বিদায়ী ২০১২ সাল ছিল দেশের নারীদের জন্য আলোচিত ও একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। বছরজুড়ে যেমন ছিল নারীর সাফল্য নিয়ে সরব আলোচনা, তেমনি ছিল নারীর প্রতি সহিংসতারও খবর। তবে সহিংসতা নারীর অর্জনকে কোন ভাবেই ম্লান করতে পারেনি। বছরের শুরুর দিকে পর পর দুইজন নারীর পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেষ্ট জয়ের খবর দেশব্যাপী আলোড়ন তোলে। এশিয়ার নোবেল হিসাবে খ্যাত ফিলিপাইনের ‘র্যামন ম্যাগসেসে’ পুরস্কার লাভ করেন একজন নারী আইনজীবী। এছাড়া বিগত বছরে জেএসসি থেকে বিসিএস পরীক্ষায় ভালো ফলাফল ও মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন মেয়েরা। এমনকি এসব পরীক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণের হারও ছিল বেশি।
কিন্তু এতোসব কাঙ্ক্ষিত সাফল্যের পরেও বদলায়নি নারীর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি। বন্ধ হয়নি নারীর প্রতি নির্যাতন ও সহিংসতা। ধর্ষণ, হত্যা, ফতোয়া, এসিড নিক্ষেপ ও আগুনে পুড়িয়ে মারার মতো ঘটনা ছিল বছরজুড়েই। ছিল আদালত পাড়ায় নারীর শ্লীলতাহানি ও থানা কোয়ার্টারে যৌন হয়রানির চেষ্টা এবং পুলিশের প্ররোচনায় কিশোরির আত্মহননের মতো দুঃখজনক খবর।
মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ ও ‘বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ’ এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১২ মাসে বিভিন্ন সহিংসতার শিকার হয়েছেন পাঁচ হাজার ৬১৬ জন নারী। এর মধ্যে উত্ত্যক্ত করা হয়েছে ৬৪৫ জনকে, এসিড সহিংসতার শিকার হয়েছেন ৯৭ জন, যৌতুক সহিংসতার শিকার ৭৭১ জন, ধর্ষণের শিকার ৭৬০ জন এবং যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন ৪৫৯ জন নারী। এছাড়া ফতোয়ায় শিকার হয়েছেন ৪৪ জন এবং যৌতুকের কারণে হত্যা করা হয়েছে ২৯৫ জনকে। অন্যদিকে ২০১০ ও ২০১১ সালে নারীদের জন্যে বেশ কয়েকটি নীতিমালা সরকার চূড়ান্ত করলেও তা গত এক বছরে বাস্তবায়ন করা হয়নি। ২০১২ সালে হিন্দু নারীদের জন্যে ‘হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন আইন’ করা হলেও তা ঐচ্ছিক রাখা হয়েছে।
নারীর প্রাপ্তি :হত্যা, এসিড নিক্ষেপ, ফতোয়া, যৌন হয়রানির পরেও থেমে নেই নারীর এগিয়ে চলা। এ বছর পদে পদে মিলেছে নারীর সাফল্য; অর্জিত হয়েছে কাঙ্ক্ষিত প্রাপ্তি। প্রতিবছরের মতো ২০১২ সালেও নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার জন্ম-মৃত্যু দিন ‘রোকেয়া দিবস’ উপলক্ষে দু’জন নারীকে দেয়া হয় ‘রোকেয়া পদক’। এদের একজন সৈয়দা জেবুন্নেসা হক। রাজনীতিতে বিশেষ অবদান রাখান জন্যে তিনি এই পদকে ভূষিত হন। অন্যজন অধ্যাপিকা মাহফুজা খানম, শিক্ষা বিষয়ে বিশেষ অবদান রাখার জন্য তাকে রোকেয়া পদক দেয়া হয়।
গত বছর ১৯ মে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেষ্ট জয় করার কৃতিত্ব অর্জন করেন নিশাত মজুমদার। প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসেবে তিনি এই গৌরব অর্জন করেন। সপ্তাহখানেকের মাথায় অর্থাত্ ২৬ মে দ্বিতীয় নারী ওয়াসফিয়া নাজনীন পৃথিবীর এই সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ জয় করার কৃতিত্ব অর্জন করেন। এর পূর্বে ২০১১ সালে সেভেন সামিট (সাত মহাদেশের সাতটি শীর্ষ পবর্তচূড়া) জয় করার গৌরব অর্জন করেছিলেন বাংলাদেশের মেয়ে ওয়াসফিয়া। ওই বছর তিনি দুই মহাদেশের দুটি শীর্ষ চূড়াও জয় করেন।
নারীর সাফল্যে আরেকটি অর্জন বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রথম নারী ডেপুটি গভর্নর নিযুক্ত হন নাজনীন সুলতানা। এর আগে তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রথম নারী মহাব্যবস্থাপক ও প্রথম নারী নির্বাহী পরিচালক হিসেবে কাজ করার কৃতিত্ব অর্জন করেন। নাজনীন সুলতানা বাংলাদেশ ব্যাংকে কম্পিউটার উপবিভাগে প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন।
