ফিরে চল্?, ফিরে চল্?, ফিরে চল্? মাটির টানে —/
যে মাটি আঁচল পেতে চেয়ে আছে মুখের পানে।/
যার বুক ফেটে এই প্রাণ উঠেছে, হাসিতে যার ফুল ফুটেছে রে,/
ডাক দিল যে গানে গানে \
শিল্পীদের গানে এই আমন্ত্রণী ধ্বনি ছড়িয়ে পড়েছিল রাজধানীর পৌষমেলার অঙ্গনে। শীতের সূর্য তখনো কুয়াশার চাদর ছিঁড়ে উঁকি দেয়নি। রমনা পার্কের শিশির ভেজা ঘাস মাড়িয়ে সেই ভোরবেলা উপস্থিত অসংখ্য মানুষ। পৌষের শীত অনেক আগেই মানুষের জীবনে ছড়িয়ে দিয়েছে শীতল অনুভূতি। তারপরও রাজধানীবাসী হিম শীতল সকালে জড়ো হয়েছিলেন হাজার বছরের ঐতিহ্যের টানে রমনা বটমূলে পৌষমেলার আনন্দে মেতে উঠতে।
পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে, আয় রে চলে, আয় আয় আয়/
ডালা যে তার ভরেছে আজ পাকা ফসলে, মরি হায় হায় হায়/ —
শল্পীদের এই আমন্ত্রণে যারা এসেছিলেন তারা মেতে উঠেছিলেন পিঠা-পুলি খাওয়ায়। জমে উঠেছিল পৌষমেলা। শিল্পীদের গানে, কবিতার উচ্চারণে, পিঠা-পুলির মন মাতাল করা ঘ্রাণ মনে করিয়ে দিয়েছিল গ্রামের সেই ফেলে আসা দিনগুলির কথা। নাগরিক জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়লেও বাঙালির মন থেকে হারিয়ে যায়নি গ্রামীণ জীবনের স্মৃতিমাখা উত্সবগুলো। তাই, গতকাল শুক্রবার রমনা বটমূলে আয়োজিত পৌষমেলা নাগরিক জীবনে অনাবিল প্রশান্তির স্পর্শ বুলিয়ে দিল।
স্টেজে গান শুনে নাচ দেখে আর মেলার স্টলগুলোতে দল বেঁধে পিঠা, খেজুরের রসে সিক্ত হয়ে নগরবাসী উদযাপন করছে এই পৌষের উত্সব। মঞ্চে শিল্পীদের গান ভেসে আসে ‘ওই সে দোলায় হিমেল হাওয়ার হাতছানি’, পৌষ এলো পৌষ এলো’।
পৌষ পার্বণ বা পোষলা একটি শস্য উত্সব। এ উপলক্ষে মুসলিম রাখাল ছেলেরা মানিক পীরের গান গেয়ে, আর হিন্দু রাখালেরা লক্ষ্মীর নামে ছড়া কেটে সারা পৌষ মাস সন্ধ্যার পর বাড়ি বাড়ি মাগন করত। মাগন শেষে তারা পৌষ সংক্রান্তির সকালে মাঠ বা বনের ধারে রান্না করত; পিঠা বা শিরনি বানিয়ে পীর বা দেবতার উদ্দেশে নিবেদন করত এবং পরে নিজেরা খেত। একে পিঠাপর্বও বলা হতো।
‘জাগো মানুষের সুপ্তশক্তি, হাটে-মাঠে-ঘাটে-বাঁকে’ এ শ্লোগান নিয়ে গতকাল শুক্রবার থেকে রমনা বটমূলে পৌষমেলা উদযাপন পরিষদের উদ্যোগে শুরু হয়েছে দুইদিনব্যাপী উত্সব। সকালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান পৌশালী পর্বে ‘আইল্যা’ জ্বালিয়ে উত্সবের উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধন পর্বে উপস্থিত ছিলেন পৌষ মেলা উদযাপন পরিষদের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ, সহ-সভাপতি হাসান আরিফ, সাধারণ সম্পাদক বিশ্বজিত্ রায়, গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ঝুনা চৌধুরী, রফিকুল ইসলাম প্রমুখ।
