পদ্মা সেতু দুর্নীতিতে সরকারের উচ্চ মহল জড়িত :ড. দেবপ্রিয়

আপডেট : ০৫ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:৩৬
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী পদ্মা সেতুর দুর্নীতির সঙ্গে শুধু সচিব নন, নির্বাহী হিসাবে সরকারের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের ব্যক্তিরা জড়িত। গতকাল সিপিডির নিজস্ব কার্যালয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি বলেন, আমরা সব সময় বলে আসছি যে, বিকল্প অর্থায়নের চেয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতা করে অর্থ আনতে হবে। সিপিডি মনে করে, পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা কার্যত অচল। এর কারণ হিসেবে তারা বলছে, বর্তমান সরকারের গৃহীত ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার অনেক লক্ষ্যমাত্রাই সঠিক পথে নেই। সরকার যে সকল অনুমানের উপর ভিত্তি করে এ পরিকল্পনা করেছিল তা অচল হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি। অবৈধ পথে অর্থ পাচারের সাথে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। সাংবাদিক সম্মেলনে প্রথম ছয় মাসের (জুলাই-ডিসেম্বর) অর্থনৈতিক পর্যালোচনা তুলে ধরেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান। গবেষণা বিভাগের অন্য কর্মকর্তারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন। দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পরিচালক নিয়োগে কোন স্বচ্ছতা নেই। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে মূলত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে পরিচালকরা নিয়োগ পাচ্ছেন। ৯০-এর দশকে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি আমলারা এ ধরনের পদে নিয়োগ পেতেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন পেশাজীবীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আর এই সুযোগে অনেক অযোগ্য লোক রাজনৈতিক বিবেচনায় পর্ষদে নিয়োগ পান। এর মধ্যে অনেকেই রয়েছেন যাদের দৃশ্যমান কোন পেশা নেই, তারাই আবার ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখছেন। ফলে হলমার্কের মতো ঘটনা ঘটেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পরিচালক নিয়োগের ক্ষমতা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে দেয়ার পাশাপাশি এ বিষয়ে নিয়োগের জন্য একটি মানদণ্ড থাকা প্রয়োজন। পদ্মা সেতু ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, পদ্মা সেতু প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নের সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসছে। আমরা সিপিডি’র পক্ষ থেকে সব সময় বলেছি, বিকল্প অর্থায়নের চেয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতা করে অর্থ নিয়ে আসতে হবে। আমরা কিছুটা আশার আলো দেখেছিলাম। আমরা চেয়েছিলাম, দুর্নীতির তদন্ত ও অর্থায়ন একসঙ্গে চলুক। সরকারও তাই বলেছিল; কিন্তু বিশ্বব্যাংক তাতে রাজি হয়নি। তারা চেয়েছে তদন্তের সন্তোষজনক পর্যায় এবং বিশ্বাসযোগ্য অগ্রগতি। সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে বাদ দিয়ে দুর্নীতির মামলা করা প্রসঙ্গে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে সরাসরি কিছু না বলে তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান রুলস অব বিজনেস অনুসারে মন্ত্রী মন্ত্রণালয়ের প্রধান নির্বাহী। রুলস অনুযায়ী সচিব নন, সরকারের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে এ কাজের সাথে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। তবে বিশ্বব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনে সব বেরিয়ে আসবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। দেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অর্থনীতি এমনিতেই নাজুক। এর মধ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা যোগ হলে তা আরো নাজুক হয়ে পড়বে। তাই অর্থনীতির স্বার্থে ঐকমত্য জরুরি। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, বিজিএমইএ’র অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রী যোগদান করেন। তাদের গার্মেন্টস হরতালের আওতামুক্ত থাকে। দেশের অর্থনীতির স্বার্থে এক ধরনের ঐকমত্য লক্ষ্য করা গেছে, যা অন্যান্য ক্ষেত্রেও প্রয়োজন। পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা :ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রসঙ্গে ড. দেবপ্রিয় বলেন, এটি এখন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। যে সকল অনুমানের ভিত্তিতে পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছিল তা অচল। এ পরিকল্পনা অনুযায়ী চলতি অর্থবছরেই প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৯ শতাংশ হতে হবে; কিন্তু তা সম্ভব নয়। চলতি অর্থবছর গতানুগতিকভাবে গত বছরের মতো প্রবৃদ্ধি ৬ দশমকি ৩ বা ৬ দশমিক ৪ শতাংশে থাকবে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও ৬ শতাংশের আশেপাশে প্রবৃদ্ধি থাকবে বলে উল্লেখ করেছে। তাছাড়া পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুযায়ী যে ধরনের বিনিয়োগ করা প্রয়োজন তা করা হয়নি। সরকারি বিনিয়োগ কিছুটা বাড়লেও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়েনি। প্রথম বছরে অর্থনীতির কিছুটা ভালো পরিস্থিতি থাকলেও পরবর্তীতে তা ধরে রাখা যায়নি। তাই পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে এ পরিকল্পনা পরিমার্জন করা প্রয়োজন। অর্থ পাচার :অর্থ পাচারের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ড. দেবপ্রিয় বলেন, প্রতিবছর বিরাট আকারের অর্থ অবৈধ পথে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। এটি নতুন এক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এর সঙ্গে রাজনৈতিক চক্র জড়িত। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হস্তান্তরের সময়কালে অর্থাত্ ২০০৬-০৭ সালে বেশি অর্থ দেশের বাইরে গেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর হিসেব অনুযায়ী প্রতিবছর ১৪শ’ কোটি ডলার অবৈধ পথে বিদেশে চলে যাচ্ছে। তাই এ বিষয় নিয়ে সিপিডি’র পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি :অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে সিপিডি’র নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ নানা চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও বিগত বছরগুলোর তুলনায় কিছুটা কমেছে। তাছাড়া এ অর্থবছর অতিরিক্ত ৮ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নেয়া হয়েছে, যা দুরূহ বলে উল্লেখ করেন তিনি। অন্যদিকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) তার দায় মেটাতে সরকারের কাছ থেকে ১১ হাজার ৭শ’ কোটি টাকা চেয়েছে। গত ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের পরিমাণ ১০ হাজার ৭শ’ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা মোট লক্ষ্যমাত্রার ৪৬ শতাংশ। এগুলো চাপ সৃষ্টি করছে।মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমে আসলেও খাদ্য বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি এখনও অনেক বেশি। সমপ্রতি জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতিকে আরো উস্কে দেবে। পেট্রোল ও ডিজেলের দাম প্রায় সাড়ে ১১ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। তিনি বলেন, রফতানির প্রবৃদ্ধিও কমে গেছে। এ অর্থবছরের নভেম্বর থেকে জুলাই পর্যন্ত ৪ দশমিক ১ শতাংশ রফতানি বেড়েছে, যা আগের বছরে হয়েছিল ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ। দেশের মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিও অনেক কমে গেছে, যা বিনিয়োগের জন্য সুখকর নয়। বর্তমানে যে পরিমাণ রিজার্ভ রয়েছে তাতে ৪ মাস পর্যন্ত আমদানির দায় মেটানো সম্ভব। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল থেকে বর্ধিত ঋণ সুবিধার ২য় কিস্তি এ মাসেই পাওয়া যাবে। কিন্তু মাত্র ৪শ’ মিলিয়ন ডলারের এ ঋণ সুবিধা খুব একটা প্রভাব সৃষ্টি করতে পারবে না বলে তিনি উল্লেখ করেন।