গত বছর এশিয়ার নোবেল হিসেবে খ্যাত ফিলিপাইনের র্যামন ম্যাগসেসে অ্যাওয়ার্ড পান সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি’র (বেলা) নির্বাহী পরিচালক হিসেবে ভূমিদস্যু ও জাহাজ ভাঙ্গা শিল্পের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই করেন তিনি। বছরের শেষদিকে ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার আবিদা সুলতানা ‘আইএডব্লিউপি-২০১২ ইন্টারন্যাশনাল স্কলারশিপ অ্যান্ড রিকগনিশন’ পুরস্কার লাভ করেন। কানাডার নিউফাউন্ডল্যান্ডে এসটি জোনস শহরে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব উইমেন পুলিশের ৫০তম বার্ষিক সম্মেলনে তাকে এই পুরস্কার দেয়া হয়। তিনি এর আগে বাংলাদেশের প্রথম নারী পুলিশ ইউনিট-১১ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক ছিলেন।
গত বছরের আরেক বিস্ময়ের নাম ফারহানা জাহান। যিনি ৩১তম বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নিয়ে এক লাখ ৬৪ হাজার ১৬৭ জন পরীক্ষার্থীকে পেছনে ফেলে প্রথম স্থান অর্জন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ থেকে পাস করা ফারহানা শিগগিরই যোগ দেবেন বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে। এছাড়া বাংলাদেশের মেয়ে শিঞ্জিনী সাহা আন্তর্জাতিক পদার্থ বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে প্রথমবারের মতো অর্জন করেছেন ব্রোঞ্জপদক। ২০১২ সালের ২৩ জুলাই এস্তোনিয়ায় অনুষ্ঠিত ৪৩তম আন্তর্জাতিক পদার্থবিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে ৮০টিরও বেশি দেশের প্রতিযোগীদের সঙ্গে লড়াই করে শিঞ্জিনী এই জয় ছিনিয়ে নেন। অন্যদিকে অঞ্জলি সরকার গত নভেম্বরে ইউনেসকো ও জাপানের গোই পিস ফাউন্ডেশন আয়োজিত এক প্রতিযোগিতায় ‘কাউন্টিং দ্য আনকাউন্টেবল’ শীর্ষক রচনার জন্য এক লাখ ইয়েন মূল্যমানের পুরস্কার লাভ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর শিক্ষার্থী অঞ্জলি ২০১২ সালে তুরস্ক, হংকং ও নেদারল্যান্ডস ভ্রমণ করেছেন উদ্যোক্তা বিষয়ক প্রশিক্ষণ নিতে।
২০১২ সালের ৩০ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের স্নাতক (সম্মান) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ডিন সম্মাননা পদক ও ডিন পদক পেয়েছেন ১৩ জন। এর মধ্যে ১০ জন নারী মেধার স্বাক্ষর রেখে অর্জন করেন এই পদক। এরা হলেন তাওহিদা জাহান (ভাষা বিজ্ঞান), সৈয়দা ইফাত আরা (নাট্যকলা বিভাগ), সিরাজুম মুনীরা (ইসলামীশিক্ষা), শামিমা নাসরীন (উর্দু), শারমিন নাহার (ফারসি ভাষা ও সাহিত্য), সোমা দে (সংস্কৃত), জাফরিন রেজওয়ানা (ইতিহাস), তানজিনা মেনোজ (দর্শন), নাজমা (ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি) ও শামিমা ইয়াসমিন (তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা)।
গত বছর বাংলাদেশের ফেনী জেলার মেয়ে সুমাইয়া গাজী বিশ্বের অন্যতম সেরা প্রভাবশালী ৫০ তরুণ উদ্যোক্তার মধ্যে স্থান করে নিয়েছেন। অনলাইনভিত্তিক ম্যাগাজিন দ্য দেশি কানেক্ট, দ্য মিডলইস্ট কানেক্ট, দ্য লাতিন কানেক্ট ও দ্য আফ্রিকান কানেক্ট পরিচালনার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি এই খ্যাতি অর্জন করেন। এ ছাড়া সুমাইয়া ‘সুমাজি ডট কম’ নামের একটি সোশ্যাল নেটওয়ার্কও পরিচালনা করেন।
বিনা বেতনে কঠোর পরিশ্রম করে বন বিভাগের বিশাল সংরক্ষিত বনাঞ্চল রক্ষা, বন্য প্রাণীসহ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং পরিবেশ রক্ষায় বিশেষ ভূমিকা রাখার জন্য প্রথম ‘ওয়াংগারি মাথাই’ পুরস্কার অর্জন করেছেন খুরশিদা বেগম। কক্সবাজার জেলার টেকনাফের কেরোনতলী গ্রামের মেয়ে খুরশিদা। ২০১১ সালে কেনিয়ার নোবেলজয়ী পরিবেশবিদ ‘ওয়াংগারি মাথাই’ মারা যান। তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে জাতিসংঘের বন ও পরিবেশবিষয়ক বিভিন্ন সংস্থার উদ্যোগে ‘দ্য কোলাবরেটিভ পার্টনারশিপ অব ফরেস্ট (সিপিএফ)’ পুরস্কারটি চালু করা হয়। তিনি ২০০৪ সালে টেকনাফ নিসর্গ বনরক্ষা সহব্যবস্থাপনা কমিটিতে যোগদান করেন। এরপর তিনি ২৮ জন নারীকে সঙ্গে নিয়ে কেরোনতলী মহিলা বন পাহারা দল গড়ে তোলেন।
