পুলিশের গুলি নিয়ে ‘বাণিজ্য’ নিয়ন্ত্রণ করতো খোদ পুলিশ বাহিনীর দশ সদস্য। পুলিশ এ চক্রের ৯ জন গ্রেফতার হয়ে কারাগারে রয়েছে। তবে প্রধান হোতা সুবেদার নান্টু চাকমা পালিয়েছে। গত ১৯ ডিসেম্বর নান্টু চাকমাসহ ৪ জন আসামি করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ আদালতে চার্জশিট দাখিল করে। অপর ৬ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিলের প্রস্তুতি শেষ পর্যায়। গ্রেফতার হয়ে কারাগারে রয়েছেন পুলিশের নায়েক জেনাল চাকমা, প্রেম চাকমা, মাসুদ মিয়া, কনস্টেবল আব্দুল সায়েম, এএসআই জাহিদ হাসান, নায়েক মাহাম্মদ সামছু, শাহদাত হোসেন, আরিফুল ইসলাম ও মনির হোসেন। এরা রাজারবাগসহ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে কর্মরত ছিল। মামলা তদন্তে সংশ্লিষ্ট একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই দশজন মিলেই গুলি বাণিজ্য চালাচ্ছিল। তবে আরো কেউ এরসঙ্গে জড়িত রয়েছে কিনা তা নান্টু চাকমা গ্রেফতার হলে নিশ্চিত হওয়া যাবে। নান্টুকে গ্রেফতারের চেস্টা অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু তার সর্বশেষ অবস্থান নিশ্চিত করা যায়নি। ঘটনার সময় নান্টু চাকমার কর্মস্থল ছিল রাঙ্গামাটি। কিন্তু নান্টু ছিল ছুটিতে। গ্রেফতারকৃতরাও জানিয়েছে, গুলি সংগ্রহ করা এবং ‘গন্তব্যস্থলে’ কাছে পৌঁছানোরও দায়িত্ব ছিল নান্টুর ওপর।
গত বছরের ২৬ অক্টোবর কাফরুলের একটি বাসা থেকে ৫০০ রাউন্ড গুলিসহ জেনাল চাকমা ও প্রেম চাকমাকে গ্রেফতার করে। তাদের দেয়া তথ্য মতে ২৯ অক্টোবর গ্রেফতার হয় মাসুদ মিয়া। এনিয়ে কাফরুল থানায় মামলা দায়ের করা হয়। এরপরই বেড়িয়ে পড়তে থাকে পুলিশের গুলি বাণিজ্যের কথা। এরই ধারাবাহিকতায় ৩০ অক্টোবর রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স থেকে একটি অবৈধ রিভলবার, একটি ম্যাগাজিন ও এক হাজার ১০০টি গুলি উদ্ধার করেছে কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় পল্টন থানায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করে।
কাফরুল থানায় গুলি উদ্ধারের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিদর্শক মাইনুল ইসলাম বলেন, গত বছর ১৯ ডিসেম্বর অস্ত্র আইনের ১৯-এ ধারায় প্রেম চাকমা, নান্টু চাকমা, মাসুদ মিয়াকে আসামি করে তিনি মহানগর হাকিমের আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। ২০ ডিসেম্বর আদালত তা গ্রহণ করে।
চার্জশিটে বলা হয়, ময়মনসিংহে ডিবিতে কর্মরত নায়েক মাসুদ মিয়া রাজারবাগ পুলিশ লাইন আইজিপি রিজার্ভ স্টোরে অস্ত্রাগারে কর্মরত কনস্টেবল সায়েম ও সুবেদার জাহিদুল হাসানের কাছ থেকে প্রতিটি গুলি চার থেকে পাঁচশত টাকা কিনতেন। আর ৭ থেকে ৮শত টাকায় বিক্রি করতেন জেনাল চাকমা, প্রেম চাকমা ও নান্টু চাকমাদের কাছে। এভাবে ২০০৯ সাল থেকে গত বছরের ১৯ অক্টোবর পর্যর্ন্ত তারা ১৬-১৭টি চালানে প্রায় ছয়-সাত হাজার রাউন্ড গুলি হাতবদল করেন।
জেনাল চাকমার বাড়ি রাঙ্গামাটি জেলার নানিয়ারচর থানার থৈ চাকমা দানের চরে, তার পিতার নাম তাকুল্যা চাকমা। নান্টু চাকমা ও প্রেম চাকমা সহোদর। তাদের বাড়ি খাগড়াছড়ি জেলার মহালছড়ি থানার সাত ঘড়িয়ায়। তাদের পিতার নাম চন্দ্র দাস চাকমা । প্রেম ও নান্টু পার্বত্য শান্তি চুক্তির আওতায় ১৯৯৮ সালে পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেন। প্রেম চাকমা ও জেনাল চাকমা সাবেক জনসংহতি সমিতির সদস্য হিসেবে তারা ভারতের মিজোরামে ১০০ দিনের সামরিক প্রশিক্ষণও নিয়েছিলেন। ২০০৮ সালে কুষ্টিয়া চাকরি করার সময় মাসুদের সঙ্গে প্রেম চাকমার বড় ভাই নান্টু চাকমার পরিচয় হয়। সেই পরিচয়ের সূত্র ধরে ২০০৯ সালের শুরুর দিকে ময়মনসিংহ পুলিশ লাইনে ৫০০ গুলি খোয়া যাওয়ার কথা বলে কনস্টেবল মাসুদকে টাকার বিনিময়ে তা সংগ্রহ করে দিতে বলে। পরে মাসুদ অস্ত্রাগারের দায়িত্বে থাকা এসআই জাহিদ ও কনস্টেবল সায়েমের সঙ্গে যোগাযোগ করে। মাসুদ মিয়ার বাড়ি নেত্রকোনা জেলার দুলা থানার বলনিয়া গ্রামে। তার পিতার নাম আব্দুর রশিদ।
গুলি উদ্ধারের ঘটনায় পল্টন থানায় দায়েরকৃত মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পরিদর্শক মুন্সী ছাব্বীর আহম্মদ বলেন, এ মামলায় ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এরা হচ্ছে কনস্টেবল আব্দুল সায়েম, এএসআই জাহিদ হাসান, নায়েক মাহাম্মদ সামছু, শাহদাত হোসেন, আরিফুল ইসলাম ও মনির হোসেন । তারা ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথাও স্বীকার করেছে। ঠিকানা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। আশা করি, খুব কম সময়ের মধ্যে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা সম্ভব হবে।
