সময় এখন কৃষকের পাশে দাঁড়ানোর

আপডেট : ০৫ জানুয়ারি ২০১৩, ১৯:৫৯
বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেল বলেছিলেন-“মৃত্যুর পর স্মৃতিসৌধ হিসেবে মর্যাদা লাভের চেয়ে বেঁচে থাকার জন্য উদরের চাহিদা পূরণে যত্নবান হওয়াকে শ্রেয়তর মনে করি।” জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সাবেক মহাপরিচালক লর্ড জন বয়ড তার নোবেল শান্তি পুরস্কারের বক্তৃতায় যথার্থই বলেছিলেন- “ক্ষুধার্ত পেটে তুমি কখনো শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না”। গ্রামের একটি কৃষক পরিবারের কথা বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটা ছোট ঘর, দু’বিঘা হালের জমি, দুটো হালের গরু, চারটি মোরগ-মুরগি, দুটো হাঁস, একটা ছোট পুকুর। এগুলোর উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে গোটা কৃষক পরিবার ও আমাদের দেশের জাতীয় অর্থনীতি। অথচ কৃষক পরিবারের তেমন কোনো ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটেনি। প্রতিবছর লোকসানের ঘানি টানতে টানতে অনেক সময় হালের জমি ও গরুটিও হারাচ্ছে। তারপরও তারা উত্পাদন করেই যাচ্ছে কারণ তাদের বিকল্প আর কোনো পথ নেই। একবিংশ শতাব্দীর প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে কৃষির কোনো বিকল্প নেই। বর্তমান পৃথিবীতে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ লোক কৃষি কাজে নিয়োজিত। আমাদের দেশের প্রায় ৭০ ভাগ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষি কাজের সাথে জড়িত। কাজেই কৃষিক্ষেত্রে উন্নয়ন সাধন করতে হলে আমাদের মূল লক্ষ্যকে কেন্দ্রীভূত করতে হবে কৃষকের প্রতি। এক কথায় সবদিক থেকে কৃষক পরিবারের উন্নয়ন করতে হবে। এ জন্য সময়মত কৃষকের প্রয়োজন উন্নতজাতের বীজ, রাসায়নিক সার, পানিসেচের যন্ত্রপাতি, ডিজেল, বিদ্যুত্, উন্নত ফসল রক্ষার ব্যবস্থা, সুদমুক্ত কৃষি ঋণ ইত্যাদি। প্রতিশ্রুতির ফুলঝুড়ি শুনতে শুনতে কৃষকসমাজ এখন ক্লান্ত। প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নের সময় এখন গড়িয়ে যাচ্ছে। ভাগ্যের চাকা স্থবির হয়ে পড়েছে আমাদের অর্থনীতির প্রধান কারিগরদের। বাংলাদেশ ২০২১ সালে তার সুবর্ণ জয়ন্তী পালন করবে তখন আমাদের কৃষি ব্যবস্থা কোন পথে যাবে তা বলাবাহুল্য। কেননা ২০২১ সালে আমাদের আরো প্রায় ১৮ লক্ষ হেক্টর আবাদি জমি হ্রাস পাবে এবং জনসংখ্যা হবে প্রায় ২৫ কোটি। এ বিশাল জনগোষ্ঠিকে বাঁচাতে হলে আমাদের খাদ্য নিয়ে আরো ভাবতে হবে। দেশে গত ২০ বছরে কৃষি জমি কমেছে ৫০ লাখ একর। অপরিকল্পিত বসতি স্থাপন, নগরায়ন ও শিল্পায়নের কারণে প্রতিদিন গড়ে ২২০ একর কৃষি জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। অধিকাংশ নদ-নদী নাব্যতা হারিয়েছে এবং ভূ-গর্ভস্থ পানিতল ক্রমশ নিচে নামছে। কৃষি জমিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ আশংকাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। পোল্ট্রি, লাইভস্টক এবং মত্স্য চাষে এন্টিবায়োটিক, হরমোন ও বৃদ্ধিকারকের যথেচ্ছ ব্যবহার পরিবেশ ও মানব স্বাস্থ্যকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলছে। লবণাক্ততা ও আর্সেনিক বিষাক্ততা জমির উত্পাদন ক্ষমতা কমাচ্ছে। বর্তমান প্রচলিত প্রযুক্তি প্রয়োগে দানা শস্যের ফলন বাড়ছে না। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার খাদ্য উত্পাদন বৃদ্ধির হারকে ছাড়িয়ে গেছে। এসব সকল সমস্যা সমাধানের জন্য চাই জ্ঞান-নির্ভর ও টেকসই প্রযুক্তির উদ্ভাবন, যা পরিবেশবান্ধব এবং অনেক দক্ষ। প্রয়োজন দূরদর্শী পরিকল্পনা, যেন সমস্যাভিত্তিক ধারাবাহিক গবেষণায় কৃষিতে প্রযুক্তিগত ও জ্ঞানের নিরবচ্ছিন্ন উন্নয়ন হয়। শুধুমাত্র ধানের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে শস্য চাষে বৈচিত্র্য আনয়ন, পরিবেশ ও জমির উর্বরতা সংরক্ষণ করতে পারলে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি অনেকটা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। একই সাথে আমাদের খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন নিয়ে আসা জরুরি। এক হিসেবে দেখা যায় যে, এদেশে এক টাকা গবেষণা ব্যয়ে তিন টাকা ফেরত আসে। সুতরাং কৃষি গবেষণায় বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন। মৌলিক ও ফলিত গবেষণার মাধ্যমে পরিবেশসম্মত, লাগসই, সস্তা জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত ঘাতসহনশীল ফসল, মত্স্য ও পশুপাখি জাত উন্নয়ন দরকার। কৃষির সার্বিক উন্নয়নে চাষাবাদ ছাড়াও পোল্ট্রি খাত, পশুপালন ও দুগ্ধ উত্পাদন প্রভৃতির দিকে বেশি মনযোগী হতে হবে এবং কাঙ্খিত ফলাফল অর্জনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আমাদের দেশে যে প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে, তাতে এভাবে সমষ্ঠিগত উন্নয়নের প্রচেষ্টাই দেশকে আস্তে আস্তে এগিয়ে নিয়ে যাবে সমৃদ্ধির দিকে। আমরা প্রত্যাশা করছি কৃষিবান্ধব সরকার কৃষি খাতে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে কৃষি ও কৃষকের দিন বদলের অংশীদার হবেন।