‘জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে কেউ মিথ্যা কথা বলে না। এ সময় মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তির চাওয়া-পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকে না। যা বলে তার পুরোটাই সত্য। মৃত্যুর আগ মুহূর্তে হাসপাতালে এসআই শাহজাহান নিজেই বলে গেছেন তাকে পরিকল্পিতভাবে বোমা বিস্ফোরণ ও আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। এ কাজটি করেছেন থানার ওসি নূর মোহাম্মদ বেপারী ও সেকেন্ড অফিসার বিনয়কৃষ্ণ ধর। কথাগুলো নারায়ণগঞ্জ বন্দর থানায় রহস্যজনক বিস্ফোরণে নিহত সাব-ইন্সপেক্টর শাহজাহান আলীর ছোট ভাই মোহাম্মদ রঞ্জু আহমেদের। তিনি বলেন, তার বড় ভাই কখনও মদ স্পর্শ করেননি। অথচ বলা হচ্ছে শাহজাহান মদ খেয়েছিলেন। একই দাবি জানিয়েছেন নিহতের স্ত্রী লায়না বেগম।
এদিকে বৃহস্পতিবার এসআই শাহজাহানের ময়না তদন্ত রিপোর্ট থানায় পৌঁছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, এস আই শাহজাহান আগুনে পুড়ে শরীরে ঘা হয়ে রক্ত দূষিত হওয়ার কারণে মারা গেছেন। ঐ সময় নিহতের রক্ত ছিল অনেক বিষাক্ত। তার পাকস্থলিতে পাওয়া গেছে এ্যালকোহলের অস্তিত্ব।
অপরদিকে শাহজাহানের মৃত্যু ঘটনায় দায়েরকৃত (অপমৃত্যু মামলা) মামলার তদন্ত জেলা গোয়েন্দা দফতরে ন্যস্ত হয়েছে। মামলার নতুন তদন্ত কর্মকর্তা ইন্সপেক্টর দেলোয়ার হোসেন কাগজপত্র বুঝে কাজ শুরু করেছেন। পাশাপাশি উচ্চতর তদন্ত কাজ শুরু হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার নাজমুল আলম জানিয়েছেন, ময়না তদন্ত রিপোর্ট পাওয়া গেছে। তবে সিআইডি ও বিস্ফোরক অধিদফতের রিপোর্ট পাওয়ার পরই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব হবে আসলে কী ঘটেছিল। তিনি বলেন, যেহেতু এসআই শাহজাহানের মৃত্যু নিয়ে বির্তক তৈরি হয়েছে, এ কারণেই মামলা ডিবিতে ন্যস্ত করা হয়েছে। ঘটনা তদন্তে গঠিত হয়েছে উচ্চতর তদন্ত কমিটি।
ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মাহফুজুল হক নুরুজ্জামান বলেন, প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। নিহত শাহজাহানের পরিবারের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, তদন্তে যদি কোন গাফিলতি থাকে তবে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। তদন্ত কমিটি, তদন্ত কর্মকর্তার রিপোর্ট, আলামত সংক্রান্ত রিপোর্ট পাওয়ার পরই নিশ্চিত করে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে বলা সম্ভব হবে। নিহতের পরিবারের অভিযোগ যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
গত ১৩ ডিসেম্বর রাত ১১টার দিকে নারায়ণগঞ্জ বন্দর থানা ক্যাম্পাসে অগ্নিদগ্ধ হন এসআই শাহজাহান। চারদিন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে গত ১৭ ডিসেম্বর তিনি মারা যান। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা করেছে।
অপরদিকে নিহতের স্ত্রী গত ২৩ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জের আদালতে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় তিনি ওসিসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে আসামি করেছেন। তবে আদালত মামলাটি আমলে না নিয়ে অপমৃত্যুর মামলার রিপোর্ট পেশ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
মৃত্যুকালীন জবানবন্দি: শাহজাহানের ভাই ও স্ত্রীর জানিয়েছেন, মৃত্যুর আগে তিনি হত্যার কথা বলেছেন, যা রেকর্ড ও ভিডিও করে রাখা আছে। শাহজাহান জানিয়েছেন, ‘হঠাত্ দেখি দুইটি ছেলে দ্রুত এগিয়ে আসছে। এ সময় দুইটি হাত ছিল পিছনের দিকে।। এরপর প্যান্টের পকেট থেকে বের করে কী যেন একটা ছুঁড়ে মারে। আমার শরীরে আগুন ধরে যায়। আমি চিত্কার করে বলি আমাকে বাঁঁচাও। ওসি সাহেবের সঙ্গে ঝামেলা লাগছিল। মালখানার কিছু মাল যাবে কোর্টে। আমি খবর পাই বাবুর্চিকে দিয়ে মাল বের করানো হচ্ছে। আমি তখন ওসিকে বলি, ওস্তাদ অসত্ উপায়ে কোনো কাজকর্ম করতে পারবেন না। আমি এটা করতে দেব না ।’
প্রথম তদন্ত কমিটি: ঘটনার পরপরই অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাজ্জাদুর রহমানকে আহ্বায়ক করে জেলা পুলিশ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির রিপোর্টে বলা হয়, এস আই শাহজাহান মদ্যপ অবস্থায় আগুনে পড়ে গিয়ে মারা যায়। এটি একটি দুর্ঘটনা। তবে নিহতের পরিবার তদন্ত কমিটির দেয়া প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা বলেছে, হত্যাকাণ্ডকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার জন্য পুলিশের একটি বিশেষ মহল নানাভাবে নিহত শাহজাহানের নামে অপবাদ চালিয়ে যাচ্ছে।
কে এই শাহজাহান:টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর উপজেলার ৫ নং বানাইল ইউনিয়নের পাঁচ চামারি গ্রামের মোহাম্মদ আলীর পুত্র শাহজাহান। চার ভাই এক বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। তিনি ১৯৮৪ সালে কনস্টেবল পদে পুলিশ বাহিনীতে যোগদান করেন। পরবর্তীতে তিনি পদোন্নতি পেয়ে সাব-ইন্সপেক্টর হন। ২০০২ সালে বীরত্ব ও সাহসী কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ রাষ্ট্রপতি পদক পান (পিপিএম)। ২০১১ সালের ১২ ডিসেম্বর তিনি নারায়ণগঞ্জ বন্দর থানায় যোগদান করেন। এর আগে তিনি দায়িত্ব পালন করেন রাজধানীর সূত্রাপুর, পল্লবী, মিরপুর, রমনা, খিলক্ষেত ও ধানমন্ডি থানায়। বন্দর থানা ক্যাম্পাসে একাই থাকতেন।
