তবে বিদায়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে বেশ বেগ পেতে হয় তাকে। বাধা হয়ে দাঁড়ায় তারই প্রতিষ্ঠানের সহকর্মীরা। ২০০২ সালে তার ৬৫তম জন্মদিনে একবার চেষ্টা করেছিলেন বিদায় নেয়ার। কিন্তু বোর্ডের দ্রুত তত্পরতায় তাকে এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেয়া হয়। আরো ৫ বছরের জন্য আটকে যান দায়িত্বের বেড়াজালে। এই মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে বোর্ড নিয়ম করে চেয়ারম্যানের অবসরের বয়সসীমা হবে ৭৫ বছর। এতেই স্পষ্ট হয়ে উঠে বিশাল এ প্রতিষ্ঠানের জন্য তিনি কতটা অপরিহার্য। গত আগস্টে টাটা স্টীলের এজিএমে তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন পরবর্তী চেয়ারম্যান নিয়োগে একটি প্যানেল গঠনের কথা ভাবছেন। তখন উপস্থিত শেয়ার হোল্ডাররা আবেগ আটকে রাখতে পারেননি। ভারতের অন্য বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধাররাও একই অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন। গোদরেজ গ্রুপের চেয়ারম্যান আদি গোদরেজ বলেন, রতন টাটা টাটা গ্রুপকে দেশীয় সীমা ছাড়িয়ে একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান হিসাবে বিস্তার করেন। আমরা ভারতীয় ব্যবসায়ীরা তাকে স্যালুট করি, তিনি সাহস ও নৈতিকতার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে সারাবিশ্বে জনপ্রিয় করেন। ১৪৪ বছরের পুরনো প্রতিষ্ঠানের বিদায় বেলা সম্পদ রেখে গেছেন প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার। তবে এখন তিনি টাটা গ্রুপের ইমেরিটাস চেয়ারম্যান থাকবেন। নানা কারণে ভারতীয় ব্যবসা জগতের কিংবদন্তি বলা হয় রতন টাটাকে। ১৯৯৮ সালে বহুজাতিক এ প্রতিষ্ঠানটি টাটা ইন্ডিকো নামে প্রথম প্যাসেঞ্জার কার আনে। দুই বছরের মধ্যে গাড়িটি ভারতে এক নম্বর জায়গা দখল করে। ভারতের সবেচয়ে বড় গাড়ি নির্মাণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত লাভ করেন। দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহার ও সম্পূর্ণভাবে গাড়িটি তৈরি হয় দেশেই। বেভারেজ কোম্পানি হিসাবে টাটা টি হয়ে সারাবিশ্বে টেটলি নামে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠে। যুক্তরাজ্যের এক নম্বর চা কোম্পানি এটি। তার সময়েই টাটা মোটরস জাগুয়ার ল্যান্ড রোভার বাজারে আনে। দেশের সীমা ছাড়িয়ে টাটা স্টীল ইউরোপীয় লিমিটেড নামে ঘাঁটি করে লন্ডনে। নিউইয়র্কের পিয়েরে হাটেলও টাটার। ভারতের সবচয়ে বড় স্টীল কোম্পানিটি বৃহত্তম আউটসোর্সিং ফার্মটিও টাটার। টেলিকম সেক্টরেও টাটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। টাটা গ্রুপের ৬৫ ভাগ রাজস্ব আসে বিদেশ থেকে। ১৯৬০ সালে সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত ঘোষণার আগ পর্যন্ত টাটাসহ ১৩টি প্রতিষ্ঠানের ভারতীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকে শেয়ার ছিল। ১৯৯০ সালে সরকার যখন বেসরকারি খাতে ব্যাংক করার অনুমতি দেয় তখন এ সেক্টরে বিনিয়োগ করেনি। তবে ইদানীং টাটা ক্যাপিটাল ভোক্তাদের নানা বাণিজ্যিক সুবিধা দিচ্ছে। জীবনবীমা ও সাধারণ বীমা সুবিধাও দিচ্ছে টাটা ক্যাপিটাল। মধ্যবিত্ত শ্রেণি গাড়ির মালিক হবেন এ স্বপ্ন বাস্তব রূপ দেন তিনি। ২০০৮ সালে বাজারে আনেন পৃথিবীর সবচেয়ে কম দামের প্রাইভেট কার। টাটা ন্যানো। তখন এর দাম ছিল মাত্র এক লাখ রুপি। যা ভারতে একটি মোটর সাইকেল থেকেও কম দাম। টাটা ভারতের সর্ববৃহত্ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। ছয়টি মহাদেশের ১০০টি দেশে ৯৮টি কোম্পানির মাধ্যমে টাটা গ্রুপের ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে। ১৯৯১ সালে টাটা চেয়ারম্যান হওয়ার কিছুদিন আগে ভারত মুক্তবাজার অর্থনীতির নীতি গ্রহণ করেন। রতন টাটা এর পুরো সুবিধা নেন। তার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি ৪৩গুণ বৃদ্ধি পায়। বিদায়ী বার্তায় টাটা বলেন, বিশ্বে কঠিন অর্থনৈতিক পরিবেশ আরো কয়েক বছর অক্ষুণ্ন থাকবে। প্রয়োজন হবে প্রতিষ্ঠানের ব্যয় সংকোচনের। সামর্থ্যের ক্ষেত্রে ক্রেতার ক্রমাগত সীমাবদ্ধতা বাড়ছে। অন্যদিকে আমদানির ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। লবণ, সফটওয়্যার এবং স্টীল শিল্পের পরিসর আরো বাড়াতে হবে। ক্রেতার সুযোগ-সুবিধা ও চাহিদার বিষয়টি রাখতে হবে মাথায়। প্রতিষ্ঠানের দেনা শোধ করতে হতে হবে পরিশ্রমী। কিছু মানবীয় ও নৈতিক গুণাবলীর কারণে তিনি স্মরণীয় থাকবেন। ২০০৮ সালে যখন মুম্বাইয়ের তাজ হোটেলে সন্ত্রাসীরা আক্রমণ করলে রতন টাটা নিজে উপস্থিত থেকে কর্মী ও হোটেলের অতিথিদের উদ্ধার অভিযানে সহায়তা করেন। হোটেলটি টাটা গ্রুপেরই ছিল। আবার ১৯৯১ সালে সিংগাপুর এয়ারলাইন্সের সঙ্গে যৌথভাবে ভারতের অভ্যন্তরীণ রুটে বিমান পরিচালনা করতে চেয়েছিলেন। সবকিছু প্রায় ঠিকঠাকই ছিল। হঠাত্ সরকারের একটি অংশ ১৫ কোটি রুপি ঘুষ চেয়ে বসে। রতন টাটা তা দিতে রাজী হননি। ভারতে তার বিমান ব্যবসা করা হয়ে উঠেনি। ১৯৬২ সালে কর্নওয়েল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থাপত্যের উপর গ্রাজুয়েশন করেন। ১৯৭৫ সালে হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল থেকে ম্যানেজমেন্টের উপর ডিগ্রি নেন। টাটা মোটরসের অনেক যন্ত্র ও টাইটান ঘড়িকে আরো আধুনিক ও সুন্দর ডিজাইন দেন তিনি। ওই বছর টাটা গ্রুপে যোগদানের আগে তিনি লস অ্যাঞ্জেলসভিত্তিক স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান জোনস এন্ড ইমনসে কাজ করতেন। লেখাপড়া শুরু হয় তার বোম্বের ক্যাম্পিয়ন স্কুলে। ক্যাথেড্রাল এবং জন কনন স্কুল থেকে তিনি মাধ্যমিক পাস করেন।