বাংলাদেশের জন্মদিন ১৬ ডিসেম্বর । ৪ দশক পেরিয়ে ৪১তম বিজয়দিবস পালিত হলো এর। এত দীর্ঘ সময়ে অনেক কিছু হয়েছে এই দেশে। হয়েছে বড়-বড় রাজনীতিবিদের উত্থান, বেড়েছে অনেক কোটিপতির টাকার পরিমাণ, জন্ম হয়েছে অনেক নব্যদেশপ্রেমিকের, বেড়েছে তথাকথিত জনগণের জন্য কাজ করার প্রত্যয়ে দীপ্ত বুলি প্রতিযোগীর সংখ্যা। বেড়েছে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বলে পরিচিতি পেতে মরিয়া এমন রাজনৈতিক দলের সংখ্যা। আমি কখনো নিজ চোখে দেখিনি আমার দেশের যুদ্ধ , ভাষার সংগ্রাম , স্বাধীনতা সংগ্রাম। সবকিছুই আমাকে শুনতে হয়েছে বড়দের কাছ থেকে আর নিজচোখে দেখতে হয়েছে বইয়ের পাতায়। আর এভাবেই আমার অন্তরে স্থান করে নেয় ভাষাশহীদদের এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি এক মমতাময় ভালোবাসা।
কিন্তু হায়! বিজয়ের দিনেই হতবাক হয়ে যাই যখন পত্রিকার পাতা আর টিভির পর্দায় আমাকে দেখতে হয়েছে আমার প্রিয় মুক্তিযোদ্ধাদের করুণ আকুতির ছবি ও খবর। এসব খবরে আর ছবিতে ছিল মুক্তিযোদ্ধারা না খেয়ে মারা যাচ্ছেন , কেউ চা বিক্রি করে দিন গুজরান করছেন , কেউ রিকশা চালিয়ে রুজি জোগাড় করছেন। কেউ ধুঁকে-ধুঁকে মারা যাচ্ছেন । কেউ বিনা চিকিত্সায় মারা যাচ্ছে, দেখার কেউ নেই। কেউ আজও তার মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি আর সনদ পাননি। কেউ আবার মরার পরেও তাঁর স্বীকৃতি পাননি। বিভিন্ন বধ্যভূমি এবং স্বাধীনতার স্মৃতিবিজড়িত স্থান-স্থাপনা অযত্নে অরক্ষিত থাকার খবর।
এসব খবর আর ছবি দেখে সত্যিই আমার অন্তর কেঁদে ওঠে। আজকের বাংলাদেশের পেছনে যাঁদের অবিস্মরণীয় অবদান তাঁরা অবহেলিত এবং তাঁদের নিয়ে রাজনীতি করতে আর ব্যবসা করতে দেখে একজন তরুণ হিসাবে সত্যিই হতবাক হই ।
১৬ ডিসেম্বর ২০১২ তারিখ দৈনিক যায়যায়দিনে ‘কোমরে ব্যথা নিয়েও জুতা সেলাই করে চলেছেন মুক্তিযোদ্ধা ধীরেন্দ্রনাথ’ এবং ‘ভোলার কমান্ডার সিদ্দিকের খবর কেউ নেয় না’ শিরোনামে দুটি খবর ও ছবি ছাপা হয় । দৈনিক যুগান্তরে ‘জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের দৈন্যদশা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে ‘ঘুষ দিতে ব্যর্থ হওয়ায় তালিকাভুক্ত হননি মুক্তিযোদ্ধা পরিমল শীল’ ‘দেড়টাকার জন্য চাকরিচ্যুত মুক্তিযোদ্ধা’ ‘মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফার কাঁধে ভিক্ষার ঝুলি ’’ ‘দুঃসহ যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে আছেন যুদ্ধাহত হালিমা বেগম’ ‘ভৈরবে পাঁচ মুক্তিযোদ্ধার জীবন সংগ্রাম’ ‘চা বিক্রি করে সংসার চলে দুই টাইগারের ’ ‘স্বাধীনতাবিরোধীদের কাছে চা বিক্রি করেন না মুক্তিযোদ্ধা ওয়াদুদ’ শিরোনামে মোট ১২ জন মুক্তিযোদ্ধার করুণদশা জাতির সামনে উপস্থাপন করা হয়। দৈনিক কালের কণ্ঠে ‘মুক্তিযোদ্ধার বাঁচার লড়াই’ শীর্ষক ধারাবাহিকের অংশ হিসাবে ‘দারুমিয়া এখন দিনমজুর’ শিরোনামে জাতির এক শ্রেষ্ঠ সৈনিকের জীবনযুদ্ধের কথা প্রকাশিত হয়। দৈনিক বণিকবার্তায় ‘দেশের জন্য যুদ্ধ করেছি এখন চা বিক্রি করে সংসার চালাই’ শিরোনামে খবর ও ছবি ছাপা হয়। দৈনিক বাংলাদেশ সময়ে স্বাধীনতার ৪১ বছরেও ‘গোদাগাড়ীর বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষিত হয়নি’ শিরোনামে খবর ছাপা হয়। দৈনিক প্রথম আলোতে ‘গুলিস্থান কমপ্লেক্সের নামসর্বস্ব মালিক মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট’ শিরোনামে খবর ছাপা হয়।
এখানে শুধু ১৬ ডিসেম্বর বিজয়দিবসের পরিসংখ্যান তুলে ধরা হলো। কিন্তু সারা বিজয়ের মাসে সমস্ত দৈনিক নিয়মিত এই আয়োজন করেছে। প্রতিদিনই কোনো না কোনো মুক্তিযোদ্ধার করুণ কাহিনী জানা গেছে । শুধু প্রিন্ট মিডিয়া নয় ইলেকট্রনিক্স মিডিয়াতেও একই চিত্র। বিজয়ের মাসে টিভি পর্দায় প্রতিদিনের খবরে কোনো না কোনো মুক্তিযোদ্ধার প্রতিবেদন ভিডিওচিত্রসহ প্রচার করা হয়।
সব সরকার জনগণের জন্য কাজ করবেন বলে অনবরত বাহারি বুলি আওড়ান । প্রশ্ন করতে ইচ্ছা করে— জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানরা কি জনগণের মধ্যে কেউ-ই না ? যদি কেউ হবে তাহলে আজ স্বাধীনতার ৪ দশক পরে কেন তাঁরা ধুঁকে-ধুঁকে মরবেন ? কেন ভিক্ষা করতে হবে তাঁদের ? কেন মরার পরেও সনদ পাবেন না? কেন তাঁদের জুতা সেলাই করতে হবে ? কেন বুড়ো বয়সে দিনমজুরের কাজ করতে হবে? কেন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধারা সনদ পাচ্ছে। প্রতিবছর বিজয়ের মাস এলেই কত সদয়-সহানুভূতি মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি আমাদের রাজনীতিকদের! কিন্তু আসল কাজের কাজটা কেউ করতে চান না কী কারণে? আমাদের এই মুক্তিসেনারা যাঁরা বেঁচে আছেন তাঁদের প্রতি সত্যিকার অর্থেই সম্মান প্রদর্শন করা হবে তখনি যখন এই করুণ চিত্র আর আমাদের সামনে আসবে না এবং মুক্তিযোদ্ধাদের নামে কোনো অনিয়ম আর অভিযোগের খবর দেখা যাবে না । জাতির এই শ্রেষ্ঠ সন্তানদের প্রতি সত্যিকার অর্থেই সম্মান প্রদর্শন করুক আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশের সব রাজনীতিবিদ আর সরকারি মহল।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
