দিন দিন কষ্টের বোঝা ভারি হচ্ছে মধ্যবিত্তের জীবনে। হঠাত্ করে আরেক দফা জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়েই দেখা দিয়েছে স্বল্প আয়ের মানুষের জীবনে। ইতিমধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে আরেক দফা। অঘোষিতভাবে বেড়েছে যানবাহন ভাড়া। ভাড়াটিয়ারা পাচ্ছেন বাড়ি ভাড়া বাড়ানোর নোটিস।
গতকাল অনেকেই ইত্তেফাকে ফোন করে তাদের ক্ষোভ ও হতাশার কথা জানিয়েছেন।
এমনই একজন রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর ইসমাইল হোসেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ইচ্ছে হলেই কি সরকার যা কিছু করতে পারে? এখন যে সবকিছুর দাম বাড়ছে, এর দায় কে নেবে? বাড়িওয়ালা তাকে বাড়ি ভাড়া বাড়ানোর নোটিস দিয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এমনিতেই সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছি, এর ওপর বাড়তি বাড়ি ভাড়া, বাজার খরচের বাড়তি টাকা পাব কোথায়! সরকার গত বৃহস্পতিবার ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি লিটার ডিজেল ও কেরোসিন তেলের দাম ৭ টাকা বাড়িয়ে ৬৮ টাকা এবং অকটেন ও পেট্রোলের দাম ৫ টাকা বাড়িয়ে যথাক্রমে ৯৯ টাকা ও ৯৬ টাকায় পুনঃনির্ধারণ করেছে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সরকার জ্বালানি তেলের দাম আরেক দফা বাড়ালো। ঘাটতি কমাতেই সরকার দাম বাড়িয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)।
তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়াতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চাপ রয়েছে। এজন্য সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। এর ফলে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে যাবে। এছাড়া ডিজেলের দাম বৃদ্ধিতে কৃষকদের ব্যয় আরো বেড়ে যাওয়ায় তারা ফসল উত্পাদনে নিরুত্সাহিত হতে পারে।
কষ্টের বোঝা ভারি হচ্ছে
স্বল্প আয়ের মানুষরা বলছেন, ঘাটতি কমাতে গিয়ে সরকার বোঝা চাপাচ্ছে আমাদের কাঁধে। আয় না বাড়লেও ব্যয় বাড়ছে অস্বাভাবিকভাবে। ফলে কাটছাঁট করেও সংসার চালানো কষ্টকর হয়ে পড়েছে স্বল্প আয়ের মানুষের।
এমনিতেই সদ্য শেষ হওয়া বছরের শেষের দিক থেকেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কিছুটা বাড়তির দিকে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে অক্টোবর ও নভেম্বরে খাদ্যে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। ডিসেম্বরের হিসাব এখনো পাওয়া না গেলেও আশান্বিত হওয়ার মত কিছু নেই। এরমধ্যেই জ্বালানি তেলের দাম বাড়লো আরেক দফা।
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) হিসাবে, ২০১২ সালে আটা ১১ দশমিক ৪৮ শতাংশ, ডাল ৮ দশমিক ৯৬ শতাংশ, ভোজ্যতেল ১২ দশমিক ৯৮ শতাংশ, মাছ ১২ দশমিক ৭৯ শতাংশ, মাংস (গরু, খাসি) ১২ দশমিক ৪১ শতাংশ ও ডিমের দাম ৩৭ দশমিক ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সব মিলিয়ে গত বছর জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে ৬ দশমিক ৪২ শতাংশ। আর পণ্য ও সেবার দাম বেড়েছে ১৩ শতাংশ।
চলতি বছরের শুরুতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় এবার তা আগের বছরকে ছাড়িয়ে যাবে বলে আশংকা করছেন সংশ্লিষ্টরা। ইতিমধ্যে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে। দাম বেড়েছে নানা ধরনের সবজির।
গতকাল কাওরানবাজারে বাজার করতে আসা আমজাদ কবির বলেন, তেলের দাম বাড়তে না বাড়তেই বাজারে বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়েছে। প্রতি কেজি সবজিতে ২ থেকে ৩ টাকা বেড়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, আমাদের ব্যবসায়ীরা শুধু উপলক্ষ খোঁজে। আর তা পেলেই দ্বিগুণ উত্সাহে দাম বাড়িয়ে দেয়।
