‘আমরাই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাব’

আপডেট : ০৬ জানুয়ারি ২০১৩, ২০:৩৩
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে হাঁটতে গেলেই শিশুরা সব জড়ো হয়ে ধরে। কেউবা এসে হাত ধরে ঝুলে থাকে। অন্য সব শিক্ষার্থীদের কাছে যেমন একটা চকলেট দিয়ে দু’টাকার আবদার করে এক্ষেত্রে সেটা ঘটে না। আপনজনের কাছে কি আর টাকার আবদার হয়। আর সেই আপনজনেরাও ওদের কাছে টেনে নেয়, মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে দেয়। আপনজনেরা ওদের ডাকে বিহঙ্গ নামে। যে বিহঙ্গরা স্বপ্ন দেখতে জানবে, নিজকে জানবে এবং একজন ভাল স্বাধীনচেতা মানুষ হয়ে দেশ গড়বে। তাই আপনজনদের সংগঠনের নামও বিহঙ্গ। ২০১১ সালে ব্রিটিশ কাউন্সিল ও ডেমোক্রেসি ওয়ার্ল্ডের আওতাধীন চারদিনের ‘একটিভ সিটিজেন্স ইয়ুথ লিডারশীপ’ ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে বিহঙ্গের যাত্রা। কিন্তু ঐ ট্রেনিংয়ের পরই সংগঠনটি থেমে যায়নি। বিহঙ্গের বন্ধুরা মিলে শুরু করে নতুনভাবে কার্যক্রম। ঢাকার বিভিন্ন অঞ্চলের অসহায় শিশুদের পাশে দাঁড়ানো, শিশুদের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যত্ দেশের যোগ্য নাগরিক করে তোলার জন্য বিহঙ্গ কাজ করছে। ‘বি ক্লিন কিপ ক্লিন’ তাদের প্রথম পদক্ষেপ। শুধু নিজেরা গিয়ে প্রতিষ্ঠান পরিচ্ছন্ন না করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিশুদের পরিচ্ছন্নতায় আগ্রহী করা ছিলো এর উদ্দেশ্য। কোন স্পন্সর বা ডোনারের কাছে না গিয়ে নিজেদের টিফিন খরচ, রিকশা ভাড়া বাঁচিয়ে শুরু করে কার্যক্রম। প্রথমে এর যাত্রা শুরু হয় বঙ্গবন্ধু প্রাইমারি স্কুলে। এই প্রজেক্টি ২০১২ সালে ৫৭৬টি প্রজেক্টের মধ্যে বেষ্ট সোস্যাল এওয়ার্ড লাভ করে। ২০ নভেম্বর বিশ্ব শিশু দিবস উপলক্ষে বিহঙ্গ আয়োজন করে ‘কালার ইউর ড্রিমস’ প্রজেক্টের। দরিদ্র ও অবহেলিত শিশুদের মানসিক বিকাশের লক্ষ্যে চিত্রাংকন প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনীর। ‘শাইনি ইদস ফর টাইনি এঞ্জেলস’ প্রজেক্টির মাধ্যমে বিহঙ্গ দরিদ্র শিশুদের ঈদ পোশাকের ব্যবস্থা করে। গত রমজান ও কোরবানি ঈদে তারা নিজেরা চাঁদা তুলে প্রায় চার শত শিশুদের মাঝে ঈদ বস্ত্র বিতরণ করে। সংগঠনের কার্যক্রম ও অনুভূতি সম্পর্কে আমাদের সাথে কথা হয় বিহঙ্গের তিন তরুণী সংগঠকের। লায়লা তাসমিয়া সাধারণ সম্পাদক প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকেই বিহঙ্গের সাথে আছেন লায়লা। বলতে গেলে তার হাতেখড়িতেই বিহঙ্গের পথ চলা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান অনুষদের ‘ওমেন এন্ড জেন্ডার স্টাডিজ’ বিভাগে স্নাতক পড়ছেন লায়লা। সংগঠন সম্পর্কে বলেন আমাদের প্রত্যেক সদস্যই যথেষ্ট আন্তরিক বিধায় কাজ করে অনেক ভাল লাগে, আর কাজে সফলতার পরিমাণও বেশি হয়। প্রথম থেকেই আমাদের কোন জমা অর্থ ছিল না। কিন্তু শুধু সদস্যদের আন্তরিকতার কারণেই আমরা প্রজেক্টগুলো সফলভাবে করতে পেরেছি। সমপ্রতি ২০১২ সালে তাদের প্রজেক্টের দরুন (আইএসবি) ইন্টারন্যাশনাল স্টাডি ভিজিট থেকে মিশর ঘুরে আসেন। তার ভবিষ্যত্ স্বপ্ন জুড়ে রয়েছে শিশুদের জন্য এবং সমাজের অবহেলিত মানুষদের জন্য কাজ করে যাওয়া। নন্দিতা আহমেদ সাংগঠনিক সম্পাদক সংগঠনের কাজগুলোকে নিজের অন্য সব কাজের চেয়ে বেশি প্রাধান্য দেন নন্দিতা। যখন তাদের জন্য কোন শিশুর মুখে হাসি ফুটে তখন ঐ হাসিটার জন্য পৃথিবীর সব চাহিদাকে শূন্য মনে হয়। আর বিহঙ্গে কাজ করে এটাই সর্বোচ্চ পাওয়া বলে মনে করেন নন্দিতা। তিনি বলেন এখানে আমরা কোন অর্থ পাই না। বরং নিজেদের খরচগুলোকে কমিয়ে সংগঠনের পেছনে ব্যয় করি। তবু কাজ করতে অনেক ভালো লাগে। নন্দিতা বিবিএ পড়ছেন ইউনাইটেড ইউনিভার্সিটিতে। একজন বিবিএর শিক্ষার্থী হিসেবে ভবিষ্যতে ব্যবসা করার পাশাপাশি অসহায় দুস্থ মানুষদের জন্য একটি বৃদ্ধাশ্রম করার ইচ্ছা তার। রাইদা আনজুম দিনা শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক আহসান উল্লাহ ইউনিভার্সিটির আর্কিটেক্ট বিভাগে পড়ছেন দিনা। তিনি মনে করেন প্রত্যেকটি মানুষেরই প্রাতিষ্ঠানিক এবং কর্মক্ষেত্রে নিজ নিজ অবস্থানের মধ্যে থেকে সমাজের মানুষের জন্য কিছু করা। আর এ জন্যেই তার বিহঙ্গে আসা। বিহঙ্গ সম্পর্কে বলেন এখানে সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে প্রত্যেক সদস্য মতামত প্রকাশের সুযোগ পায় ফলে সকলের মধ্যেই যথেষ্ট আন্তরিকতা থাকে। তবে কাজের ক্ষেত্রে সবাই যত্নবান। আর এতদিন কাজ করে মনে হল, যে কোন ভাল কাজ করতে শুধু ইচ্ছা, আন্তরিকতা আর বিশ্বাসটাই সবচেয়ে বড়। আমাদের কোন কাজ অর্থের জন্য থেমে থাকেনি।