চলছে মেঘনা দাউদকান্দি সেতু মেরামত বিকল্প পথে যাত্রীদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ

আপডেট : ০৫ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:১১
গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে মেঘনা ও দাউদকান্দি সেতুর প্রথম পর্যায়ের মেরামত কাজ পুরোদমে এগিয়ে চলছে। তবে সেতু দুইটি বন্ধ থাকায় মহাসড়কে চলাচলকারী যাত্রীরা অবর্ণনীয় দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের যাত্রীদের এই সাময়িক ভোগান্তিতে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, পার্বত্য চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, নোয়াখালী অঞ্চলে যাতায়াতকারী সব যানবাহনই এখন ঢাকা-সিলেট রোড ব্যবহার করছে। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী যানবাহনগুলো কুমিল্ল¬া-ময়নামতি-ব্রাহ্মণবাড়িয়া-সরাইল বিশ্বরোডের মোড়-আশুগঞ্জ-ভৈরব-তারাবো মোড় (রূপগঞ্জ)-কাঁচপুর ব্রিজ-যাত্রাবাড়ী হয়ে ঢাকা পৌঁছাচ্ছে। একইভাবে চট্টগ্রামগামী যানবাহনগুলো কাঁচপুর ব্রিজ-তারাবো মোড় (রূপগঞ্জ)-নরসিংদী-ভৈরব-আশুগঞ্জ-সরাইল বিশ্বরোডের মোড়-ব্রাহ্মণবাড়িয়া-ময়নামতি হয়ে চট্টগ্রাম যাচ্ছে। সেতু বন্ধ থাকায় খুব জরুরি না হলে কেউ এখন এই রুটে যেতে চাইছেন না। তারপরও যারা নিরুপায় হয়ে বেরোচ্ছেন বিকল্প সড়কে তাদের গন্তব্যে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লাগছে। পরিবহন মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্বাভাবিকের তুলনায় তারা এ কয়দিন কম বাস চালাচ্ছেন। একই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে ট্রাক মালিকদের কাছ থেকেও। কিন্তু সড়কে যে পরিমাণ যান চলছে তাতেই যানজট বেঁধে যাচ্ছে। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় পৌঁছাতে একটি বাসের সাধারণভাবে ৬ থেকে ৮ ঘন্টা লাগে। কিন্তু এখন ১২ থেকে ১৪ ঘন্টা লাগছে। আবার সিলেট রোডে চট্টগ্রামের গাড়ি ঢুকে পড়ায় ঢাকা থেকে সিলেট অঞ্চলে যেতেও লাগছে বেশি সময়। সেতু দুইটির কাছাকাছি এলাকার মানুষ ট্রলারে নদী পার হয়ে বিভিন্ন যানবাহনে অনেক কষ্টে গন্তব্যে যাচ্ছেন। সেতু দুটি মেরামতকারী প্রকল্পের ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের উপ-পরিচালক লেঃ কর্নেল আনোয়ার উদ্দিন জানিয়েছেন, সেতু মেরামতের জন্য যে যন্ত্রপাতি ও জনবলের প্রয়োজন, তার সবই আছে। কাজও দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে। সড়ক ও জনপথ বিভাগের নারায়ণগঞ্জ জোনের প্রকৌশলী ফরিদ উদ্দিন আহমেদ গতকাল শনিবার ইত্তেফাককে বলেছেন, সেতু দুটির প্রথম পর্বের স্থায়ী মেরামতকালীন সময়ে মেঘনা সেতুতে চারটি ও দাউদকান্দি সেতুতে তিনটি এক্সপানশন জয়েন্ট প্রতিস্থাপন করার কথা রয়েছে। শনিবার দুপুর পর্যন্ত মেঘনা সেতুর চারটি পয়েন্টে ভাঙ্গার কাজ শেষ হয়েছে। অন্যদিকে দাউদকান্দি সেতুতে দুইটি পয়েন্টে ভাঙ্গার কাজ শেষ হয়েছে। ভাঙ্গা অংশগুলোতে ঢালাই করে হিঞ্জ বিয়ারিং বসিয়ে তার উপর এক্সপানশন জয়েন্টগুলো স্থাপন করা হবে। এই কাজ সন্ধ্যার দিকে শুরু হবে। ঢালাইয়ের কাজ শেষ হওয়ার পর ৪৮ ঘন্টা সময় দেয়া হবে তা জমাট বাঁধার জন্যে। ঢালাই যাতে দ্রুত জমাট বাঁধে সে জন্যে বিশেষ ধরনের সিমেন্ট রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রসঙ্গত, এই মেরামত কাজটি করছে সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের সদস্যরা। তাদের সরঞ্জাম দিয়ে সহায়তা করছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ। সওজ সূত্রে জানা গেছে, এক্সপানশন জয়েন্ট ও হিঞ্জ বিয়ারিংগুলো মালয়েশিয়ার হারকিউলাস কোম্পানি থেকে তৈরি করে আনা হয়েছে। সেই কোম্পানির বিশেষজ্ঞরাই এই প্রতিস্থাপন কাজ তদারকি করছে। যন্ত্রাংশগুলোর গ্যারান্টি ৮ থেকে ১০ বছর। মেঘনা সেতুতে এক্সপানশন জয়েন্টের সংখ্যা নয়টি। অন্যদিকে মেঘনা-গোমতি সেতুতে এক্সপানশন জয়েন্ট ১৩টি। পর্যায়ক্রমে এগুলোর সবই মেরামত করতে হবে। আমাদের দাউদকান্দি সংবাদদাতা মোঃ হাবিবুর রহমান হাবিব জানিয়েছেন, চান্দিনার পূর্বাঞ্চলের জনগণ ময়নামতি এবং বি-বাড়িয়া, ভৈরব হয়ে ট্রেন ও বাসযোগে ঢাকা পৌঁছলেও চান্দিনার পশ্চিম দিকের মানুষজন লোকাল বাস এবং সিএনজি চালিত ট্যাক্সিযোগে দাউদকান্দি ঘাটে আসছে। সেখান থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ মেঘনা-গোমতী (দাউদকান্দি) সেতু হেঁটে পাড়ি দিয়ে বাউশিয়া যাচ্ছে। বাউশিয়া ঘাট থেকে আবার লোকাল বাস বা সিএনজি চালিত ট্যাক্সিযোগে মেঘনা ঘাটে পৌঁছাচ্ছে। সেখান থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকাযোগে নদী পার হয়ে বাসযোগে ঢাকায় যাচ্ছে। একইভাবে ঢাকা থেকে মানুষ আসছে। জানা গেল শুধু শারীরিক কষ্ট নয়, স্বাভাবিক অবস্থার চাইতে অন্তত চার গুণ বেশি যাতায়াত ভাড়া গুণতে হচ্ছে মানুষকে। এদিকে পরিবহন সমস্যার কারণে দাউদকান্দি, চান্দিনা, মুরাদনগর, মতলব, কচুয়া, হোমনা, তিতাস ও মেঘনা উপজেলার হাটবাজারগুলোতে শাক সবজিসহ অন্যান্য মালামালের মূল্য বেড়ে গেছে। আমাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি জানিয়েছেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়কে মেঘনা দাউদকান্দি সেতু মেরামতের কারণে বিকল্প সড়ক হিসেবে ব্যবহূত ব্রাহ্মণবাড়িয়া-ময়নামতি সড়কে যানবাহনের চলাচলে তেমন বড় ধরনের অঘটন ঘটেনি। দুপুর দুইটায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া আশুগঞ্জ থেকে কসবাগামী দিগন্ত পরিবহনের একটি লোকাল বাস ওভারটেক করতে গিয়ে খাদে পড়ে যায়। এতে পাঁচজন সামান্য আহত হয়। এছাড়া কোন প্রকার দুর্ঘটনা ঘটেনি। আইন-শৃংখলা রক্ষাসহ নিরাপদে যানবাহন চলাচলের জন্য সড়কের ৭২টি পয়েন্টে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে ও ১৫টি মোবাইল টিম কাজ করছে। এই সড়কে যানবাহনের চাপ কিছুটা কমানোর লক্ষ্যে সিলেট থেকে কুমিল্লা ও চট্টগ্রামগামী যানবাহনগুলোকে বিকল্প পথে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলার চান্দুরা দিয়ে আখাউড়া ও কসবা হয়ে কুমিল্ল¬া ও চট্টগ্রাম পাঠানো হচ্ছে। মেরামত কাজ পরিদর্শন করলেন যোগাযোগমন্ত্রী যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি গতকাল দুপুরে মেঘনা সেতু মেরামত ও সংরক্ষণের কাজ সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। তিনি এ সময় সেতুর এক্সপানশন জয়েন্টস, হিঞ্জ বিয়ারিং ও স্কাউর প্রটেকশনের কাজ দেখেন। মেরামত কাজের প্রকল্প পরিচালক কর্নেল মোঃ সাজ্জাদ হোসেন সেতুর মেরামত কাজ সম্পর্কে যোগাযোগমন্ত্রীকে অবহিত করেন। যোগাযোগমন্ত্রী এ সময়ে সাংবাদিকদের জানান, সেতু মেরামত ও সংরক্ষণের কাজ সম্পন্ন হলে আগামী দশ বছর সেতুটি ঝুঁকিমুক্ত থাকবে। মন্ত্রী জাতীয় স্বার্থে সেতু মেরামতের প্রথম পর্বে ৮ জানুয়ারি সকাল ৬টা পর্যন্ত ধৈর্য ধরে বিকল্প সড়ক, রেল ও নৌপথ ব্যবহারের জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি জনগণের সাময়িক ভোগান্তিতে দুঃখ প্রকাশ করে সকলের সহযোগিতা কামনা করেন।