এই মৃত্যু ঠেকাতে হবে

আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০১৩, ২০:০৫
গত ১৩ অক্টোবর সব কটি পত্রিকা পাহাড় ধসের সংবাদ ছেপেছে। অল্পের জন্য বেঁচে গেছে ১২ শিশু। ওরা পাহাড়ের পাদদেশে খেলা করছিল। ওদের বয়স ৫ থেকে ১০-এর মধ্যে। হঠাত্ বিকট শব্দে ধসে পড়েছে পাহাড়। নিচে খেলতে থাকা শিশুরা দ্রুত সরে যায়। পাহাড় ধসে পড়লে তিন শিশু বালির নিচে চাপা পড়ে— এলাকার লোকজন দ্রুত এসে তাদের উদ্ধার করে। পাহাড় ধসে মানুষ মরে ফি বছর। ভাগ্যিস এ যাত্রায় কোনো অঘটন ঘটেনি। প্রতি বছরই আমরা চাপা লাশ দেখে আহ উহ করছি। সেই কান্নার আওয়াজ যেন কিছুতেই ঢুকছে না দায়িত্বশীলদের কর্ণকুহরে। প্রতিরোধযোগ্য হলেও ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। এজন্য অশিক্ষিত-অসচেতন মানুষ যত না দায়ী তার চেয়ে বেশি দায়ী সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ। গত ২ জুলাই সাতদিনের মধ্যে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসরতদের গ্যাস, বিদ্যুত্ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। ২৬ জুন পাহাড় ধসে নগরীর খুলশী আকবর শাহ হাউজিং এলাকার ইয়াছিন কলোনিতে ছয়জন, বিশ্ব কলোনিতে একই পরিবারের পাঁচজন এবং উত্তর পাহাড়তলী জালালাবাদ আন্ধারমানিক এলাকায় একই পরিবারে দুই শিশু এবং মক্কী ঘোনা এলাকায় চারজন নিহত হয় হওয়ার পর সংশ্লিষ্টরা এ সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু এখনো বাস্তবায়িত হয়নি পাহাড় ধসে প্রাণহানি এড়াতে ‘শক্তিশালী পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি’র গৃহীত সিদ্ধান্ত। একইভাবে দীর্ঘ তিন মাসেও সিটি করপোরেশনের চার দফা সুপারিশ কার্যকর হয়নি। ফলে নগরীর ১৩টি পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসরত কয়েক লাখ মানুষের মৃত্যুঝুঁকি এড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। গত কয়েক বছরে পার্বত্য জেলাগুলোতে পাহাড়ের নিচে দখল আর বসতি এত বেড়েছে যে, তাতে শঙ্কিত না হয়ে উপায় নেই। দূর হয়নি পাহাড় কাটা কিংবা বন উজাড়ের ঘটনা। চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত একটি দৈনিকের সংবাদ থেকে জানা গেছে, নগরীর ৬৫টি স্থানে প্রায় অর্ধলাখ বস্তিবাসী পাহাড়ের ঢালে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করছে। এর মধ্যে লালখান বাজারের মতিঝরনা, বাঘঘোনা এবং ফয়’স লেকের কনকর্ড ও দক্ষিণ খুলশি এলাকার মানুষ সর্বাধিক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। অতিবৃষ্টির কারণে পাহাড় ধসে গরিব বস্তিবাসীর মাথার ওপর বিশাল পাহাড় ভেঙে একে একে লাশ হয় বৃদ্ধ, যুবক, নর-নারী, শিশু-কিশোর। পাহাড়ের পাদদেশ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ বসতিদের উচ্ছেদ করা না হলে পাহাড়ের দুর্ঘটনা ঘটতেই থাকবে। পত্রিকায় পড়েছি চট্টগ্রাম নগরীর মতিঝরনার জিলাপির পাহাড়, টাংকির পাহাড়, গণপূর্ত অধিদফতরের পাহাড়, বাটালি পাহাড়ের পাদদেশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য বস্তি। উত্তর দিকে টাঙ্কির পাহাড়, একে খানের পাহাড় হয়ে দক্ষিণ দিকে জিলাপির পাহাড়, বাটালি পাহাড় হয়ে সোজা পশ্চিম দিকে টাইগার পাস রেলওয়ে কলোনি পর্যন্ত প্রায় দুই বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বস্তিটি ছড়িয়ে আছে। মতিঝরনার পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে বাঘঘোনা এলাকার মুছার পাহাড়। প্রায় ৯০ ফুট উঁচু পাহাড়টির পাদদেশে বসতি গড়ে উঠেছে। মুছার পাহাড় ছাড়াও ফয়’স লেকে কনকর্ড পুনর্বাসনের নামে গড়ে তুলছে মৃত্যু উপত্যকা। পাহাড়গুলোর মধ্যখানে মৃত্যু ও ঝুঁকি নিয়ে প্রায় ১০ হাজার লোক বাস করছে। অতিবর্ষণে যে কোনো সময় এ ধরনের পাহাড় ধসে মানুষের জীবন্ত কবর হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও সিটি করপোরেশন বা সিডিএ বস্তিগুলো উচ্ছেদে তত্পর নয়। ফয়’স লেক ছাড়াও কুসুমবাগ আবাসিক এলাকা, দক্ষিণ পাহাড়তলির সেকান্দরপাড়া, কাইচ্যাঘোনা, লেবুবাগান প্রভৃতি এলাকায় হাজারো মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাস করছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের গবেষণায় দেখা যায়, মহানগরীর ৬৫টি স্থানে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসতি রয়েছে। এসব স্থানে প্রবল বৃষ্টিতে পাহাড় ধস ছাড়াও ভূমিকম্পও ঘটতে পারে। পাহাড় কাটার ফলেই প্রতি বছর পাহাড় ধসে মানুষ মারা যাচ্ছে। স্থানীয় প্রভাবশালী মহল ও কতিপয় মাস্তান সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সহায়তায় পাহাড়ের পাদদেশের জায়গা দখল করে ঘরবাড়ি নির্মাণ করায় পাহাড় ধসে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। পাহাড় ধসে মৃত্যু ঠেকাতে ১৬ দফা সুপারিশ দেয়া হয়েছে। এসব সুপারিশ অনুসরণ করা হলে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি কমানো যেতো। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন বরাবরই পাহাড়ের পাদদেশ থেকে পর্যায়ক্রমে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি সরিয়ে নেয়া হবে বলে হম্বিতম্বি করে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন। সিটি করপোরেশনের লোকজন পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের কাছ থেকে উেকাচ নিয়ে নীরব থাকছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ১৬ দফা সুপারিশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো পাহাড়ের মালিক (রেলওয়ে, ওয়াসা, গণপূর্ত) লিজ দেয়ার বিভিন্ন শর্ত খতিয়ে দেখবে এবং শর্ত না মানা হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। রেলওয়ে, গণপূর্ত ও ওয়াসাসহ বিভিন্ন সংস্থার অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। ঢাকা