তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি হাবিবুর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতা নতুন করে বিন্যাসের পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, রাষ্ট্রের শীর্ষবিন্দু থেকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে ক্ষমতার বিন্যাস এমনভাবে করতে হবে, যেখানে স্বায়ত্তশাসন ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে সাধারণ নাগরিকগণ কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় উভয় সরকার পরিচালনায় সমৃদ্ধ হতে পারে। তিনি আরো বলেন, অপরাধের মামলার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ইচ্ছা করলে যেকোনো মামলা প্রত্যাহার করতে পারে। তবে এই প্রত্যাহারের ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। এটি কেবল ন্যায় বিচারের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যেতে পারে। এই ক্ষমতা ঢালাওভাবে ব্যবহার হলে রাষ্ট্রের সার্বভৌম বিচার ক্ষমতা ব্যাহত হয়। তিনি বলেন, সুশাসনের ভারসাম্য রক্ষার জন্য মহাহিসাব নিরীক্ষক, অ্যাটর্নি জেনারেল, সরকারি কর্মকমিশন, নির্বাচন কমিশন ও বিচার বিভাগ রয়েছে। এগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে না দিলে সুশাসনের কথা বড়ই ফাঁপা শোনাবে। গতকাল শনিবার সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) চতুর্থ জাতীয় সম্মেলন উদ্বোধনকালে এসব কথা বলেন তিনি।
সুজনের সভাপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন সংবিধান প্রণেতাদের অন্যতম ড. কামাল হোসেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এএসএম শাহজাহান, সাবেক উপদেষ্টা ড, আকবর আলি খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. মনিরুজ্জামান মিয়া, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রধান ডা. জাফরউল্লাহ চৌধুরী, ম্যাগসেসে পুরস্কারপ্রাপ্ত পরিবেশ আইনবিদ সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, সাবেক মন্ত্রী পরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার, স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তোফায়েল আহমদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী প্রমুখ। সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার ও সমন্বয়কারী দিলীপ সরকার সম্মেলনের দুইটি অধিবেশন সঞ্চালনা করেন।
বিচারপতি হাবিবুর রহমান বলেন, আমরা ৪২ বছর ধরে স্থানীয় সরকারকে অবহেলা করে আসছি। নির্বাচিত লোকের দ্বারা স্থানীয় সরকার পরিচালিত হওয়ার পরিবর্তে কেন্দ্রীয় সরকারের নায়েব-গোমস্তা-মুত্সুদ্দীদের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকারের কর্তাব্যক্তিদের ধারণা, স্থানীয় সরকার একটি বিজাতীয় প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানকে সক্রিয় হতে দিলে অদক্ষ লোকের দ্বারা দেশের অর্থের অপচয় ঘটবে এমন কথা ঔপনিবেশিক প্রভু এবং দাতারা আকার-ইঙ্গিতে প্রায়ই বলে থাকেন।
ড. কামাল হোসেন বলেন, এদেশের সব বড় আন্দোলন নাগরিকরা সফল করেছে। ভবিষ্যতেও নাগরিক সমাজই সকল অন্যায়-অনাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে। তাই বলে আমাদের রাজনীতি বিমুখ হলে চলবে না। তবে আজকে যেটাকে রাজনীতি বলা হচ্ছে সেটা আসলে রাজনীতি নয়। এটা হলো নীতিহীনতার চর্চার মধ্য দিয়ে কিছু লোকের ভাগ্যের উন্নতি ঘটানো। অন্যদিকে কোটি কোটি মানুষকে প্রতারিত করা। এই রাজনীতি ছাত্রদের খুনি বানাচ্ছে। একদিন তারুণ ছাত্ররা জাতির প্রয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতো। আজকে সেই ভূমিকায় ছাত্ররা নেই। তবে তরুণ সাংবাদিকদের কেউ কেউ সাহসী ভূমৃিকা রাখার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, কারো কারো ভাষায় দেশ দুই ভাগ হয়ে গেছে। এই কথাটি ঠিক নয়। দুই দলের মধ্যে দ্বিধাবিভক্তি থাকতে পারে। কিন্তু দেশ একই আছে। আমরা তো ভেড়া বা গরু নই। আমাদের কপালে কোনো সিল নেই। আমরা নাগরিকরা দুই দলের জমিদারিতে প্রজা হয়ে থাকতে চাই না। দলীয় সেবাদাস হতে চাই না। নাগরিকদের আন্দোলনের মাধ্যমে আমরা এসব অনাচার দূর করবো।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এবং পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি এএসএম শাহজাহান বলেন, ভাগ আর ভোগ নিয়েই এ দেশের রাজনীতি চলছে। জনগণ যতই দেশকে ওপরে তুলতে চাইছে ততই রাজনৈতিক দলগুলো বাঁশে তেল দিচ্ছে। তাই সরকার এবং রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আবেদন আপনারা বাঁশে তেল দেয়া বন্ধ করুন, জনগণ আরামসে ওপরে উঠে যাবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অপর সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক সংঘাত-সহিংসতা ঠেকাতে নাগরিকদের ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। নাগরিক সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া চলমান অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে না।
এম হাফিজউদ্দিন খান বলেন, সংবিধানের ৪টি মৌলিক বিষয়ের প্রথমেই আছে গণতন্ত্র। কিন্তু বাস্তবে ক্ষমতায় যাওয়ার পর কোনো রাজনৈতিক দলই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চায় না। সব দলই ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে চায়। আর সে কারণেই আমাদের দেশে গণতন্ত্র আছে কেবল নামে।
সম্মেলনে নাগরিক সনদের একটি খসড়া উপস্থাপন করা হয়। এতে বলা হয়েছে, জাতীয় সংসদ এখন ব্যবসায়ীদের আখড়া হয়ে গেছে। এ অবস্থায় নির্বাচনে নাগরিকদের ভোটাধিকার থাকলেও সংসদে তাদের কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নেই। যে কারণে ধনি-দরিদ্রের বৈষম্য আকাশচুম্বী হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় নির্বাচনে কালো টাকার ব্যবহার বন্ধ, ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচনী মামলার নিষ্পত্তি, আগামী দুই মেয়াদের জন্য নির্বাচনকালীন দল নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠা, একটির বেশি আসনে প্রার্থিতার সুযোগ না রাখা, ‘না’ ভোটের বিধান চালু করা, হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দিয়ে নির্বাচিত সাংসদদের সদস্যপদ বাতিলের ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনকে দেওয়াসহ বেশ কিছু প্রস্তাব করা হয়েছে নাগরিক সনদের খসড়ায়।
সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশনে কাউন্সিলরদের ভোটে সুজনের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি ও জাতীয় কমিটি পুনর্গঠন করা হয়। অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের মৃত্যুর পর দীর্ঘদিন ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালনকারী এম হাফিজউদ্দিন খান নতুন সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। এছাড়া সহ-সভাপতি পদে এএসএম শাহজাহান ও সম্পাদক পদে ড. বদিউল আলম মজুমদার পুনঃনির্বাচিত হয়েছেন। এছাড়া কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য সংখ্যা ১১ জন থেকে বাড়িয়ে ২১ জন করা হয়েছে। এতে প্রত্যেক বিভাগ থেকে একজন করে প্রতিনিধি রাখা হয়েছে।
