‘বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না’- বহুল ব্যবহূত এই প্রবাদ বাক্যটিই এখন যেন সবচেয়ে বেশি প্রযোজ্য আওয়ামী লীগের চার জ্যেষ্ঠ নেতা আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ও আব্দুল জলিলের ক্ষেত্রে। অভিমানে চারজনেরই কণ্ঠ ভারী। ২৯ ডিসেম্বর কাউন্সিল শেষে গত বুধবার আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা হওয়ার পর থেকেই বলতে গেলে তারা নীরব। কমিটি সম্পর্কে মুখ খুলতে চান না, করতে চান না তেমন কোনো মন্তব্য। ‘খুব ভালো কমিটি হয়েছে’, ‘নতুন কমিটির সাফল্য কামনা করি’- মুখে এরকম কিছু স্বল্প বাক্যের মন্তব্য করলেও এর অন্তরালে বাজছে অভিমানের সুর, না বলার মধ্য দিয়েই বলছেন অনেক কথা।
বুধবার কমিটি ঘোষণার পর এ নিয়ে বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে বেসরকারি টিভি চ্যানেল বাংলা ভিশনে সরাসরি সম্প্রচারিত সংবাদ পর্যালোচনামূলক ‘নিউজ অ্যান্ড ভিউজ’ অনুষ্ঠানে টেলিফোনে প্রথমবারের মতো কিছু কথা বলেছেন ’৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম নায়ক তোফায়েল আহমেদ। তিনি বলেছেন, ‘ছাত্র ইউনিয়ন, কমিউনিস্ট পার্টি ও ন্যাপ থেকে আওয়ামী লীগে যারা এসেছেন তারা হয়তো এখন তাদের চরিত্র, নীতি-আদর্শ পরিবর্তন করে আওয়ামী লীগের আদর্শে বিশ্বাসী। তারা খুবই আদর্শের। আমি সারাজীবন একটি দলই করছি। এজন্য আমরা হয়তো নিকৃষ্ট, সুবিধাবাদী। তারপরেও বঙ্গবন্ধু কন্যা, জননেত্রী শেখ হাসিনা আমাকে উপদেষ্টা পরিষদে রেখেছেন। তিনি (শেখ হাসিনা) চাইলে তো আমাকে বাদ-ই দিতে পারতেন, তা না করে উপদেষ্টা পরিষদে রেখেছেন, এটা তার মহানুভবতা। তিনি যে কমিটি দিয়েছেন তা অত্যন্ত সুন্দর কমিটি।’
আওয়ামী লীগের এই প্রবীণ নেতা বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধুর স্নেহ-ভালোবাসায় আমার জীবন ধন্য। এই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনতার পক্ষ থেকে আমি জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দিতে পেরেছিলাম, অত্যন্ত অল্প বয়সে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব ছিলাম। এমপি হয়েছি, মন্ত্রীও হয়েছি। আমার আর চাওয়া-পাওয়ার কী আছে। বঙ্গবন্ধু সবসময় একটি কথা বলতেন-আওয়ামী লীগ নেতার দল নয়, আওয়ামী লীগ কর্মীর দল। আমি আওয়ামী লীগের কর্মী ছিলাম, আছি, থাকবো।’
বর্ষীয়ান রাজনীতিক তোফায়েল আহমেদ আরও বলেন, ‘ওয়ান ইলেভেনের সেই কঠিন দিনগুলোতে জিল্লুর রহমানের পাশে থেকে আমরা কাজ করেছি। যে কারণে আমার, আমার স্ত্রী ও মেয়ের নামে মামলা দেয়া হয়েছিল, আমার বিদেশে যাওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। সেসময় আজকের অনেককেই দেখা যায়নি। একসময়ের ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি নূহ-উল-আলম লেলিন প্রেসিডিয়ামের সদস্য হয়েছেন, এখন তিনি আমাদের নেতা, তার নেতৃত্বে আমাদের রাজনীতি করতে হবে, এটা তো নতুন বছরে আমাদের জন্য উপহার। ছাত্র ইউনিয়ন করা মতিয়া চৌধুরী, নূরুল ইসলাম নাহিদ, আব্দুল মান্নান খান-তারাও মন্ত্রী, তাতে কী হয়েছে।’ গতকাল শুক্রবারও একটি বেসরকারি রেডিওকে তিনি বলেছেন, ‘দুনিয়ার রঙ্গমঞ্চে কত কিছুই হয়।’ আরও বিস্তারিত প্রতিক্রিয়ার জন্য গতকাল তোফায়েল আহমদের সঙ্গে যোগাযোগের বারবার চেষ্টা করলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
