দশ মাস দশ দিন মায়ের গর্ভে একটি অনাগত শিশুর ভ্রুণের ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠা। যাকে ঘিরে গর্ভবতীসহ গোটা পরিবারে আনন্দের অগ্রিম প্রস্তুতি শুরু হয়। প্রথম তৃপ্তিটি খুঁজে পান সেই মহিলাটি, যিনি দীর্ঘদিন মা হওয়ার স্বপ্নে নিজেই পুলকিত হয়েছেন, সহ্য করেছেন বাস্তব জীবনের অসংখ্য সামাজিক প্রতিবন্ধকতা আর শারীরিক প্রতিকূলতা। দ্বিতীয় তৃপ্তিটি খুঁজে পান পরিবারের অন্য সদস্যরা, শিশুটির জন্মের মধ্য দিয়ে যাদের সম্বোধনগত পরিবর্তন আসবে। কিন্তু প্রসবের পর অনেকের মাঝেই সেই আনন্দ অনেকটাই ম্লান হয়ে যায় আমাদেরই কিছু অসচেতনতা আর অসতর্কতার কারণে। বাধা হয়ে দাঁড়ায় আমাদের প্রচলিত সামাজিক রীতিনীতি, বিশ্বাস, আচরণ ও কুসংস্কার। একটি জিনিস সত্য— আমরা যে যেই কুসংস্কার আর বিশ্বাস-আচরণের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করি না কেন, অনেকাংশেই তা অনাগত শিশু ও মায়ের মঙ্গলার্থেই হয়ে থাকে। কিন্তু মঙ্গল কামনায় গৃহীত পদক্ষেপটি যে মা ও শিশুর জীবনের বিপন্নতার কারণ হতে পারে— এ বিষয়টি অনেকের কাছেই আজো উপেক্ষিত। প্রসবের মাধ্যমেই একটি শিশু এ ধরাধামে আসে, কিন্তু সেই প্রসবের সময়ও একজন মহিলার প্রসব ও প্রসব পরবর্তী কিছু বিপদ লক্ষণ দেখা দেয়। যেমন— অতিরিক্ত জ্বর, খিঁচুনি বা অজ্ঞান হওয়া, বিলম্বিত প্রসব ব্যথা, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব, বাচ্চার অস্বাভাবিক অবস্থান, বাচ্চার কোনো অঙ্গ বের হয়ে আসা, গর্ভফুল না বের হওয়া, মাথাব্যথা ও ঝাপসা দেখা। আবার অন্যদিকে ভূমিষ্ঠ শিশুর ক্ষেত্রেও কিছু বিপদ চিহ্ন রয়েছে তার মধ্যে মায়ের বুকের দুধ খেতে না পারা, খিঁচুনি, নেতিয়ে পড়া বা কম নড়াচড়া করা, দ্রুত শ্বাস বা বুকের নিচের অংশ মারাত্মকভাবে দেবে যাওয়া, জ্বর বা শরীরের তাপমাত্রা কমে যাওয়া। পাশাপাশি রয়েছে নবজাতকের সুস্থতার জন্যও রয়েছে কিছু তাত্ক্ষণিক সেবা। যেমন জন্মের ৫ মিনিটের ভেতর মুছানো-মুড়ানো, পরিস্কার ব্লেড দিয়ে নাড়ী কাটা, জন্মের ৩ দিন পর গোসল করানো, জন্মের ১ ঘণ্টার ভেতর মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো। আর এসব সমস্যার অন্যতম কারণ হলো রক্তে জীবাণুঘটিত সংক্রমণ— যা দ্রুত রক্তে ছড়িয়ে পড়ায় অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যেমন ফুসফুস ও ব্রেন জীবাণু দ্বারা সংক্রমিত হয়ে যেতে পারে। এর ভয়াবহতা এমনই যে এর কারণে একজন নবজাতক খুব দ্রুত মারা যেতে পারে। সর্বশেষ বিডিএইচএস-২০১১ জরিপ প্রতিবেদন অনুযায়ী দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, আজো আমাদের দেশে প্রতি এক হাজারে ৩২ জন নবজাতক মারা যাচ্ছে। ৮৮ ভাগই হচ্ছে এই মারাত্মক সংক্রমণ বা নিউনেটাল সেপসিস, জন্মের সময় শ্বাস নিতে না পারা বা বার্থ এসফেক্সিয়া এবং নির্ধারিত সময়ের আগেই (অপরিণত) জন্মজনিত জটিলতার কারণে। নবজাতকের মৃত্যুর এই তিনটি কারণই প্রতিরোধযোগ্য। নবজাতকের প্রসব পরবর্তী অত্যাবশ্যকীয় পরিচর্যা, বিপদ লক্ষণ সম্পর্কে অগ্রিম সতর্কতা, জটিলতা মোকাবেলার প্রস্তুতি এবং দ্রুত চিকিত্সার ব্যবস্থা করলে এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর অধিকাংশই এড়ানো সম্ভব।
তবে আশার কথা এই যে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বাংলাদেশ পেরিনেটাল সোসাইটি, আইসিডিডিআরবি এবং এমএনসিএস( মা ও শিশু স্বাস্থ্য সুরক্ষা প্রকল্প) কার্যক্রমে জড়িত সহযোগী সংস্থা সেভিং নিউবর্ন লাইফ, সেইভ দি চিলড্রেন, ইউনিসেফ-এর আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতায় মাঠ পর্যায়ে নবজাতকের সংক্রমণ রোধে অপারেশনস রিসার্চ (নিউনেটাল সেপসিস) নামে একটি গবেষণা কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে।
শিশু বিশেষজ্ঞদের মতে, জন্মের পর পরই নবজাতককে কাপড়ে মোড়ানো, শরীর মুছে শুকিয়ে রাখা, মায়ের সংস্পর্শে রাখা, বুকের দুধ খাওয়ানো, নাভির যত্ন নেয়া, তিনদিনের মধ্যে গোসল না দেয়া, শ্বাস না নিলে কৃত্রিমভাবে শ্বাস নেয়ার ব্যবস্থা করা হলে নবজাতক মৃত্যুহার অনেক কমানো সম্ভব। তাঁদের মতে, এজন্য অত্যাধুনিক প্রযুক্তি বা অনেক বেশি দক্ষতারও প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন সদিচ্ছা আর সামাজিক সচেতনতা।
তাই আমাদের সকলের সম্মিলিত সচেতনতা ও দ্রুত স্বাস্থ্যকেন্দ্রমুখী মনোভাবই পারে ভয়াবহ এই রোগটি থেকে এদেশের অনাগত ভবিষ্যত্ কর্ণধার নবজাতকদের অনাকাঙ্ক্ষিত এ মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করতে।
সুনামগঞ্জ