সকালের উদ্বোধনী পর্বের শুরুতেই ওস্তাদ মমতাজ আলী খান একাডেমীর শিল্পীরা এক কণ্ঠে গেয়ে উঠেন ‘পৌষের বাও পাহাড়ী, মাঠে নতুন তরকারি’ গানটি। এরপর সংগঠনের শিল্পীরা গেয়ে শোনান ‘যারে যা চিঠি’ গানটি। জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদের ঢাকা মহানগরের শিল্পীরা গেয়ে শোনায় ‘ফিরে চল মাটির টানে’, স্বভূমি লেখক-শিল্পীকেন্দ্র পরিবেশন করেন ‘গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু মসুলমান’ এবং ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী পরিবেশন করে ‘বাজে কি মধুর সুরে, বাজে বাংলাদেশের বাঁশি’। নৃত্যম ‘ফিরে চল মাটির টানে’ ও নৃত্যশ্রী ‘দিন যায় দিন আসে’ গানের তালে দলীয় নৃত্য পরিবেশন করে। একক কণ্ঠে খায়রুল আনাম শাকিল ‘শ্যামলবরণ বাংলা মায়ের রূপ’, আবু বকর সিদ্দিক ‘ও আমার গোসাইরেনি দেখছো’, ফাহিম হোসেন চৌধুরী ‘আয়রে মোরা ফসল কাটি’, সুতপা রায় ‘আমি সকল কাজের পাইনি সময়’ পরিবেশন করেন। এছাড়া আরিফ রহমান, সমর বড়ুয়া, খগেন সরকার, পারিশা এষা ও একেএম মোস্তাফিজুর রহমান পৌষের গান পরিবেশন করেন। দলীয় আবৃত্তি পরিবেশন করে মুক্তধারা আবৃত্তি চর্চা কেন্দ্রের বাকশিল্পীরা। তারা ‘পৌষ ফাগুনে পালা’ শীর্ষক আবৃত্তি প্রযোজনায় অংশ নেন। ডালিয়া আহমেদ একক কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সন্ধ্যাপ্রদীপ’ কবিতাটি আবৃত্তি করেন।
বিকালের পর্বে দলীয় সঙ্গীত পরিবেশন করে সুরতীর্থ, আনন্দন, রবীরাগ, দৃষ্টি ও ধ্রুব শিশু-কিশোর সংগঠন। দলীয় নৃত্য পরিবেশন করে আচিক কালচারাল একাডেমী (গারো সম্প্রদায়’ ও মানিকগঞ্জের মহুয়ার পালা)। একক সঙ্গীত পরিবেশন করেন সুমনা দাস, সামিয়া নাজ, কাননবালা সরকার, শান্তা সরকার, তানিয়া মান্নান, আরিফ রহমান, মাহজাবিন রহমান শাওলী, আশীষ সরকার, আবিদা রহমান সেতু ও ঐশিকা নদী। একক আবৃত্তি পরিবেশন করেন ভাস্বর বন্দোপাধ্যায়, বেলায়েত হোসেন, অনন্যা লাবণী পুতুল ও রবী শংকর মৈত্রী।
এদিকে পৌষের পুরো আমেজ নিয়েই মেলা প্রাঙ্গণে পিঠা পুলির আয়োজন সাজিয়ে বসেছিল প্রায় ৪০টি স্টল। এসব স্টলে শুধু পিঠাই নয়, আরো রয়েছে নানা ধরনের খাবার সামগ্রী, মধু, বুটিকের পোশাক ইত্যাদি। গরম গরম ভাপা, চিতই ও তেলের পিঠা ছাড়াও স্টলগুলোতে ছিল দুধরাজ, পুলি, পানতোয়া, পাটিসাপটা, ফুলঝুরি, মুখপ্রাশন, ঝালপিঠা, গোলাপ ফুল পিঠা, খেজুরের পিঠা, সেমাই পিঠা, মেরা পিঠা, পাকান পিঠা, রস পিঠা, নারকেল পিঠা, চিড়ার মোয়া, কাউনের মোয়া, ঝালপোয়া ইত্যাদি। এছাড়া যান্ত্রিক নগরীর দুষ্প্রাপ্য খেজুরের রসের আস্বাদও গ্রহণ করেছেন অনেকে।
আজ শনিবার মেলার দ্বিতীয় দিনেও রয়েছে দুই পর্বের অনুষ্ঠান। এসব অনুষ্ঠানের আয়োজনের মধ্যে রয়েছে নাচ, গান, আবৃত্তি, বাউল গান ইত্যাদি।
