‘পৈতৃক পেশাটা বুঝি আর ধরি রাখা যাওচে না’

আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০১৩, ২০:০৯
বাড়ুইপাড়া। মিঠাপুকুর উপজেলার ২ নম্বর রানীপুকুর ইউনিয়নের হিন্দু অধ্যুষিত একটি ক্ষয়িষ্ণু গ্রাম। গোটা উপজেলার মধ্যে পান উত্পাদনের জন্য বিখ্যাত। এ গ্রামের অধিকাংশেরই জীবিকা নির্বাহ হয় পানচাষ করে। আগে হিন্দু সমপ্রদায়ের বাড়ুইরাই শুধু পানচাষ করতো। এখন তাদের সংখ্যা কমে গেছে। সেইসাথে কমে গেছে পানবরজের সংখ্যাও। তবে কিছু কিছু মুসলমানও এখন পানচাষে ঝুঁকে পড়েছে। উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নের মধ্যে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি গ্রামে পানের বরজ চোখে পড়লেও বাড়ুইপাড়া গ্রামটিই পানের বরজে বেশি সমৃদ্ধ। বলতে গেলে স্থানীয়ভাবে পানের চাহিদা পূরণ হয় এখানকার উত্পাদিত পান থেকেই। বেশিরভাগ ভাটিয়াল, বাংলা, সাঁচি, ঘাসপান জাতের পানই উত্পন্ন হয় এখানে। পানচাষে বিনিয়োগ করতে হয় অন্যান্য ফসলের চেয়ে অনেক বেশি। সার্বক্ষণিক পরিচর্যার জন্য করতে হয় প্রচুর পরিশ্রম। পানিসেচের ব্যবস্থা রাখতে হয় শুকনা মৌসুমে। তবে সুবিধাটা হলো পানে প্রাকৃতিকভাবে এক ধরনের রাসায়নিক সুগন্ধ থাকে বলে ক্ষতিকর প্রাণী বা কীটপতঙ্গ দ্বারা আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা খুবই কম। চারা রোপণের একবছর পর পান তোলার উপযোগী হয় । একনাগাড়ে কয়েক বছর একটি বরজ থেকে পান আহরণ করা যায়। পান আহরণের উপযুক্ত সময় হলো কার্তিক, ফাল্গুন এবং আষাঢ় মাস। পানচাষ অত্যন্ত লাভজনক হলেও ইদানীং পানবরজ তৈরির উপকরণের চড়া দামের কারণে পানচাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন অনেক চাষি। ক্ষেতের চারদিকে বেড়া, খুঁটি, উপরে মাচানবিশিষ্ট বরজ তৈরির অপরিহার্য উপাদান বাঁশ। সেই বাঁশ এখন প্রায় দুষ্প্রাপ্য এবং দাম আকাশচুম্বি। তার উপর সরিষার খৈল, গোবর সার, রাসায়নিক সারের দাম এতই চড়া যে, পানচাষীদের পক্ষে তা সংগ্রহ করাই দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। অন্যান্য ফসলের ক্ষেত্রে নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন হলেও পানের উত্পাদন কৌশলে এখন পর্যন্ত আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি। সম্প্রতি বাড়ুইপাড়া গ্রামে পানের বরজ দেখতে গিয়ে কথা হয় পানচাষী শ্রী দীনবন্ধু বর্মনের সঙ্গে। তিনি আক্ষেপ করে জানালেন, একসময় তার পানের বরজ ছিল তিন বিঘা জমি জুড়ে। এখন তা কমতে কমতে কুড়ি শতাংশে এসে ঠেকেছে। জৈব সারের সঙ্গে রাসায়নিক সার ব্যবহার এখন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। বাঁশ, গোবর সার, খৈল ইত্যাদি উপকরণের দাম নাগালের বাইরে। পানের আবাদে আর আগের মতো লাভ হয় না। এ অবস্থা চলতে থাকলে কয়েক বছরের মধ্যে বরজশূন্য হয়ে পড়বে এ বাড়ুইপাড়া গ্রাম। দীনবন্ধুর সাথে সুর মিলিয়ে ক্ষুদ্র পানচাষী শ্রী শশাংক বর্মন, শ্রী সুগন্ধ বর্মন, নৃপেন, খগেন, নরেশ বাড়ুইরা জানালেন, ‘পান আবাদ করি আর পোষায় না বাহে। খরচ পড়ে মেলাগুলা। উয়ার থাকি হামরা (এরচেয়ে আমরা) অন্য জিরাইত (ফসল) করমো। তাতে খরচ কম, লাভ বেশি। পৈতৃক পেশাটা বুঝি আর ধরি রাখা যাওচে না।’