লোকজ সংস্কৃতির নান্দনিক ধারায় এ অঞ্চলে যারা যুগ-যুগ ধরে অবদান রেখেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম মরমী কবি সাধক দূর্ব্বিণ শাহ। বৃটেনে জ্ঞানের সাগর উপাধিতে ভূষিত মরমী সাধক দূর্ব্বিণ শাহ ১৩২৭ বঙ্গাব্দের ১৫ কার্তিক ছাতক শহরের অদূরে নোয়ারাই এলাকার তারামনি টিলায় জন্মগ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তার নামানুসারে টিলাটি দূর্ব্বিণ টিলায় নামকরণ করা হয়। মরমী সাধক দূর্ব্বিণ শাহ ১৩৮৩ বঙ্গাব্দের ৩ ফাল্গুন নিজ বাড়িতে মৃত্যুবরণ করেন। তার পিতা সফাত আলী শাহ ও মাতা হাসিনা বানু ছিলেন আধ্যাত্মিক জ্ঞানের অধিকারী। সাধক দূর্ব্বিণ শাহ অসংখ্য গান লিখে গেছেন। অসংখ্য গানের সুরকারও তিনি। ‘মারিয়া ভূজঙ্গ তীর কলিজা করিল চৌচির, কেমন শিকারী তীর মারিল গো’—-, ‘আউজুবিল্লাহ-বিসমিল্লাহ আরশ-কুরসি লৌহ কলম চন্দ্র-সূর্য সারে আলম, বেহেস্ত-দোজখ যত সৃজিলা’—,‘নির্জন যমুনার কূলে বসিয়া কদম্বতলে, বাজায় বাঁশি বন্ধু শ্যামরায়’——, ‘বন্ধু যদি হইতো নদীর জল, পিপাসাতে পান করিয়া পুড়াপ্রাণ করতাম শীতল’—-, ‘সৃষ্টির সেরা এ ব্রহ্মাণ্ড হবে যেদিন লণ্ডভণ্ড, অখণ্ড সাজিবে সংসার’—-, ‘ও বাঁশের বাঁশিরে কেন ডাক রাঁধা-রাঁধা বলে’—, ‘ভাঙ্গা তরি লইয়ারে ভব নদী বাইয়া, ছিঁড়া বাদাম উজান হাওয়া কেমনে দিতাম পাড়ি’—, ‘নামাজ আমার হইল না আদায়, দারুণও খন্নাসের দায়’—, ‘কি সুখ পাইলে বন্ধু আমারে ভুলিয়ারে’—, ‘আমি জন্মে-জন্মে অপরাধী তোমারি চরণে, হায় গো’—, ‘অচেনা এক জংলা পাখি থাকে মাটির পিঞ্জিরায়’—, ‘আমায় আমি চিনতে গেলে বাজে বড় গণ্ডগোল’—-, ‘আমায় রাখিও চরণ তলে দয়াল মুর্শিদও’—, কি ঘর বানাইলারে মালিক ও মেস্তরি, ঘরের ভেতরে রইয়া করে লুকোচুরি’—-, এসব আধ্যাত্মিক, দেহতত্ত্ব, মারফতি, মুর্শিদী ও আঞ্চলিক গানের রাজা ছিলেন তিনি। তার বেশ ক’টি গানের বই প্রকাশিত হয়েছে। মৃত্যুর পর ২০০৩ সালে তাঁর শতাধিক গান নিয়ে দূর্ব্বিণ শাহ গীতিমালা প্রকাশ করে দূর্ব্বিণ শাহ গবেষণা পর্ষদ ছাতক। তত্কালীন সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আলী খান, স্থানীয় সংসদ সদস্য কলিমউদ্দিন আহমদ মিলন, পৌরসভার চেয়ারম্যান আলহাজ্ব আব্দুল ওয়াহিদ মজনু, ভাতগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গিয়াস মিয়ার অর্থানুকূল্যে এ গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়।
দূর্ব্বিণ শাহ’র অনেক ভক্ত রয়েছেন ছাতক-সিলেট তথা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। তাঁর বেশ কিছু গান বাংলাদেশ বেতার, টিভিতে পরিবেশনসহ চলচ্চিত্রেও তাঁর গান স্থান করে নিয়েছে। তবে দূর্ব্বিণ শাহ ছিলেন প্রচারবিমুখ। ছাতকে বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে প্রতি বছর দূর্ব্বিণ শাহ লোক উত্সব অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। গতবছর এ অনুষ্ঠানটি জাঁক-জমকপূর্ণভাবে পালন করেছে দূর্ব্বিণ শাহ লোক উত্সব উদযাপন পরিষদ। বর্ণাঢ্য আয়োজনে দু’দিনব্যাপী এ লোক উত্সব ছাতক পাবলিক খেলার মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। আগামী ১৮ ও ১৯ জানুয়ারি পাবলিক খেলার মাঠে দূর্ব্বিণ শাহ লোক উত্সব অনুষ্ঠিত হবে বলে জানান, দুর্ব্বিণ শাহ লোক উত্সব উদযাপন পরিষদের সভাপতি ডাঃ আফসারউদ্দিন ও সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ চৌধুরী বাবুল।