অপরদিকে, আওয়ামী লীগের আরেক প্রবীণ নেতা আমির হোসেন আমু গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘নেত্রী যা ভালো মনে করেছেন সেটিই করেছেন। কমিটি নিয়ে আমার কোনো মন্তব্য নেই। এ নিয়ে আমার বলার কিছু নেই।’ একটি সভায় উপস্থিত থাকার কথা বলে এর বেশি কিছু বলতে তিনি রাজি হননি।
অবশ্য গতকাল ইত্তেফাকের সঙ্গে কথা বলেছেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। তিনি বললেন, ‘প্রেসিডিয়ামে না রাখলে কী করবো। কাউন্সিল নেত্রীকে ক্ষমতা দিয়েছে, তিনি যেটা ভালো মনে করেছেন সেটিই করেছেন। আমাকে যেখানে রাখা হয়েছে সেখানে থেকেই দলের জন্য ভূমিকা রাখার চেষ্টা করবো। আর আওয়ামী লীগে বামদের প্রাধান্য নিয়ে যেসব কথা বলা হচ্ছে তা তো সবাই দেখছেন, সবাই দেখছে মন্ত্রিসভায় কারা। এনিয়ে আমি আর কী বলতে পারি।’
আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের এই সদস্য আরও বলেন, ‘নতুন কমিটিতে প্রেসিডিয়ামে যারা স্থান পেয়েছেন তাদের জন্য আমার শুভকামনা থাকলো। দল ও সরকারের সামনে যে চ্যালেঞ্জগুলো রয়েছে সেগুলো তারা শেষ করুক, তা আমি যেমন চাই তেমনি জাতিও চায়। সেখানে আমার মতো ছোট মানুষের পক্ষে যতটুকু সম্ভব করার তা করবো।’
আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল দলের কমিটি সম্পর্কে ইত্তেফাককে গতকাল বলেন, ‘কমিটি হয়েছে, ভালোই তো হয়েছে। খারাপ কী। বামদের কমিটি, না কাদের কমিটি তা কর্মীরাই মূল্যায়ন করবেন। তাছাড়া কার কী যোগ্যতা তা তাদের কাজের মধ্য দিয়েই প্রমাণ হবে। আমি একটি দল করি, শেখ হাসিনা আমার সভানেত্রী, এর বেশি তো আমার কিছু বলা ঠিক নয়।’
দলের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরাম প্রেসিডিয়ামে আবারও স্থান না পাওয়ায় এই চার নেতাকে নিয়ে শুধু আওয়ামী লীগেই নয়, তাদের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপিসহ সমগ্র রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা হচ্ছে। আলোচনা চলছে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে এবং মহাজোট সরকারের মন্ত্রিসভায় একসময়ের বামপন্থী শীর্ষ নেতাদের প্রাধান্য পাওয়ার বিষয়টি নিয়েও। ২০০৯ সালে অনুষ্ঠিত কাউন্সিলের পর আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ও আব্দুল জলিলকে প্রেসিডিয়াম থেকে সরিয়ে স্থান দেয়া হয় অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা পরিষদে। সদস্য হলেও এই পর্যন্ত উপদেষ্টা পরিষদের কোনো বৈঠকেই যোগ দেননি তোফায়েল আহমেদ। কারও কারও ধারণা ছিল, এবারের কাউন্সিলের পর এই চারজনের কাউকে কাউকে হয়তো প্রেসিডিয়ামে ফিরিয়ে আনা হবে। কিন্তু তা এখনও হয়নি, আবারও তাদের উপদেষ্টা পরিষদেই রাখা হয়েছে।