জাতীয় পরিবেশ অলিম্পিয়াড-২০১২-তে ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্য চ্যাম্পিয়নস’ হওয়ার গৌরব অর্জন করেন মারুফা ইসহাক। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের শিক্ষার্থী। তিনি নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে দোহায় অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলনে অংশ নেন। এ ছাড়া ২৫-২৯ সেপ্টেম্বর কাঠমান্ডুর ‘এশিয়া প্যাসিফিক গ্র্যাজুয়েটস ফোরাম’ এবং ৫-৮ জুন চীনের সাংহাইয়ে অনুষ্ঠিত পরিবেশবিষয়ক আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী সম্মেলনে অংশ নেন।
শিক্ষা ক্ষেত্রে গতবছর নারীদের সাফল্য ছিল ঈর্ষণীয়। ২০১২ সালের প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিএসসি) ও জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় (জেএসসি) জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হওয়ার দিক থেকে সারা দেশে মেয়েরা ছিল এগিয়ে। এমনকি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও ছেলেদের থেকে মেয়েদের সংখ্যা ছিল বেশি।
নারীর জন্য সরকারি উদ্যোগ: ২০১২-১৩ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ১০০ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ রাখা হয়। যা নারীদের জন্যে একটি সুখবর। নারী উদ্যোক্তাদের জন্যে আরেকটি বড় সুখবর হচ্ছে, ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বন্ধকবিহীনভাবে ঋণ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে এ বাজেটে। এছাড়া নারী উদ্যোক্তাদের পণ্য বিক্রয়ের জন্য সুনির্দিষ্ট স্থান, আলাদা তথ্য সংগ্রহের স্থান, উদ্যোক্তাদের তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ খাত নির্দিষ্ট করা ও প্রতিটি ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য নির্দিষ্ট ডেস্ক স্থাপনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
গত বছরের সেপ্টেম্বর মাস থেকে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটির পরিপত্র জারি করেছে সরকার। শিক্ষক বা নারী কর্মী তার কর্মজীবনে সর্বোচ্চ দুইবার এ ছুটি পাবেন। গর্ভধারণের পরে ওই নারী কর্মী যেদিন থেকে ছুটির আবেদন করবেন, সেদিন থেকেই তাকে তার প্রাপ্য ছয় মাস ছুটি দিতে হবে। দুই বছর আগে সরকারি প্রতিষ্ঠানের নারী কর্মীদের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাস করা হয়েছে। এছাড়া মাতৃত্বকালীন ভাতা বৃদ্ধি, কর্মজীবী ল্যাকটেটিং মাদার সহায়তা তহবিল, ভিজিডি, দারিদ্র্য বিমোচন ঋণ প্রদান ও নির্যাতিত দুঃস্থ মহিলা ও শিশু কল্যাণ তহবিলসহ গত বছর আরো বেশ কিছু সফল উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার।
নারী শ্রমিকের মৃত্যু: বছর শেষের দিকে সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা ছিল আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে তাজরীন ফ্যাশনস লিমিটেডে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। ২৪ নভেম্বর সন্ধ্যায় অগ্নিকাণ্ডের শুরু হয়। পরদিন ভোর পাঁচটার দিকে আগুন নেভানো সম্ভব হয়। আগুনের ভয়াবহতায় প্রাণ হারান ১২৪ জন শ্রমিক। এদের বেশির ভাগই নারী শ্রমিক। দেশে পোশাক শিল্পের ইতিহাসে এটিই ছিল সবচেয়ে বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। যার প্রেক্ষিতে ২৭ নভেম্বর দেশে এক দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করে সরকার।