ট্রাকের ভাড়া বেড়েছে দাবি ব্যবসায়ীদের :পণ্যের দাম বাড়ার জন্য ক্রেতারা ব্যবসায়ীদের দায়ী করলেও ব্যবসায়ীরা বলছেন, এজন্য তারা মোটেই দায়ী নন। দেশের বিভিন্ন স্থানে খাদ্য সামগ্রীসহ বিভিন্ন পণ্য ট্রাকে পরিবহন করা হয়। আর ট্রাকের জ্বালানি হিসাবে সাধারণত ব্যবহার হয় ডিজেল। ডিজেলের দাম বাড়ায় ট্রাক ভাড়া বেড়েছে। এজন্য বাড়তি ভাড়া দিতে হচ্ছে তাদের। এজন্যই পণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে।
বগুড়া থেকে কাওরান বাজার আসা পাইকারি সবজি ব্যবসায়ী কাওসার গতকাল বলেন, তেলের দাম বাড়ার আগে বগুড়া থেকে ঢাকায় ট্রাক ভাড়া ছিল ১৫ হাজার টাকার কিছু বেশি। কিন্তু এখন ভাড়া দিতে হচ্ছে ১৭ থেকে ১৮ হাজার টাকা। এই বাড়তি ভাড়া তুলতে হচ্ছে সবজির দামের ওপর থেকে। তিনি বলেন, শুধু সবজি কেন, সব ধরনের পণ্যের দামই বাড়বে।
চালের পাইকারি বাজার বাবুবাজারের জনপ্রিয় রাইস এজেন্সির চাল ব্যবসায়ী হাজী আব্দুল করিম বলেন, চালের বাজার স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু ট্রাক ভাড়া বাড়ায় এখন চালের দামও বাড়বে। এছাড়া মিল মালিকরাও চালের দাম বাড়িয়ে দেবে। জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় কৃষি, শিল্পসহ অন্য সব খাতে উত্পাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়তে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
এ প্রসঙ্গে পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহনসহ সকল খাতে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে। এর ফলে মধ্যবিত্তসহ স্বল্প আয়ের মানুষের ভোগান্তি বাড়বে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
বেড়েছে বাসের ভাড়া :সরকারিভাবে এখনো বাস ভাড়া বাড়ার ঘোষণা না এলেও কোন কোন রুটে ইতিমধ্যে বাস ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। আর এভাবে বাস ভাড়া বাড়িয়ে দেয়ায় বাস কন্ডাক্টরদের সাথে যাত্রীদের কথা কাটাকাটি হচ্ছে, হচ্ছে হাতাহাতিও।
উত্তরা থেকে মহাখালী পর্যন্ত বলাকা সার্ভিসে জনপ্রতি যাত্রী ভাড়া একদিন আগেও ছিল ১০ টাকা। কিন্তু গতকাল থেকে নেয়া হচ্ছে ১২ থেকে ১৫ টাকা। যার কাছ থেকে যেমন নিতে পারে! এ প্রতিবেদক বাসের কন্ডাক্টরকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করতেই বললেন, তেলের দাম বেড়েছে তাই ভাড়াও বেড়েছে। সরকারতো এখনো বাস ভাড়া বাড়ায়নি-তাহলে কেন বাড়লো? এর জবাবে তিনি বলেন, বেশি দামে তেল কিনে কি লোকসান দিয়ে গাড়ি চালাবো?
এদিকে তেলের দাম বৃদ্ধির এই সুযোগে সিএনজি চালিত বাস, অটোরিকশা ট্যাক্সি ক্যাবও যাত্রীদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া আদায় করছে।
লোকসান বাড়বে কৃষকের :কৃষক যখন অনবরত লোকসান গুনছে ফসল চাষ করে, তখন ডিজেলের দাম বৃদ্ধি তাদের কাছে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মত হবে—এমন মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলেন, ডিজেলের দাম বৃদ্ধিতে কৃষকের ব্যয় আরো বাড়বে। ফলে কৃষক উত্পাদনে নিরুত্সাহিত হবে এবং তাতে কৃষিপণ্যের মূল্য আরো বেড়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক ড. জায়েদ বখত ইত্তেফাককে বলেন, বর্তমানে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে আসলেও জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির ফলে এ হার বেড়ে যাবে। বিশেষ করে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে অনেক বেড়ে যাবে।
বিআইডিএস-এর এই গবেষণা পরিচালক বলেন, কৃষকরা চলতি বছর ধানের ভালো দাম পায়নি। ডিজেলের দাম বৃদ্ধিতে কৃষকদের ব্যয় আরো বেড়ে যাবে।
